ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২৬ অক্টোবর ২০২০ ১১ কার্তিক ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ২৬ অক্টোবর ২০২০

আরেক সাহেদ মহাপ্রতারক লালু : শত কোটি টাকা হাতিয়ে ধরা
হাবীব রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১১:১৬ পিএম আপডেট: ৩০.০৯.২০২০ ১২:১০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 1118

এ যেন আরেক সাহেদ। গা শিউরে ওঠা ভয়াবহ সব প্রতারণার ঘটনা ঘটিয়েছে সে! হাজারো তরুণের স্বপ্নভঙ্গ করেছে। এক ভয়াবহ খলনায়ক প্রতারক লালু।
রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় ভুয়া অফিস খুলে চমকপ্রদ সব চাকরির বিজ্ঞাপন দিত। তারপর ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে হাতিয়ে নেয় শত কোটি টাকা। লালুর এ প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সহায়-সম্বলহীন হয়েছে হাজারো পরিবার। সব শেষে সিআইডির জালে ধরা পড়েছে সে। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চাকরিপ্রার্থীদের হাজার হাজার সিভি। গত রাতে আশকোনা ও বারিধারাসহ তার বিভিন্ন অফিসে তল্লাশি চালায় সিআইডি। আজ দুপুরে জনসম্মুখে আনা হবে এই মহা প্রতারককে।
প্রতারক লালুর পুরো নাম আমিনুর রহমান লালু। বাবার নাম ইয়াদ আলী। গ্রামের বাড়ি বগুড়া সদরে। তার প্রধান সহযোগী ছোটভাই শামীম।
২০০৮ সালে লালু ঢাকায় এসে চেয়ারম্যান পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ভুয়া অফিস খোলে। বিমানবন্দরে উচ্চ বেতনের সহজ চাকরির বিজ্ঞাপন সাঁটানো হয় রাজধানীর দেওয়ালে। লালুর ভুয়া কোম্পানির নামÑ এনবিজি (নর্থবেঙ্গল) এয়ার কার্গো। চাকরিপ্রার্থীদের ভাইভা নেওয়া হতো বারিধারা ডিওএইচএসের এক অফিসে।
চাকরি নামের সোনার হরিণের লোভ দেখিয়ে শিক্ষিত বেকার তরুণদের ফাঁদে ফেলত লালু। সুপারভাইজর ও এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে চার লাখ, কাস্টমস চেকার পদে তিন লাখ, লেবার পদে নির্ধারণ করা হতো দুই লাখ ঘুষ। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর তাদের দেওয়া হতো ভুয়া নিয়োগপত্র। তারপর নিয়ে যাওয়া হতো আশকোনার ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখানে ১০ থেকে ১৫ দিন ট্রেনিং। নিয়মিত সেভ করা, টাই বাঁধা আর শারীরিক ফিটনেসের ট্রেনিং শেষে সবাইকে যার যার বাড়ি চলে যেতে বলা হতো।
বলা হতো, যোগদানের তারিখ পরে জানিয়ে দেওয়া হবে। এরপর আস্তে আস্তে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অফিস স্থানান্তর হয়ে যায়। খোঁজ পাওয়া যায় না লালুর। মাস যায়, বছর ঘুরে চাকরির আর খবর থাকে না। আজ না কাল, এখানে ওখানে ঘুরে হতাশার গভীরে নিমজ্জিত হয় চাকরি প্রত্যাশীরা। বছর শেষে এভাবে প্রতারণা শেষে একসময় বন্ধ করে দেওয়া হয় বারিধারা ডিওএইচএসের তিন নম্বর রোডের ২৫৪ নম্বর বাড়ির অফিসটি। এবার আর পার পায়নি। সরকারের শুদ্ধি অভিযানে ধরা পড়েছে লালু।
সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ট্রেনিংয়ে অতিথি হিসেবে নেওয়া হতো। চাকরির কথা বলে তাদের হাতে আইডি কার্ড তুলে দেওয়া হতো। এসব প্রতারণা করে বগুড়ায় বাবার নামে জমি, রাইস মিল ও গরুর খামারসহ অঢেল সম্পদ গড়ে তোলে এই লালু।
সিআইডির একটি দল গত রাতে তার আশকোনা হাজী ক্যাম্পের পেছনে একটি মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় কথিত এ ট্রেনিং সেন্টারে অভিযান চালায়। তার এ অফিস থেকে কয়েক হাজার সিভি উদ্ধার করেছে পুলিশ। আড়াই হাজার লেবার নিয়োগের তালিকা উদ্ধার করা হয়Ñ যাদের কাছ থেকে দুই-তিন লাখ করে টাকা নেওয়া হয়েছিল কিন্তু চাকরি দিতে পারেনি। উদ্ধার করা হয় শত শত ভিসা কার্ড। আশকোনার ট্রেনিং সেন্টারে গত রাতেও ৫০ জনের বেশি চাকরি প্রত্যাশী তরুণ ছিল। যাদের ট্রেনিংয়ের কথা বলে সেখানে নেওয়া হয়েছিল।
