ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২১ ৮ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২১

করোনায় আক্রান্তের পরে টি-সেল রেসপন্স কার্যকর থাকে ছয় মাস
ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম
প্রকাশ: সোমবার, ৯ নভেম্বর, ২০২০, ১০:৪৮ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 25

করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরে আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম ভাইরাসটির বিরুদ্ধে দুই ধরনের ইমিউনিটি তৈরি করে। ১. অ্যান্টিবডি মেডিয়েটেড হিউমোরাল ইমিউনিটি। ২. টি-সেল মেডিয়েটেড সেলুলার ইমিউনিটি। অ্যান্টিবডি মেডিয়েটেড ইমিউনিটির প্রধান কার্যকরী উপাদান হচ্ছেÑ ভাইরাস নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি (ওমএ), যা তৈরি হয় বি-সেল (শে^তকণিকা) থেকে। এই নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডিই করোনাভাইরাসকে নিষ্কিয় করার মাধ্যমে সংক্রমণ প্রশমিত করে।
অন্যদিকে সেলুলার ইমিউনিটি পরিচালিত হয় হেল্পার টি-সেল এবং সাইটোটক্সিক টি-সেল দুটির মাধ্যমে। সাইটোটক্সিক টি-সেল ভাইরাস সংক্রমিত কোষ ধ্বংস করার মাধ্যমে শরীর থেকে ভাইরাস নির্মূল করে। অপরদিকে, হেল্পার টি-সেল এন্টিবডি উৎপাদনকারী বি-সেল এবং সাইটোটক্সিক টি-সেলদ্বয়ের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় রক্ষা করে গোটা ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় রাখে। একবার সংক্রমণের পরে ভাইরাসের সংস্পর্শে আসা টি-সেল এবং বি-সেলগুলো সাধারণত মেমোরি সেল হিসেবে শরীরের লসিকা গ্রন্থি এবং রক্তে থেকে যায়, যা পরবর্তী সময়ে ভাইরাসের পুনঃসংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে করোনাভাইরাস ইনফেকশনের পরে শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি টাইটার ৩-৪ মাসের মধ্যেই অনেক কমে যায়। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ৩ লাখ ৬৫ হাজার মানুষের ওপর চালানো ইম্পেরিয়াল কলেজের সেরোসার্ভাইলেন্স স্টাডিতে দেখা যায় যে তিন মাসের ভেতরেই করোনাভাইরাসের সেরোপ্রিভ্যালেন্স ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪.২ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ প্রতি তিন মাসে প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষের শরীর থেকে নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি অদৃশ্য হয়ে যায়। বৃদ্ধদের (৭৫+ বছর) ক্ষেত্রে এই অ্যান্টিবডি অদৃশ্য হওয়ার হার ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ এই স্টাডি থেকে এটা নিশ্চিত যে করোনাভাইরাস সংক্রমণে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি রক্তে বেশি দিন স্থায়ী হয় না, আর এর ফলে পুনঃসংক্রমণের একটা সম্ভাবনা থেকে যায়।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করে আসছিলেন যে সেল-মেডিয়েটেড ইমিউনিটি হয়তো করোনার পুনঃসংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে। ২০০৩ সালে সংঘটিত হওয়া সার্স ভাইরাসের মহামারি থেকে জানা যায়, সার্স ভাইরাসের বিপরীতে তৈরি হওয়া টি-সেল রেসপন্স ৭ বছর পরেও সক্রিয় থাকে। যেহেতু করোনাভাইরাস এবং সার্স ভাইরাসের ভেতরে সাদৃশ্য রয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ, তাই স্বভাবতই বিজ্ঞানীরা আসা করছিলেন, করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও টি-সেল ইমিউনিটি একটা বড় ভূমিকা পালন করবে। তবে এ পর্যন্ত তাদের হাতে এই ধারণার স্বপক্ষে তেমন কোনো তথ্যপ্রমাণ ছিল না।
এই প্রথম যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ^বিদ্যালয়ের এক দল বিজ্ঞানী তাদের গবেষণায় দেখালেন যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি টাইটার সময়ের সঙ্গে কমে গেলেও, টি-সেল রেসপন্স সক্রিয় থাকে অন্তত পক্ষে ৬ মাস। অর্থাৎ করোনা ইনফেকশন শরীরে মেমোরি
টি-সেল তৈরি করে এবং তা সংরক্ষণ করে।
এই গবেষণাটি করা হয় ১০০ জন কোভিডে আক্রান্ত রোগীর ওপর যাদের গড় বয়স ছিল ৪১ বছর, এবং যারা মাইল্ড এবং মডারেট কোভিডে ভুগছিলেন। করোনায় আক্রান্তের ৬ মাস পরে সুস্থ হওয়া রোগীদের রক্তে অ্যান্টিবডি এবং টি-সেল রেসপন্স পরিমাপ করা হয়। এ পরীক্ষায় তারা দেখতে পান সংক্রমণের ১০ দিনের ভেতরেই আক্রান্তের রক্তে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয় যার টাইটার পরবর্তী ৬ মাসে ৫০ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে সংক্রমণের ৬ মাস পরে ১০০ জনের ভেতরে ৯৫ জনের রক্তেই পর্যাপ্ত পরিমাণে সক্রিয় টি- সেলের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা করোনাভাইরাসের শুধু স্পাইক প্রোটিনই নয়, বরং নিউক্লিয়োক্যাপসিড এবং মেমব্রেন প্রোটিনের সঙ্গেও বন্ধন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এ ছাড়াও টি-সেলগুলো এক ধরনের প্রোটিন ‘ইন্টারলিউকিন-টু’ নিঃসরণ করে যা ভাইরাস নিরোধক প্রোটিন হিসেবে কাজ করে। এ গবেষণাপত্রটি এখনও পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়নি, তবে যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য ইমিউনোলজিস্টগন এ ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
এ গবেষণার ফলাফল সবচেয়ে বেশি সহায়ক হবে কোভিডের ভ্যাকসিন প্রস্তুতিতে। এ পর্যন্ত যত ভ্যাকসিন উৎপাদন হতে যাচ্ছে, তার ভেতরে সিনোভ্যাক এবং সিনোফার্মের ভ্যাকসিন দুটি ছাড়া বাকি সব ভ্যাকসিনই ফেজ-টু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে টি-সেল রেসপন্স ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ভ্যাকসিনোলজিস্টরা প্রথম থেকেই তাদের ভ্যাকসিন ডিজাইনের সময় এই টি-সেল রেসপন্সের বিষয়টা সামনে রেখেছিলেন। তাদের ধারণা ভ্যাকসিনের মাধ্যমে আমাদের শরীরের টি-সেলগুলোকে ভালো মতো ট্রেইন-আপ করাতে পারলে তা হয়তো করোনার হাত থেকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেবে। ওপরের গবেষণাটির ফলাফল এই ধারণাটিকে আরও মজবুত করল।

লেখক : এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি, সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]