ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১ ডিসেম্বর ২০২০ ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ১ ডিসেম্বর ২০২০

মোবাইলের পেটে স্টুডিও
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২০, ১১:১০ পিএম আপডেট: ২০.১১.২০২০ ১১:৩১ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 112

দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মহাখালী স্কুল রোডে স্টুডিওর ব্যবসা করেন গোলাম হায়দার শামীম। সরু একটি ডেস্কে বসে রোজ কাস্টমারের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু ছবি তুলতে মানুষ আসে কালেভদ্রে। কোনো দিন দুয়েকজন আসেন। কোনো দিন একেবারেই কাস্টমারের দেখা মেলে না।
ভেতরে ঢুকে দেখা গেল স্টুডিওর আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতিগুলো ধুলোয় ঢাকা। দেওয়ালে আঁকা চিত্রগুলোও বিবর্ণ। স্টুডিও মন্দা থাকায় বাধ্য হয়েই শামীম ঝুঁকছেন অন্য ব্যবসায়ে।
অত্যাধুনিক মোবাইল ফোন আর ডিজিটাল ক্যামেরার আগ্রাসনে এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে অ্যানালগ ক্যামেরার স্টুডিও ব্যবসা। প্রায় রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়েছে ফটোগ্রাফি ব্যবসা। অনেক আগেই হারিয়ে গেছে ডার্করুম, নেগেটিভ, ফিল্ম ডেভেলপ করা ও ছবি পজিটিভ করার প্রাচীন পদ্ধতি। একটা সময় স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলার চল ছিল মোটামুটি সব মহলেই। পরিবারের সদস্য, বন্ধু কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে তোলা সেসব ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকত নানা ধরনের প্রাকৃতিক দৃশ্য। স্টুডিওর দেওয়ালে আঁকা ছবিতে শোভা পেত ফুল, লতা-পাতা। কিন্তু আজকের দিনে খুঁজেও এমন স্টুডিও পাওয়া বেশ কঠিন।
মহাখালীর মমতা ডিজিটাল স্টুডিওর স্বত্বাধিকারী আরিফুল ইসলাম তার বাবার আমলের ব্যবসা এখনও ধরে রেখেছেন। কিন্তু বছর দুয়েক ধরে স্টুডিওর ব্যবসা নেই বললেই চলে। তার ওপর করোনা বড় ধাক্কা দিয়েছে। এখন ১২ হাজার টাকা দোকান ভাড়া দিতেই হিমশিম খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে দোকানের তিন অংশের দুই অংশে এখন অন্য ব্যবসা করছেন। তার দোকানে এখন ফ্ল্যাক্সিলোড, বিকাশ, ফটোকপি, প্রিন্ট, অ্যালবাম ও শিশুদের হরেক রকমের খেলনা শোভা পায়। এগুলোর ভিড়ে স্টুডিওর কক্ষটি এখন আড়ালে চলে গেছে। বেজার মনে তিনি বলেন, কিছুদিন পর স্টুডিও ব্যবসা 
বন্ধ করে দেব। যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দেব। কারণ এখন আর মানুষ তেমন ছবি তুলে না। আর রঙিন ফুল ছবি কেউ তুলে না বললেই চলে। হাই রেজুলেশনের মোবাইল এসে স্টুডিওতে ছবি তোলার আগ্রহ কমে গেছে।
নয়াপল্টনের মুন ডিজিটাল কালার ল্যাব অ্যান্ড স্টুডিওর এক কর্মী জানান, করোনায় লোকজন কম আসছে। আর তাদের স্টুডিওতে কালার ল্যাব থাকায় ব্যবসাটা একটু টিকে আছে। তবে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ আসে না। আর ইদানীং অলি-গলিতে দোকানিরা কম মূল্যে ছবি থেকে ছবি প্রিন্ট করছে।
ঢাকার জুরাইন এলাকার মিতালী স্টুডিওর কর্ণধার মাহফুজুর রহমান লিটন বলেন, আমার স্টুডিওর বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেই বেশি পছন্দ করেন এখানে আসা লোকজন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে এখন চাইলেই যেকোনো ছবি জুড়ে দেওয়া যায়। ফলে দেওয়ালে আঁকা এসব দৃশ্যের কদর কমে যাচ্ছে দিনকে দিন। বর্তমান ডিজিটাল ব্যবস্থা আসার পর এসব ব্যাকগ্রাউন্ড খুব একটা কাজে লাগে না। নেট থেকে যেকোনো ছবি নামানো যায়। ঢাকার অন্যতম পুরনো একটি স্টুডিও ফটো মুভি অ্যান্ড স্টিলস। ১৯৫৮ সালে নিউমার্কেট প্রতিষ্ঠার সময় থেকে এই স্টুডিওটির যাত্রা শুরু। স্টুডিওটির ছবি তোলার কক্ষে দেখা গেল দুটি ছাতা, একটি বসার টুল আর বেশ কিছু লাইট। পেছনে সাদা দেওয়াল। প্রয়োজনে নীল পর্দা টাঙ্গানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এখন আর লোকজন ছবি তুলতে আসে না।
ঢাকার বাইরেও একই অবস্থা।
