ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১ ডিসেম্বর ২০২০ ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ১ ডিসেম্বর ২০২০

ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া এরফান
আলমগীর হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২০, ১১:১২ পিএম আপডেট: ২৭.১০.২০২০ ১২:১৭ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 191

পুরান ঢাকা যেন ‘মগের মুল্লুক’। যেখানে সন্ত্রাসী কায়দায় রামরাজত্ব কায়েম করেছেন পুরান ঢাকার আলোচিত সংসদ সদস্য (এমপি) হাজী সেলিমের ছেলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর এরফান সেলিম। তবে রোববার রাতে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদ খানকে অমানবিকভাবে মারধরের ঘটনায় এরফানের বিরুদ্ধে মামলাসহ কঠোর ‘অ্যাকশন’ শুরু হয়েছে।
র‌্যাবের টানা অভিযানে তছনছ হতে শুরু করেছে এরফানের অপরাধের সাম্রাজ্য। দখলবাজি-আধিপত্য বজায় রাখতে গড়েছিলেন টর্চার সেল। তার এই এলাকাভিত্তিক ‘সাম্রাজ্য’ ধরে রাখতে গড়েছেন নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। ব্যবহার করতেন অবৈধ অস্ত্র, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ বা হাতকড়া, বিশেষ ধরনের লাঠি ও বৈদ্যুতিক হিটারসহ নানা সরঞ্জাম। নিজ বাড়িতে স্থাপন করেন কন্ট্রোল রুমও।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় সোমবার র‌্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হয়েছেন এরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী জাহিদ। পরে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত এরফান ও জাহিদকে মদ্যপান ও ওয়াকিটকি রাখার দায়ে এক বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ ছাড়াও নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনার পরপরই গ্রেফতার করা হয় এমপি হাজী সেলিমের গাড়িচালক মিজানুর রহমানকেও। সোমবার তাকে এক দিনের রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। তবে সোমবার র‌্যাবের অভিযানকালে বাড়িতে হাজী সেলিম ও তার স্ত্রীর দেখা পাওয়া যায়নি।
নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে বিনা অপরাধে রাস্তার মধ্যে সন্ত্রাসী কায়দায় মারধরের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে সবখানেই এখন সমালোচনায় এরফানের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড।
স্থানীয়রা বলছেÑ বাবা হাজী সেলিম এমপি, শ^শুরও একজন এমপি এবং এরফান নিজে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরÑ এসব মিলে নিজেকে মহাক্ষমতাধর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এরফান। কাউকেই যেন তোয়াক্কা করেন না তিনি। উন্মাদের মতো করে ছাদে পটকাবাজি করে আতঙ্ক ছড়াতেন তিনি। দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে পিলে চমকে দিতেন সবার। সোমবার দুপুর থেকেই হাজী সেলিমের চকবাজারের দেবীদাস লেনের ২৬ নম্বরের ‘চান সরদার দাদাবাড়ি’ ঘেরাও করে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় বিপুল বিদেশি মদ, ইয়াবা, অবৈধ অস্ত্র, ওয়াকিটকি ও নানা ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে পুরান ঢাকায় হাজী সেলিমের আরেকটি ভবন মদিনা টাওয়ারে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। যেখানে বসে এরফান নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে জানা যায়। অস্ত্র ও মাদকসহ আরও অন্তত তিনটি মামলার প্রস্তুতি চলছে হাজী সেলিমের ছেলে এরফানের বিরুদ্ধে। এমনকি এ ঘটনার সূত্র ধরে ফেঁসে যেতে পারেন এরফানের বাবা এমপি হাজী সেলিমও।
অভিযানস্থল থেকে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আশিক বিল্লাহ বলেন, র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই দণ্ডের পাশাপাশি দুজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা করা হবে। বাসা থেকে উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো লাইসেন্স নেই। আর ওয়াকিটকিগুলোও অবৈধ ও কালো রঙের। এসব ওয়াকিটকি শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করতে পারেন। মদ্যপান ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করার অপরাধে এরফান ও তার দেহরক্ষীকে ছয় মাস করে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে
সরেজমিন দেখা যায়, সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সোয়ারীঘাটের দেবদাস লেনে হাজী সেলিমের বাড়ি ঘেরাও করে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। হাজী সেলিমের বাড়িসহ আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়। সাদা রঙের নয় তলা ওই ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় এরফান সেলিম থাকেন। বাড়ির গেট ও সম্মুখভাবে জমিদার বাড়ির মতো নকশা রয়েছে। এ অভিযানে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমও উপস্থিত ছিলেন। সারওয়ার আলম বলেন, এরফানের ওই দুই ফ্লোর থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, এক রাউন্ড গুলি, একটি এয়ারগান, ৩৭টি ওয়াকিটকি, একটি হাতকড়া এবং বিদেশি মদ ও বিয়ার পাওয়া গেছে। তবে অভিযানকালে এমপি হাজী সেলিম ও তার স্ত্রীর দেখা পায়নি র‌্যাব।