এর আগে সিআইডির একটি দল লালুকে আটক করা হয় ভাটারা এলাকার একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলার এক ফ্ল্যাট থেকে। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় পাঁচ শতাধিক সিভি, ৬টি ব্যাংকের অন্তত বিশটি চেকবই ও ক্রেডিট কার্ডসহ অবৈধ অনেক কিছু। পরে লালুকে নিয়ে তার বিভিন্ন গোপন অফিসে তল্লাশি চালায় সিআইডি। তার গ্রেফতার নিয়ে গত রাত পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি সিআইডি পুলিশ।
সিআইডির পুলিশ সুপার (এসএস) খালিদুল হক হাওলাদার সময়ের আলোকে বলেন, আমরা এখনও কিছু বলতে পারছি না। আপনারা অর্গানাইজড ক্রাইমে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।
শুধু চাকরি না, লালুর প্রতারণা ছিল বিভিন্ন রকমের। পাথর সাপ্লাই দেওয়ার কথা বলে মতিঝিলের এক আওয়ামী লীগ নেতার কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা নিয়ে মতিঝিলের অফিস বন্ধ করে লাপাত্তা হয়ে যায়। ভুক্তভোগী আওয়ামী লীগ নেতা থানায় মামলা করেন। এসব মামলার নথিপত্রও জোগাড় করেছে সিআইডি।
পাওনাদাররা টাকা চাইলে লালু চেক জালিয়াতি করত। পাওনাদারদের চেক দিত; কিন্তু একাউন্টে টাকা থাকত না। বিভিন্ন দফতরে তদ্বিরের কথা বলেও টাকা নিত এই প্রতারক। লালুর ছোটভাই শামীম ও লালুর ভুয়া কোম্পানির জিএম জুয়েল উদ্দিনও এসব অপকর্মের সহযোগী। জুয়েলের বাড়ি নওগাঁ। বায়েজিদ নামের একজন তাকে ছাড়ানোর জন্য সব সময় বিভিন্ন তদবির করে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের সাবেক এক ছাত্রনেতাকে ব্যবহার করত।
প্রতারক লালুর নামে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় প্রতারণার মামলা রয়েছে। দক্ষিণখান থানার এক মামলায় পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) তাকে গ্রেফতার করেছিল। কিছুদিন জেলেও ছিল। আগামী ৩০ নভেম্বর এ মামলায় তার হাজিরার তারিখ।
লালুর প্রতারণার শিকার খুলনা অঞ্চলের মসিউর রহমান হতাশ কণ্ঠে সময়ের আলোকে বলেন, আমরা কয়েকজন চাকরির জন্য তিন লাখ টাকা করে দিয়েছি। আমরা ৯০ জন একসঙ্গে এ প্রতারণার শিকার হয়েছি। সবার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। গত মার্চ মাসে টাকা নিয়ে এরপর আর কোনো খোঁজ নেই।
বিভিন্ন থানায় তাদের দায়ের করা অভিযোগগুলো সিআইডি জোগাড় করছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, চাকরির কথা বলে টাকা নিয়ে ১০ দিন প্রশিক্ষণের নামে ঢাকায় রাখত। তারপর বলত, আপনারা বাসায় থাকেন। আমরা যোগদানের সময় হলে জানিয়ে দেব। তারপর মাসের পর মাস ঘুরেও আর চাকরির দেখা মেলে না ভুক্তভোগীদের।
এভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন লালমনিরহাটের সোহান আহমেদ। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আব্বুর সঙ্গে লালুর ছোটভাইয়ের পরিচয় ছিল। লালুর ভাই শামীম কৌশলে আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে চাকরির প্রস্তাব দেয়। এ জন্য নগদ সাড়ে তিন লাখ টাকা ও সোহানের পছন্দের একটি নতুন মোটরসাইকেলও লালুর নামে লিখে দেওয়া হয়। তিন মাসের মধ্যে এয়ারপোর্টে চাকরির নিশ্চয়তা দেয়। সোহানের সঙ্গে মেসে এমন ৩২০ জন ছিল চাকরি প্রত্যাশী। সবার কাছ থেকেই মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ট্রেনিংয়ের কথা বলে বছর ধরে টালবাহানা করে। কাউকে আর চাকরি দিতে পারেনি। সোহানের পরিবার বিষয়টি দুদকের এক কর্মকর্তাকে জানায়। দুদক কর্মকর্তার কাছে টাকা ফেরত দেওয়ার আশ^াস দিয়েও লাপাত্তা হয়ে যায় লালু।
প্রতারণার শিকার জামালপুরের মিজানুর রহমান জানান, দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে প্রতারক লালুর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, জানুয়ারিতে লালুকে ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিই। প্রথমে বলেছিল গ্লোবাল ইন্টারন্যাশনাল নামে এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেবে। পরে বলে এয়ারপোর্টে এক্সিকিউটিভ পদে চাকরি দেবে। আশকোনা অফিস থেকে নিয়োগপত্রও দেওয়া হয়। মিজান জানান, শত শত ছেলে এভাবে বাবার জমি-ভিটেমাটি বিক্রি করে লালুকে টাকা দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে।









সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]