ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১ ডিসেম্বর ২০২০ ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ১ ডিসেম্বর ২০২০

পাথর সরবরাহ না করেই ভুয়া চালানে বিল পরিশোধ
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: রোববার, ২২ নভেম্বর, ২০২০, ১১:২১ পিএম আপডেট: ২২.১১.২০২০ ১২:১৯ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 97

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে পাথর সরবরাহের ভুয়া চালান বানিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ভুয়া বিল পরিশোধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংস্থার সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) মো. আফজাল হোসেন (বর্তমানে খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক), সাবেক ডিইএন/২ (পাকশী) মো. আরিফুল ইসলাম (বর্তমানে প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা) ও সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) মো. আবু জাফর মিয়া সুবিধার বিনিময়ে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৫ দফায় এই ভুয়া বিলের টাকা পরিশোধ করেছেন বলে সংস্থার একজন প্রধান প্রকৌশলী তদন্ত কমিটির কাছে লিখিতভাবে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছেন। প্রায় এক বছর আগে ২০১৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এই অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে (উন্নয়ন-৪) প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের প্রভাবে তদন্ত থমকে রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ কারণে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও এক বছরেও তা দেওয়া হয়নি। বরং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অভিযুক্ত ঠিকাদারকেই নতুন করে ১০ কোটি টাকার পাথর সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তদন্ত কমিটির কাছে আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. রমজান আলী তদন্ত কমিটির কাছে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছেন, তিনি ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন। মো. আফজাল হোসেন ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) রাজশাহীতে যোগদানের পর রেললাইনে ব্যালাস্ট (পাথর) সরবরাহকারী একজন ঠিকাদার এবং সফল এন্টারপ্রাইজের মালিকের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তার যোগদানের আগের বিভিন্ন সময়ের ভুয়া চালান প্রস্তুত করে পাথর সরবরাহের চূড়ান্ত বিল প্রদান করায় বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় সোয়া ৩ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
প্যাকেজ জিডি-ডব্লিউ (২)-২-এর আওতায় সফল এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪০০ টাকায় ৩২০০ কিউবিক মিটার পাথর সরবরাহের চুক্তি হয় ২০১৭ সালের ৮ মার্চ। কিন্তু চুক্তিপত্রের সময়সীমা কয়েকবার বাড়ানোর পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তিপত্রের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ১৭৯৯ দশমিক ৮৯ কিউবিক মিটার অর্থাৎ ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ পাথর ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহ করে। চুক্তিপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং চুক্তিপত্রে উল্লিখিত সম্পূর্ণ ব্যালাস্ট (৩২০০ কিউবিক মিটার) সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) রাজশাহী মো. রমজান আলী ওই অসমাপ্ত কাজ চুক্তিপত্রের শর্তানুযায়ী জরিমানাসহ বিল চূড়ান্তকরণের জন্য ডিইএন/২/পাকশী মো. আরিফুল ইসলামকে নির্দেশ প্রদান করেন। এরপর তিনি বদলি হওয়ায় নতুন প্রধান প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক), পশ্চিম, রাজশাহী মো. আবু জাফর মিয়ার নির্দেশে ডিইএন/২/পাকশী মো. আরিফুল ইসলাম যোগসাজশ করে (এসএসএই/পথ/সিরাজগঞ্জ বাজার এবং এসএসএই/কার্য/সিরাজগঞ্জ বাজার পর্যন্ত) ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি ২২৭ দশমিক ১৩ কিউবিক মিটার এবং ২৫ জানুয়ারি ১০৮০ দশমিক ৩৭ কিউবিক মিটার (সর্বমোট ১৩০৭ দশমিক ৫০ কিউবিক মিটার) ব্যালাস্ট সরবরাহের ভুয়া চালান প্রস্তুত করে প্রায় ১০ মাস পর গত বছরের ৩১ জানুয়ারি সফল এন্টারপ্রাইজকে ৮৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকার ভুয়া চূড়ান্ত বিল প্রদান করেছে। তদন্ত কমিটির কাছে দেওয়া বক্তব্যে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলী জানান, এই ব্যালাস্ট যদি সত্যিই সরবরাহ করা হতো তাহলে চালান প্রস্তুতের পর দীর্ঘ ৮ মাসের (০৩.