ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ২৫ নভেম্বর ২০২০ ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ২৫ নভেম্বর ২০২০

বক্তৃতার আদব ও শিষ্টাচার
প্রকাশ: রোববার, ২২ নভেম্বর, ২০২০, ১১:৪৭ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 37

এএসএম মারুফ বিল্লাহ
ইসলামের জ্ঞান অর্জন ও প্রচার করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। মুসলমান নিজেও সৎ পথে চলবে, অন্যদেরও সৎ পথে চলার প্রতি উৎসাহিত করবে। আর মানুষকে ইসলাম ও সৎ পথে উদ্বুদ্ধ করা কিংবা জ্ঞান বিতরণের প্রধানতম উপায় হচ্ছে বয়ান, বক্তৃতা বা আলোচনা। বক্তৃতার মধ্যে মোহনীয় ও আকর্ষণীয় প্রভাব থাকায় তা মানুষকে দ্রুত প্রভাবিত করে এবং অন্তরকে আকৃষ্ট করে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো কোনো বক্তৃতায় জাদুর মতো প্রভাব থাকে।’ (বুখারি : ৫৪৩৪)। তবে বক্তৃতা করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় লক্ষ রাখা জরুরি। যেন অপ্রয়োজনীয়, অশালীন, চাটুকারিতা ও অসত্য কথা প্রকাশিত না হয়। সে ক্ষেত্রে রাসুলের (সা.) উত্তম জীবনাদর্শ অবশ্যই অনুকরণীয়।
বক্তৃতা ও আলাপ-আলোচনায় অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিহার করা কাম্য। মিতভাষিতা চরিত্রের বিশেষ একটি গুণ। বেশি কথার অবতারণায় সাবধানতা থাকে না, ফলে তা মিথ্যা সৃষ্টি করে, সত্যকে চাপা দেয়। অতিরিক্ত কথা বলার দ্বারা অনেক সময় আত্ম-অহমিকা সৃষ্টি হয়। এমন লোকদের সম্পর্কে আবু সালাবা খুশানি (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়তম এবং তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে নিকটতম হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে চরিত্রবান। আর আমার কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত এবং আমার থেকে সবচেয়ে দূরতম সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক চরিত্রহীন। আর তাদের পরিচয় হচ্ছে তারা বেশি বেশি কথা বলে, অসতর্কভাবে যা তা বলে এবং অহঙ্কার করে থাকে।’ (তাবরানি : ১০৪২৪)।
কেয়ামতের পূর্ববর্তী সময়ে এক দল লোকের চরিত্র হবে এমন, তারা জিহ্বা দিয়ে খাদ্য উপার্জন করবে। জীবিকা নির্বাহ ও পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা লোকের মিথ্যা প্রশংসা করবে এবং কুৎসা রটনা করবে। এতে তারা হালাল-হারামের তোওয়াক্কা করবে না। গাভির সামনে খাবার এলে জিহ্বা দিয়ে টেনে টেনে দাঁত দিয়ে যেভাবে চিবায়; অনুরূপ চাটুকারগণও জিহ্বা দ্বারা পাণ্ডিত্য দেখিয়ে রুজি-রোজগার করে নিজের উদর পূর্তি করবে। এ সম্পর্কে সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত হবে না, যতক্ষণ না এমন এক দলের আবির্ভাব হবে, যারা নিজেদের জিহ্বার সাহায্যে ভক্ষণ করবে যেভাবে গাভি তার জিহ্বার সাহায্যে ভক্ষণ করে থাকে।’ (কানযুল উম্মাল : ৩৮৫৮)।
বক্তব্যে অতিরঞ্জন ও দীর্ঘতা পরিহার করে সংক্ষেপে কেবল প্রয়োজনীয় কথা বলা। দীর্ঘ বক্তব্যের কারণে শ্রোতার অন্তরে বিরক্তিভাব সৃষ্টি হয়। ইসলামের শিক্ষা হলো স্থান, কাল, পাত্রভেদে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করা। আমর ইবনুল আস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি এক দিন বলেছেন, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দিল। তখন আমর (রা.) বললেন, যদি সে তার বক্তব্য সংক্ষেপ করত তবে তার জন্য কল্যাণ হতো। কেননা আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, অবশ্যই আমি দেখেছি অথবা আমাকে আদেশ করা হয়েছে যে, আমি যেন বক্তব্য সংক্ষেপ করি। কারণ বক্তব্য সংক্ষেপ করাই উত্তম।’ (আবু দাউদ : ৫০০৮)।
নিরর্থক বিষয় নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা বা আলাপ-আলোচনা ঠিক নয়। যারা বক্তৃতায় অতিরঞ্জন করে রাসুল (সা.) তাদের অভিসম্পাত করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কথাবার্তায় অতিরঞ্জনকারীরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।’ (মুসনাদু আহমদ : ৩৬৫৫)। কথায় বাড়াবাড়ি করার কারণে মানুষ বিপদে পড়ে যায় এবং ফেতনার সৃষ্টি হয়। সর্বদা সতর্কতার সঙ্গে কথা বলা বুদ্ধিমানের কাজ। ঈমানদার ব্যক্তি কথা বলার সময় সাবধানতা অবলম্বন করবে। যাতে অসমীচীন ও অশালীন শব্দ বের না হয়। ঢালাওভাবে অতিরঞ্জনমূলক বেফাস বক্তব্য নেফাকির অন্যতম একটি শাখা। আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘লজ্জাশীলতা ও জিহ্বা সংযত রাখা ঈমানের দুটি শাখা। পক্ষান্তরে অশ্লীল ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলা নেফাকির দুটি শাখা।’ (মুসনাদে আহমদ : ২২৩১২)। বস্তুত মুনাফিকরাই পাণ্ডিত্যের সঙ্গে অতিরঞ্জনমূলকভাবে অযথা, অপ্রয়োজনীয় ও বেহায়াপূর্ণ কথা বলে এবং বাকচাতুর‌তার সঙ্গে অহেতুক দুর্নাম রটায়।
কোনো ব্যক্তি যদি দুনিয়ার স্বার্থে মানুষের আকর্ষণ পাওয়ার লক্ষ্যে ইলম প্রচারের জন্য অতিরঞ্জন ও বাকপটুতা শিক্ষা ও প্রদর্শন করে তাহলে পরকালীন জীবনে তার জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর পরিণতি। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বক্তব্যের বিভিন্ন বর্ণনাশৈলী শিক্ষা গ্রহণ করে, যাতে সে মানুষের অন্তরসমূহকে আকৃষ্ট করতে পারে; তবে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার কোনো ফরজ ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না।’ (আদাবুল বায়হাকি : ৩১৭)।
সুতরাং যারা ইসলামের জ্ঞান অর্জন করে এবং তা মানুষকে শিক্ষা দেয় তাদের কর্তব্য হচ্ছে, কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে তা করা। দুনিয়ার মোহ যেন তাদের আকৃষ্ট না করে। পার্থিব এ ক্ষণস্থায়ী চাকচিক্য যেন জান্নাতের পথে অন্তরায় না হয়। আল্লাহ সবাইকে সতর্ক থাকার তাওফিক দান করুক।

লেখক : শিক্ষক, ইসলাম শিক্ষা, কেসি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দক্ষিণখান, ঢাকা










সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]