ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৩০ নভেম্বর ২০২০ ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ৩০ নভেম্বর ২০২০

খাদ্য বিভাগে বস্তা কেলেঙ্কারি
কুড়িগ্রামে আরও ২৩ জনকে শাস্তিমূলক বদলি
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০, ১০:৪৮ পিএম আপডেট: ২৯.১০.২০২০ ১১:০৯ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 32

সরকারিভাবে ধান, চাল ও গম সংরক্ষণে কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য বিভাগে ছেঁড়া, ফাটা ও নিম্নমানের প্রায় ৮ লাখ বস্তা ক্রয়ের দুর্নীতির অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় নতুন করে ২৩ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে বদলির আদেশ জারি করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মিজানুর রহমান। বুধবার রাতে এ আদেশ জারি হলেও বৃহস্পতিবার কর্মস্থলে এসে কর্মচারীরা জানতে পেরে হতাশ হয়ে পড়ে। অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীও এখন আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে কখন বদলির আদেশ আসে। নতুন বদলিকৃতদের ২ নভেম্বরে পদায়নকৃত কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে একযোগে ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। এদের মধ্যে ৩ জন ভারপ্রাপ্ত গুদাম কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) ও ৬ জন পরিদর্শক রয়েছেন। রংপুর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দফতর থেকে গত ২১ অক্টোবর থেকে বুধবার পর্যন্ত পৃথক ৬টি অফিস আদেশে এদের বদলি করা হয়। তাদেরকে ১ নভেম্বর পদায়নকৃত কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে সবাই এখন দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বদলি হওয়া কর্মচারীরা সবাই উপজেলা এলএসডির নিরাপত্তা প্রহরী। তারা হলেনÑ  রাজারহাট এলএসডির ইসমাইল হোসেন ও ফারুক মÐল, নাগেশ^রীর এলএসডির গোলাম রব্বানী, তৌহিদুল হক, মাহাবুর রহমান ও নুরুজ্জামান নয়ন, ফুলবাড়ীর 
এলএসডির আবু বকর ছিদ্দিক, নুর ইসলাম ও আব্দুল গফুর, রৌমারীর এলএসডির আবু জোবায়ের ও হাবিবুর রহমান, চিলমারীর এলএসডির মাঈদুল ইসলাম ও সোহরাব হোসেন দুদু, কুড়িগ্রাম সদর এলএসডির হেলিম উদ্দিন তালুকদার, মরিয়ম বেগম, মাহবুবা শবনম, জাহিদ হাসান, জিয়াউর রহমান, জেসমিন বেগম ও মোস্তাফিজার রহমান, উলিপুর এলএসডির নুরে আলম সরকার, ভ‚রুঙ্গামারী জয়মনিরহাট এলএসডির রমজান আলী এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী শাহ আলমকে বিভিন্ন উপজেলা এলএসডিতে বদলি করা হয়।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মিজানুর রহমান বলেন, ইতঃপূর্বে খাদ্য অধিদফতর ঢাকার প্রশাসনিক বিভাগ এবং আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক রংপুর কার্যালয়ের লিখিত নির্দেশনা এবং সর্বশেষ বুধবার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুস সালামের টেলিফোনিক নির্দেশনায় রাতেই এ বদলি আদেশ জারি করা হয়। ২ বছরের বেশি সময় যারা একই কর্মস্থলে অবস্থান করছিল তাদের বদলি করা হয়েছে। এটি রুটিন ওয়ার্ক। জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বোরো মৌসুমে কুড়িগ্রামের জন্য প্রায় আট লাখ নতুন বস্তা ক্রয়ের জন্য একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খাদ্য বিভাগের চুক্তি হয়। ওই প্রতিষ্ঠান বস্তা সরবরাহের সময় চুক্তি ভঙ্গ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে আট লাখ পুরনো নিম্নমানের ও ছেঁড়া-ফাটা বস্তা কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী ও ভ‚রুঙ্গামারী খাদ্যগুদামে সরবরাহ করে। ওই সময় রংপুর ও নীলফামারীতে বস্তার সঙ্কট দেখা দিলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কুড়িগ্রাম সদর খাদ্যগুদাম থেকে সদ্য ক্রয়কৃত ২ লাখ বস্তা সেখানে পাঠানো হয়। ওই বস্তা রংপুর ও নীলফামারীতে পাঠানোর পর পুরনো বস্তা রিসিভ না করে ফেরত পাঠানোর পর দুর্নীতির ঘটনা ফাঁস হয়। শুরু হয় খাদ্য বিভাগে তোলপাড়। স্থানীয়ভাবে গঠন করা হয় ২টি তদন্ত কমিটি। এ কমিটি দুর্নীতির সত্যতা পাওয়ার পর ঢাকা থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি তদন্ত কমিটি কুড়িগ্রামে আসে।
অভিযোগ উঠেছে, নতুন বস্তার টেন্ডারে দর ছিল (৩০ কেজির বস্তা) ৬০ টাকা এবং (৫০ কেজির বস্তা) ৮০ টাকা। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাইরে থেকে ২০১৫-১৬ সালে ব্যবহৃত পুরনো বস্তা ১০-১২ টাকা দরে কিনে নেয়। আর এসব বস্তা উল্টে স্টেনসিল ব্যবহার ও ক্যালেন্ডার করে নতুন বস্তা হিসেবে সরবারহ করে। বস্তার গায়ে নতুন করে লেখা হয় ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’। সংশ্লিষ্ট গুদাম কর্মকর্তারা ওইসব পুরনো ছেঁড়া-ফাটা বস্তা গ্রহণের সময় নতুন হিসেবে প্রত্যয়নপত্র দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ১৬-২০ টাকা ঘুষ গ্রহণ করে। এতে মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মোট ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য করে বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে গত ৫-৮ অক্টোবর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মজিবর রহমানের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি সরেজমিন তদন্ত করে। বস্তা ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগে গণবদলির আদেশ জারি করা হয়।
এদিকে এই গণবদলির খবর ফাঁস হওয়ার পর খাদ্য বিভাগে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বস্তা ক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার পরও অনেকের বিরুদ্ধে এখনও ব্যবস্থা না নেওয়া হলেও ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকলেও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি জেলা খাদ্য বিভাগ গঠিত দুটি তদন্ত কমিটি প্রাথমিক তদন্তের দুর্নীতি হয়েছে মর্মে প্রতিবেদন দিলেও রহস্যজনক কারণে সেই তদন্ত কমিটির দুই পরিদর্শককেও বদলি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কারও কারও ঘাড়ে ঘটনা ফাঁস হওয়ার দায় চাপানো হয়েছে বলে খাদ্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘উদোর পিÐি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে’। কারণ এ দুর্নীতির সঙ্গে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাজের সম্পর্ক। এর বাইরে অন্যদের কোনো সম্পৃক্ততার সুযোগ নেই। কিন্তু বদলি করা হচ্ছে গণহারে। এতে করে ভুল বার্তা যাচ্ছে সবার কাছে।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি একেএম সামিউল হক নান্টু বলেন, প্রকৃত দুর্নীতি বাজদের শুধু বদলি করলে হবে না। তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সরকারের যদি কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে তা হলে তা তাদের কাছ থেকে আদায় করতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তি যেন হয়রানির স্বীকার না হয় তাও দেখতে হবে সরকারকে।









সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]