১২.২০১৮ তারিখের) মধ্যে তার দায়িত্বে থাকাকালেই বিল প্রদান করা হতো। কোন সোর্স থেকে কোন যানবাহনে ব্যালাস্ট আনা হয়েছে, কোন কোন স্টেশনের মধ্যবর্তী রেললাইনে ব্যালাস্ট ফেলানো হয়েছে, ওই স্টেশনগুলোতে, রাজশাহী ও পাকশী ট্রেন কন্ট্রোল অফিসে ব্যালাস্ট ট্রেনের চলাচল (মুভমেন্ট) রেজিস্টার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে এটা যে ভুয়া চালান তার সত্যতা বেরিয়ে আসবে। চুক্তিপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রমজান আলীর লিখিত আদেশ থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এবং বিধিবহির্ভূতভাবে আর কোনো ব্যালাস্ট সরবরাহ না নিয়েই অসমাপ্ত কাজটি সমাপ্ত দেখিয়ে এই ভুয়া বিল প্রদান করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তা ছাড়া মাত্র এক দিনে ১০৮০ ঘনমিটার পাথর রেললাইনে বিছানো অসম্ভব বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
ঠিক এভাবে প্যাকেজে জিডি-ডব্লিউ (২)-৩-এর আওতায় ২০১৮ সালের ১১ মার্চ ২০২০ দশমিক ৫২ কিউবিক মিটার ব্যালাস্ট সরবরাহের ভুয়া চালান প্রস্তুত করে ১০ মাস পর গত বছরের ২৮ জানুয়ারি ১ কোটি ১৯ লাখ ও প্যাকেজ জিডি-ডব্লিউ (২)-৭-এর আওতায় ভুয়া চালানের মাধ্যমে ১০৪২ ঘনমিটারের টাকা পরিশোধ করা হয়। এ ছাড়া সান্তাহার রেলওয়ে সাইডিংয়ে ১০০০ কিউবিক মিটার ব্যালাস্ট সরবরাহের ঠিকাদার সফল এন্টারপ্রাইজ কয়েকবার চুক্তিপত্রের মেয়াদ বর্ধিত করার পরও মাত্র ৪৯৯ কিউবিক মিটার ব্যালাস্ট সরবরাহ করে। চুক্তিপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং চুক্তিপত্রের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ব্যালাস্ট সরবরাহ করতে ঠিকাদার ব্যর্থ হওয়ায় সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রমজান আলী ওই অসমাপ্ত কাজ চুক্তিপত্রের শর্তানুযায়ী জরিমানাসহ বিল চূড়ান্তকরণের জন্য ডিইএন/২/পাকশীকে লিখিত আদেশ প্রদান করেন। কিন্তু তা না করে তার বদলির পর চুক্তিপত্রের মেয়াদের মধ্যে ৫০২ কিউবিক মিটার ব্যালাস্ট সরবরাহের ভুয়া চালান প্রস্তুত করে গত বছরের জানুয়ারি মাসে ১৭ লাখ টাকা বিল প্রদান করা হয়। একইভাবে প্যাকেজ জিডি-ডব্লিউ (২)-৯-এর আওতায় ভুয়া বিলের মাধ্যমে ৩১ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) রাজশাহীর সময়ে প্রতি ঘনফুট ব্যালাস্টে (পাথর) প্রাক্কলিত মূল্য ছিল ১৭০ টাকা। কিন্তু হঠাৎ করেই নতুন প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) রাজশাহী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম), রাজশাহী প্রতি ঘনফুট ব্যালাস্টের প্রাক্কলিত মূল্য ১৭০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১৫ টাকা করেন, যা দরপত্রের সূক্ষ্ম কারচুপি।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার আশরাফ আলী সময়ের আলোকে জানান, পাথর সরবরাহ না করেই বিল নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলী দায়িত্বে থাকাকালে পাথর সরবরাহ করা হলেও তখন ফান্ড না থাকায় বিল দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। তদন্ত কমিটির কাছে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বক্তব্য দিয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) এবং বর্তমানে মধুখালী থেকে কামারখালী হয়ে মাগুরা শহর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আবু জাফর মিয়া জানান, পাথর ক্রয়ের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিষয়টির দায়িত্ব প্রধান প্রকৌশলীর এবং তিনিই এ বিষয়ে সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি করেন। এ বিষয়ে সংস্থার সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) এবং বর্তমানে খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আফজাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
অভিযোগের বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন-৪) মো. খালেদ হোসেন জানান, তদন্ত চলছে। তদন্ত কমিটির মেয়াদ ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যেই তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। ১০ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো চাপের কারণে এক বছরেও তদন্ত শেষ করা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, অভিযোগ সঠিক নয়। আরও কিছু বক্তব্য নেওয়া বাকি থাকার কারণে তদন্ত শেষ করা যায়নি।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]