ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৮ নভেম্বর ২০২০ ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ২৮ নভেম্বর ২০২০

বর্জ্য পড়ছেই বুড়িগঙ্গায়
হিরা তালুকদার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০, ১০:৩৯ পিএম আপডেট: ২৯.১০.২০২০ ১১:০১ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 67

ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের কারণে এখন মৃতপ্রায়। এ নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশও কাজে আসছে না। নদী পারের শতাধিক পথে নগরীর বর্জ্য নদীতে গিয়ে মিশছে। বিশেষ করে ঢাকা ওয়াসার বিষাক্ত বর্জ্যে বুড়িগঙ্গার দূষণ চরমে পৌঁছেছে। সংস্থটির ৬০ ভাগ বর্জ্য পড়ছে নদীতে। যদিও ওয়াসার বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় নিঃসরণ বন্ধে হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের ২০১০ সালে করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১১ সালে রায় দিয়ে আদালত ছয় মাসের মধ্যে বুড়িগঙ্গার ভেতরে যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসচার্জ লাইনগুলো (শিল্প বর্জ্য নিঃসরণ লাইন) আছে, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ওয়াসার এমডির প্রতি নির্দেশ দেন। দীর্ঘ ৮ বছরেও তিনি কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ফের ২০১৯ সালে একটি সম্পূরক আবেদন করা হয়। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ওয়াসার এমডির বিরুদ্ধে বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত ওয়াসাকে বুড়িগঙ্গায় থাকা সুয়ারেজ লাইন সম্পর্কে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
পরে ওয়াসার প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াসার কোনো লাইন বুড়িগঙ্গায় নেই। অন্যদিকে বিআইডবিøউটিএ প্রতিবেদন দিয়ে ৬৮টি লাইন থাকার তথ্য আদালতকে জানায়। এর মধ্যে ওয়াসার লাইন ৫৮টি। এরপর আদালত এক আদেশে অসত্য তথ্য দেওয়ার জন্য ওয়াসার  
এমডির বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা জানতে চান এবং আদালতের নির্দেশ পালনে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। এরপর দুবার আদালতে প্রতিবেদন দেয় ওয়াসা। কিন্তু কোনো প্রতিবেদনে আদালতের নির্দেশ পালনের পদক্ষেপ তারা দেখাতে পারেনি। তাই ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পরে আদালত ওয়াসার এমডিকে তলব করলে তিনি মিথ্যা তথ্যের জন্য আদালতে ক্ষমা চান এবং শ্যামপুরে অবস্থিত শিল্প কারখানার বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীতে নিঃসরণ বন্ধে হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নে আদালতকে প্রতিশ্রæতি দেন। এ বিষয়ে আগামী ১ নভেম্বর হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে।
সরেজমিনে শ্যামপুর, সদরঘাট, বাবুবাজার, সোয়ারীঘাট, বাদামতলী ও ওয়াইজঘাট এলাকা ঘুরে দেখা যায় বিভিন্ন পয়েন্টে নিষ্কাশন লাইন দিয়ে বর্জ্য পড়ছে বুড়িগঙ্গায়। ওয়াসার খাল থেকেও শত শত টন বর্জ্যযুক্ত পানি বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। নদীতে মেশা নিষ্কাশন লাইন অনেকটা নিচ দিয়ে যাওয়ায় বর্জ্য মিশ্রিত পানি পড়া এখন সরাসরি দেখা যায় না। তবে এলাকাবাসী জানায়, শীতের সময় নদীর পানি আরও কমে গেলে উন্মুক্ত হয় এসব লাইন। তখন দেখা যায় স্যুয়ারেজ লাইন দিয়ে বর্জ্য ফেলে বুড়িগঙ্গাকে দূষিত করার দৃশ্য।
বাদামতলীর স্থানীয় বাসিন্দা মধ্যবয়সি ফারুক মোল্লা বলেন, ‘যে বুড়িগঙ্গায় এক সময় গোসল করতাম, আমার বাবা-দাদারা যে নদীর পানি পান করতেন সেই বুড়িগঙ্গার পানির দুর্গন্ধে ঘরে জানালা বন্ধ করে থাকতে পারি না। শীতকালে তো অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।’ শ্যামপুরের স্থানীয় মানিক চন্দ্র মÐল বলেন, ‘মাটির ওপর দিয়ে ও নিচ দিয়ে শত শত লাইন গেছে বুড়িগঙ্গায়। এসব লাইন দিয়ে ময়লা পানি (বর্জ্য) পড়ে নদীতে।’ তিনি নদী পারের একটি জায়গা দেখান যেখান দিয়ে স্যুয়ারেজ লাইন মিশেছে নদীতে। সেখানে দেখা যায় বর্জ্য মিশ্রিত কালো পানি মাটির নিচ দিয়ে বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। নদীর প্রায় ১০ ফুট পর্যন্ত এই পানির কারণে কালো হয়ে আছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গা দূষণের জন্য নদী পারের কলকারখানা, ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা সিটি করপোরেশন বড় ভ‚মিকা পালন করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গা দূষণের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৬০ ভাগ ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দায়ী করা হয়েছে। বাকি ৪০ ভাগ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বাপা জানায়, ঢাকার বিভিন্ন কলকারখানা থেকে ৯০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্যসহ দেড় কোটি ঢাকাবাসীর দৈনিক ১৩ লাখ ঘনমিটার পয়ঃবর্জ্য উৎপাদিত হয়। এগুলো পরিশোধনের জন্য ঢাকা ওয়াসার ১ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি অত্যাধুনিক পরিশোধনাগার রয়েছে। বর্তমানে যেটিতে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন করা যায়। এটি ঠিকমতো কাজ না করায় বাকি ১২ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার পয়ঃবর্জ্য অপরিশোধিতভাবে সরাসরি বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ে। ফলে দূষিত হচ্ছে নদীর পরিবেশ। এসব বর্জ্যে ক্রোমিয়াম, সিসা, সালফিউরিক অ্যাসিডের ক্ষতিকর রাসায়নিক এবং পশুর রক্ত-মাংস রয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থায় নির্গত এসব বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানির পাশাপাশি এর তলদেশ ও পারের মাটি এবং বাতাসকে ভয়াবহ দূষিত করছে।
এ বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরশেদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘ঢাকার বুড়িগঙ্গাকে রক্ষা করতে হলে হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন করতে হবেই। ঢাকা ওয়াসার বর্তমান এমডি আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সবাইকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেননি। এখন রায় বাস্তবায়নে সময় নিচ্ছেন। উনি হয়তো অনেক শক্তিশালী। তাই হাইকোর্টের রায়কেও উপেক্ষা করছেন।’
মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘একবার আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল ওয়াসার এমডির বিরুদ্ধে। আসছে ১ নভেম্বর ওনার বুড়িগঙ্গায় স্যুয়ারেজ লাইন বন্ধে হাইকোর্টে কমপ্লায়েন্স (অগ্রগতি প্রতিবেদন) দেওয়ার কথা। তিনি যদি এখনও হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী কাজ না করেন তাহলে আবারও তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ দায়ের করা হবে।’
ঢাকা ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাসকিম এ খান এই বিষয়ে বলেন, ‘হাইকোর্টের রায় অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে। ওয়াসার কয়েকটি বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলে বিষাক্ত বর্জ্য মিশ্রিত পানি ওয়াসার লাইনের মাধ্যমে নদীতে যাওয়া বন্ধ হবে।’






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]