গত রোববার রাতে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমদ খান স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নীলক্ষেত থেকে বই কিনে মোটরসাইকেলে করে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় ধানমন্ডিতে ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে তার মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে হাজী সেলিমের ছেলে এরফানের গাড়ি ধাক্কা দেয়। ওয়াসিফ আহমদ মোটরসাইকেল থামিয়ে গাড়িটির গ্লাসে নক করে নিজের পরিচয় দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার কারণ জানতে চান। তখন এক ব্যক্তি বের হয়ে তাকে গালাগাল করে পুনরায় গাড়ি নিয়ে কলাবাগানের দিকে এগোতে থাকে। মোটরসাইকেল নিয়ে ওয়াসিফ আহমদও তাদের পেছনে পেছনে যান। কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে গাড়িটি থামলে ওয়াসিফ তার মোটরসাইকেল নিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়ান। তখন এমপি স্টিকারযুক্ত তিন-চারজন লোক গাড়ি থেকে নেমে বলতে থাকে, ‘তোর নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী বাইর করতেছি, তোর লেফটেন্যান্ট, ক্যাপ্টেন বাইর করতেছি। তোকে আজ মেরেই ফেলব।’ এই কথা বলে তাকে কিল-ঘুসি দিতে থাকে। পরে ট্রাফিক পুলিশ ও আশপাশের লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করে। তাৎক্ষণিক এরফান ও তার সহযোগীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। খবর পেয়ে রাতেই দ্রুত ধানমন্ডি থানায় উপস্থিত হন নৌবাহিনীর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদ নৌবাহিনীর এয়ার উইংয়ের কর্মকর্তা। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আওতায় প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এর আগে তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নিরাপত্তায় নিয়োজিত ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সে (এসএসএফ)’ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন।
গত রোববার রাতে কলাবাগানের ট্রাফিক সিগন্যালে হাজী সেলিমের একটি গাড়ি থেকে দু-তিনজন ব্যক্তি নেমে ওয়াসিম আহমেদ খানকে ফুটপাথে ফেলে এলোপাতাড়ি মারধর করে। পরে ট্রাফিক পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে। পথচারীরা এই দৃশ্য ভিডিও করে, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। সেখানে এরফান ও তার দেহরক্ষীদের অমানবিকতার শিকার হওয়া সশস্ত্র বাহিনীর এই চৌকশ অফিসারকে রক্তাক্ত অবস্থায় করুণভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। পরে ধানমন্ডি থানা পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে এরফানের ব্যবহৃত গাড়িটি থানায় নিয়ে যায়।
ধানমন্ডি থানার ওসি ইকরাম আলী বলেন, সোমবার ভোরে এ ঘটনায় হাজী সেলিমের ছেলে এরফান সেলিম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে। এমপি স্টিকারযুক্ত গাড়িটি ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের হলেও ঘটনার সময় তিনি গাড়িতে ছিলেন না। গাড়িতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩০নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এরফান সেলিম ছিলেন। তার সঙ্গে এরফানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীরাও ছিলেন। মামলায় চারজন নামীয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিরা হলেনÑ এরফান সেলিম, তার বডিগার্ড মোহাম্মদ জাহিদ, হাজী সেলিমের মদিনা গ্রুপের প্রটোকল অফিসার এবি সিদ্দিক দিপু এবং গাড়িচালক মিজানুর রহমান।
অভিযানে অংশ নেওয়া র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেন, পুরান ঢাকার ওই এলাকা ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করতে হাজী সেলিমের বাসায় গড়ে তোলা হয়েছিল আধুনিক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিসহ অত্যাধুনিক কন্ট্রোল রুম। কন্ট্রোল রুমে ছিল আধুনিক ভিপিএস (ভার্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার), ৩৮টি ওয়াকিটকি, ড্রোনসহ বিভিন্ন ডিভাইস। রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (ভিভিআইপি) নিরাপত্তায় নিয়োজিত এলিট বাহিনীর কাছে যেসব সরঞ্জাম থাকে, সেরকম সরঞ্জাম পাওয়া গেছে এখানে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় এই কন্ট্রোল রুম ব্যবহার করা হতো বলে র‌্যাবের ধারণা। এসব ওয়াকিটকির প্রতিটি চার কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা কাভার করত। এ ধরনের ওয়াকিটকি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির অনুমোদন ছাড়া ব্যবহার করা নিষেধ।








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]