ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৩০ নভেম্বর ২০২০ ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ৩০ নভেম্বর ২০২০

এক পরিবারে ৪ প্রতিবন্ধী : আর কত খাটবেন মনিকা?
নূরে আলম সিদ্দিকী নূর, বিরামপুর
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২০, ৮:১৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 677

মনিকা হাঁসদা। বয়স আটান্ন বছর। ত্রিশ বছর আগে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার অলিপুর গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুয়েল সরেন (৬৪) এর সাথে বিয়ে হয়। স্বামীর অভাবের সংসারে থেকে মুখে দু'বেলা ঠিকমত ভাত জোটেনি। দুইবছর যেতে না যেতেই দারিদ্রের সাথে যুদ্ধে হেরে যান মনিকা। স্বামীকে নিয়ে চলেন আসেন বাবার বাড়ি বিরামপুর উপজেলার বিনাইল ইউনিয়নের রাণীনগর গ্রামে। মনে সাহস নিয়ে আবারো দারিদ্র জয়ে নতুন যুদ্ধে নামেন মনিকা। প্রতিদিন সাতসকালে প্রতিবেশীদের বাড়ির গোয়াল থেকে গোবর তোলা ও পরে গ্রামের অন্য নারীদের সাথে কৃষি জমিতে দিনমজুরের কাজ করেন। এখান থেকে যা আয় তাতে অনেকটা টেনে-হেঁচড়েই চলে কষ্টের সংসার।

সরেজমিনে মনিকা হাঁসদার জীর্ণ ঘরের সামনে গিয়ে দেখা যায়,  মাটির তৈরি নড়বড়ে ঘরের স্যাঁতস্যাঁতে বারান্দায় অসুস্থ শরীরে বসে আছেন মনিকার স্বামী মানুয়েল সরেন (৬৪)।

আদিবাসী প্রথা অনুযায়ী, বাবার সম্পত্তিতে মনিকার অংশদারিত্বের সুযোগ না থাকলেও ২০ বছর আগে জেঠা-কাকারা তাকে দু'শতক জমি ছেড়ে দেন। সেসময় বেসরকারি  সংস্থা কারিতাস'র সহায়তায় সেখানে মাটির ড্যারার উপরে টিনের চালা দিয়ে ঘর তুলেছেন। এখন সেই সংস্থাও আর মনিকার খরব রাখেন না। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে সেই স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে থাকেন। সেখানে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় প্রতিবন্ধী তিন ছেলেমেয়ে রাতেরবেলায় এক প্রতিবেশীর বাড়ির বারান্দায় ঘুমায়। মনিকার ঘরে চেয়ার-টেবিল তো দূরের কথা, শোবার জন্য নেই কোনো চৌকি বা খাট। মাটির মেঝেতে প্লাস্টিকের বস্তার উপরে একটি ছেঁড়া ও নোংরা কাঁথা বিছানো। আর তার উপরে একটি ছেঁড়া ও নোংরা বালিশ। মনিকা ও মানুয়েল যেখানে মাথা রেখে ঘুমান ঠিক তার সোজা উপরেই রয়েছে টিনের ছিদ্র। যেটি দিয়ে বর্ষাকালে চোখেমুখে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে। ঘরের উপরের দুইপাশে কোন বেষ্টনি না থাকায় বর্ষাকালে বৃষ্টিতে ঘরের মেঝে ভিজে যায়। আর শীতকালে ঠান্ডা বাতাসে নির্ঘুম রাত কাটান স্বামী-স্ত্রী।

পরে খোঁজ নিয়ে মনিকাকে পাওয়া গেল পাশের এক প্রতিবেশীর বাড়িতে। ওই বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করছিলেন মনিকা। তাকে ডেকে আনা হল নিজের ওই জীর্ণ ঘরে। তার পেছনে এক এক করে চলে এসেছেন তিন সন্তান- এলেনরা হাঁসদা (২৭), সালমন সরেন (২০) ও স্যামসন সরেন (১৬)। তারা সকলেই খর্বাকৃতি দেহবিশিষ্ট শারীরিক প্রতিবন্ধী। সংসারে আর্থিক অনটন ও শারীরিক সমস্যার কারণে কেউই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে পারেননি।

জন্মের পর থেকেই কানে কম শোনেন মানুয়েল মুর্মু। গত তিনবছর আগে হঠাৎ করে শরীরের বামপাশ প্যারালাইজড হয়। সেই থেকে ঘরের বাইরে বের হতে পারেন না মানুয়েল।

বড়মেয়ে এলেনরা হাঁসদা ছোটবেলা থেকে কানে কম শোনেন ও পুরো শরীর অনবরত ব্যথা করে। পাশের গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লেও অসুস্থ শরীর নিয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