এক যুগ ধরে ফটোগ্রাফির ব্যবসা করেন গাজীপুরের সাগর সৈকত স্টুডিওর স্বত্বাধিকারী সৈকত আহমেদ। আগে তার স্টুডিওতে কাস্টমারের ভিড় থাকত। গ্রামে তার স্টুডিও সবার কাছে পরিচিত ছিল। তার একটু দূরে ছিল ফাহাদ স্টুডিও। বাজারে এই স্টুডিও দুটির মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত। কিন্তু কালের বিবর্তনে ফাহাদ স্টুডিওর মালিক সারোয়ার ব্যবসা ছেড়ে বিদেশ চলে গেছেন।
খুলনার পাইকগাছার দীপি সাথী ডিজিটাল স্টুডিওর মালিক বাবু পঙ্কজ কুমার মÐল বলেন, স্টুডিওতে এখন যারা আসেন তারা বিভিন্ন দাফতরিক কাজের জন্যই ছবি তুলতে আসেন, অন্যথায় না।
নব্বই দশকের সময়টা ছিল স্টুডিও ব্যবসার স্বর্ণযুগ। তখনকার সময় মানুষ প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়াও শখের বসে স্টুডিওতে ছবি তুলতে আসতেন। স্টুডিও শিল্পে মন্দাভাব দেখা দেওয়ায় অনেকেই তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে ফটোগ্রাফাররা জীবিকার প্রয়োজনে খুঁজে নিচ্ছেন উপার্জনের ভিন্ন পথ।
বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি ছানাউর রহমান পাটোয়ারী সময়ের আলোকে বলেন, এমনিতেই স্টুডিও ব্যবসা মন্দা। এ ব্যবসা এখন মোবাইলের পেটে। তার ওপর করোনার ধাক্কার সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মানুষজন ভয়ে স্টুডিওতে আসতে চায় না। ঘরে বসে মোবাইলে ছবি তুলে প্রিন্ট করে নেয়। সেলফি আর ডিএসএলআরের যুগে স্টুডিও ব্যবসার অবস্থা একেবারেই যাচ্ছেতাই।
বিপিএ জানায়, রাজধানী ঢাকার প্রায় এক হাজার স্টুডিও ও চারশ ডিজিটাল ল্যাব আছে। এ সংখ্যা আগে বেশি ছিল। দিন দিন তা কমছে। আর সারাদিনে এখন আগের থেকে তিন ভাগের এক ভাগ স্টুডিওতে ছবি তুলতে আসেন।
জুবাইয়া ঝুমা একটি চাকরির জন্য রঙিন বড় ছবি তুলেছেন কিছুদিন আগে। কিন্তু সবশেষ এমন ছবি কবে তুলেছেন মনে করতে পারছেন না তিনি। ছবিটি বাধ্য হয়েই তুলেছেন। শখের জন্য তার মত অনেকেই মোবাইলে সেলফি তোলেন। তাহরিমা মাহজাবিন নামে একজন তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি, পরিবারের সবাই মিলে বাইরে বেড়াতে যাই। আব্বু বললেন, ‘চল স্টুডিওতে গিয়ে কিছু ছবি তুলে রাখি’। আমার ছোট বোনের তখন মাত্র চার বছর। শুরুতে খুব আগ্রহী ছিল সে। কিন্তু যেই কয়েকটা লাল লাইট জ্বালিয়ে দিল, অমনি কি কান্না! পরে অনেক বুঝিয়ে তাকে আম্মুর কোলে বসিয়ে একটা ফ্যামিলি ফটো তুলে বাসায় আসি। আর এখনকার বাচ্চারা ছবি তোলার কথা শুনলেই মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বাহারি পোজ দেয়। কিন্তু আগের ছবির মধ্যে ভিন্ন এক আবেগ কাজ করত। আগে স্টুডিওতে একটা ছবি তুললে কয়েকদিন পর ডেলিভারি দিত। কবে সেই নির্দিষ্ট তারিখটা আসবে, সেই অপেক্ষায় থাকতাম। মোবাইলের যুগে সেসব এখন অনেক মিস করি। দুই হাজার সালের গোড়ার দিকে বিশ^বিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে অনেক ছবি তুলেছেন বেসরকারি চাকুরে কায়কোবাদ। তার ছবিগুলো এখনও অ্যালবামের ভাঁজে বন্দি। এখন তার বিবাহবার্ষিকী কিংবা সন্তানের জন্মদিন উপলক্ষেও স্টুডিওতে যান না। স্ত্রী সন্তানরাও স্টুডিতে যাওয়ার আবদার করে না।
শিক্ষার্থী মেহেরুজ্জামান বলেন, শেষ স্টুডিওতে গিয়েছি অনার্স ভর্তি পরীক্ষার ছবি তুলতে। এরপর আর স্টুডিওতে আর যাওয়া হয়নি। এখন বেশিরভাগ ছবি মোবাইল ফোনেই তুলি। একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সাহেদুজ্জামান সাকিব। গতবছরের শুরুর দিকে একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি তোলার জন্য স্টুডিওতে যান তিনি। ছবি নেওয়ার সময় ছবির পিডিএফ ফাইলটাও ই-মেইলে নিয়ে আসেন। এরপরে বিভিন্ন সময় ছবির প্রয়োজন হয়েছে বটে, তবে স্টুডিওতে যাওয়া লাগেনি তার। পিডিএফ ফাইল থাকায় সহজেই ছবি প্রিন্ট করে নেন।
একসময় নিয়মিতভাবে ছবি তুলতে স্টুডিওতে যেতেন অনেক মানুষ। বিশেষ দিনগুলোয় যেমনÑ ঈদ, পূজা, পহেলা বৈশাখ, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, ১৬ ডিসেম্বর বা ২১ ফেব্রæয়ারিতে অনেকেই স্টুডিওতে যেতেন। এখন সেই ধারা কমে গেছে।
গৃহবধূ প্রিয়সী আমির শখ করে স্বামীর সঙ্গে অনেক ছবি তুলেছেন নব্বই দশকের শেষদিকে। তার ঘরের দেওয়ালে টানানো একটি ছবিতে তিনি শাড়ি পরে বসে আছেন। আর পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ডে গাছ, নদী আর নীল আকাশ। তার মেয়েদের বাঁধানো ছবিও দেওয়ালে শোভিত আছে।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]