২০১৬ সাল থেকে নতুন করে প্রতিনিয়ত তীব্র মাথাব্যথা ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এলেনরা।  ২০১৬ সালের জুলাই মাসে দিনাজপুর শহরে সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালে ২০ দিন ধরে চিকিৎসা নিয়েছেন। সেখান থেকে ডাক্তাররা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকাতে নেওয়ার পরামর্শ দিলে অর্থাভাবে তা আর সম্ভব হয়নি। সেই থেকে আজ অবধি বিনা চিকিৎসায় কাটছে অসুস্থ এলেনরার দুর্বিষহ জীবন।

দুই ছেলে সালমন ও স্যামসন  অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে ধান রোপণ ও ধানকাটার কাজ করতে পারলেও শারীরিক শক্তি কম থাকায় তারা ভারী কাজ করতে পারেন না। ফলে অনেক গৃহস্থ তাদেরকে কোনো কাজও দিতে চান না। সালমনের মাথার আকৃতি অস্বাভাবিকভাবে বড়। সালমনের সাথে কথা হলে সে জানায়, মাঠে বেশিক্ষণ ধরে কাজ করলে আমার মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। ভারী কাজ করলে হাত-পা খুব ব্যথা করে।

সালমন আরো জানায়, আমাদের বোর্ড অফিসে (ইউনিয়ন পরিষদ) গিয়ে আমার প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করার জন্য বলেছিলাম। তারা আগে জন্মনিবন্ধন কার্ড করতে বলেছে। জন্মনিবন্ধন কার্ডের জন্য কয়েকবার অফিসে যাওয়া-আসা করতে আমার অনেক টাকা খরচ হয়েছে। জন্মনিবন্ধন কার্ড করতে বোর্ড অফিসে আমার কাছে ৫ শ টাকা চেয়েছে। সেই টাকা না দেওয়ায় আমার কার্ড এখনও হয় নাই।

অভাবের সংসারে একদিকে স্বামী-সন্তানদের শারীরিক অসুস্থতা,  অন্যদিকে অসুস্থ শরীর নিয়ে পরিবারের পাঁচজন সদস্যের জন্য খাবার জোগাড় করতে অনেকটাই বেসামাল মনিকার জীবন। এখানেই শেষ নয়, মনিকার ভাইবোনেরা ১২ বছর আগে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ভারতে চলে গেলে একা হয়ে পড়েন তার বৃদ্ধ বাবা হোদো মুর্মু (৮২)। পরে কয়েকবছর ভাতিজা বাবলু মুর্মুর বাড়িতে থাকা-খাওয়ার বন্দবস্ত হলেও বর্তমানে বৃদ্ধ বাবার ভরণপোষণের পুরো দায়িত্বটা পড়েছে মনিকার কাঁধেই। মনিকার জন্য এ যেন "মরার উপর খাঁড়ার ঘা"।

প্রতিবেশীদের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ ও মাঠে অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে যা আয় করেন তা দিয়ে সংসার চালাতে দিনের ঝলমলে আলোতেও চোখে অন্ধকার দেখেন মনিকা। তার প্রতিবন্ধী ছোটছেলে স্যামসন সরেনের নামে প্রতিবন্ধীভাতা কার্ড থাকলেও বাকিদের কোনো ভাতাকার্ড নেই, করোনাকালীন দুর্যোগেও হয়নি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কোনো কার্ড।

শুধু তাই নয়, ওই পরিবারের তিন প্রতিবন্ধী সদস্যের ভাতাকার্ড করে দেওয়ার কথা বলে এক ইউপি সদস্য টাকা নিয়েছেন কিন্তু শুধু একজনের কার্ড করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন মনিকা হাঁসদা।

মনিকা হাঁসদা বলেন, "বুড়া বাপ ও স্বামী-ছাওয়াল নিয়ে হামার দিন খুবই কষ্টে যাছে। ছাওয়ালগুলা রাইতত মানষের বাড়িত নিন্দায় (ঘুমায়)। হামার ভাঙা বাড়ি দেখ্পার তনে ম্যালা মানুষ আসিছিলো, তারা ক্যামেরাত করে বাড়ির ফটো তুলে নিয়ে গেইছে, কিন্ত কেউ হামার তনে কিছু করে দিবার পারলো না। হামরা সরকারি বাড়ি কদ্দিন (কবে) পাইমো।"

৫নং বিনাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, বিনাইল ইউনিয়নের শতভাগ প্রতিবন্ধী সরকারিভাবে ভাতা পান। তবে মনিকার পরিবারের ওই প্রতিবন্ধী সদস্যরা কেন এ তালিকা থেকে বাদ পড়ল- তা আমার জানা নেই। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]