ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৮ নভেম্বর ২০২০ ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ২৮ নভেম্বর ২০২০

শ^াসরোধক অসুখ সিওপিডি
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২০, ১১:৩৪ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 7

ষ অধ্যাপক ডা. মো. রাশিদুল হাসান
ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) অনেক অসুখের সমন্বয়; যার কারণে শ^াসনালিগুলোর ভেতর দিয়ে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। যখন এ অবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন এ অসুখটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অসুখ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
‘সিওপিডি’তে শ^াসনালিগুলো স্থায়ীভাবে সঙ্কুচিত হয়ে যায় অর্থাৎ জীবনে কখনও আর স্বাভাবিক সুস্থ বা প্রসারিত অবস্থায় শ^াসনালিগুলো ফিরে আসে না।
‘সিওপিডি’-এর অর্থ হলো :
সি-অর্থ ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী।
ও-অর্থ অবস্ট্রাকটিভ অথবা বাতাস চলাচলে বাধাগ্রস্ত।
পি-অর্থ পালমোনারি বা ফুসফুসের।
ডি-অর্থ ডিজিজ বা অসুখ।
সিওপিডি একসঙ্গে বলা যায়Ñ ‘দীর্ঘস্থায়ী বাতাস চলাচলে বাধাগ্রস্ত ফুসফুসের অসুখ’ রোগটির ভেতর ৩ রোগ আলাদাভাবে থাকতে পারে অথবা একসঙ্গে ২টা বা ৩টা রোগ থাকতে পারে। তাই এটা একটা গুচ্ছ রোগ। এটা তিনটি রোগ হলো : ১. ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস (দীর্ঘস্থায়ী শ^াসনালির প্রদাহ) ২. পালমোনারি এমফাইসিমা (ফুসফুসের বায়ুথলিগুলোর পর্দাগুলো ধ্বংস হয়ে বড় বড় বায়ুথলি হয়ে যাওয়াÑ ‘এই বড় বড় বায়ুথলি হওয়ার কারণে ফুসফুস দিয়ে বাতাসের অক্সিজেন ভালোভাবে শরীরে প্রবেশ করতে পারে না’ ৩. ক্রনিক অ্যাজমা অথবা দীর্ঘস্থায়ী হাঁপানি।
বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের ২০০৭-এর সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সের প্রতি ৫ জনে ১ জনের সিওপিডি রোগ আছে। সত্যি কথা বলতে কী ৫০ শতাংশ সিওপিডি রোগী জানে না, সে সিওপিডি রোগে ভুগছে এবং এ কারণে বেশিরভাগ রোগী
যথাযথ পদক্ষেপ নেয় নাÑ যে পদক্ষেপগুলো নিলে সিওপিডি রোগী তাদের কষ্ট নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারত এবং রোগের কারণে কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। সঠিক ব্যবস্থা নিলে রোগের কারণে ফুসফুসের কর্মক্ষমতা আরও অনেক ধীরে ধীরে কমত এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিওপিডি নিয়েও কর্মক্ষম জীবনযাপন করার সম্ভাবনা অনেক বাড়ত।
‘হাঁটলে শ^াসকষ্ট হয়’ এটা সিওপিডির প্রধান উপসর্গÑ তাই এ অসুখ মানুষকে ধীরে ধীরে নিষ্কর্মা ও স্থবির করে ফেলে।
উপসর্গটা এমনভাবে শুরু হয় যেমন : তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে, ট্রেনে উঠতে গেলে, বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে গেলে বা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে গেলে আগে শ^াসকষ্ট হতো না; কিন্তু এখন কেমন যেন হাঁপিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর বিশ্রাম না নিলে শ^াস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ধীরে ধীরে এ অবস্থা সৃষ্টি হয় ‘গোসল করলে, কাপড়-চোপড় ইস্ত্রি করলে, কাপড় শুকাতে দড়িতে দিতে গেলে, কেমন যেন হাঁসফাঁস লাগছে’। ধীরে ধীরে শুয়ে থাকতেই ভালো লাগছে, দৈনন্দিন ঘরের কাজগুলোয় শ^াসকষ্ট হচ্ছে।
সিওপিডি রোগীদের জন্য সুসংবাদ হলো যদি আপনি রোগটির সঠিক পরিচর্যা শিখে নেন তাহলেÑ ‘আপনি আপনার কষ্টকে নিয়ন্ত্রণ করে অনেকটা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন।
সিওপিডি নিয়ে যতটা সম্ভব ভালো থাকা নির্ভর করে ৩ জিনিসের ওপরÑ
ষরোগের উপসর্গ বা কষ্টকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
ষএভাবে চিকিৎসার আওতায় রোগকে আনা, যাতে ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতিগুলো এড়ানো যায় বা কম হয়।
ষকর্মক্ষম ফুসফুসকে আরও বেশি কর্মক্ষম রাখতে অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
তাই এ ৩ জিনিসের লক্ষ্য সামনে রেখে নিচের কাজগুলো করতে হবেÑ
ষধূমপান বন্ধ করা এবং ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশে কাজ করা।
ষওষুধগুলোকে বুঝে নেওয়া যাতে নিয়মিত প্রতিষেধক বা বাধাদানকারী ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন এবং উপশমকারী ওষুধ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারেন।
ষপরিকল্পিত ফুসফুসের ব্যায়ামের ভেতর সারাজীবন থাকা (পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম অর্থাৎ ফুসফুস পুনর্বাসন কার্যক্রম)
ষস্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া।
ষনিজের চিকিৎসা ডাক্তারের পরামর্শে সক্রিয়ভাবে নিজের করা (একটি কার্যকরী পরিকল্পনা তৈরি করা) অর্থাৎ নিজের প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো নিজ থেকে মনে করে ব্যবহার করা।
ষএকটি সিওপিডি সাহায্য দলের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা।
ষবার্ষিক অথবা ৩-৫ বছর পরপর ভ্যাকসিন নেওয়া।
সিওপিডি হলে ফুসফুসের পুনর্বাসন কার্যক্রম ছাড়া রোগীকে সুস্থ রাখা সম্ভব নয়।
ফুসফুসের পুনর্বাসন কার্যক্রম বলতে কী বোঝায়?
এটি একটি কার্যক্রম যেখানে ফুসফুসের রোগীরা দলবদ্ধভাবে ফুসফুসের ব্যায়াম শিখে এবং একসঙ্গে সবাই মিলে নিজের ফুসফুসের শক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যায়াম করে। এখানে দলবদ্ধভাবে কাজ করার কারণে এক রোগী অন্যজনের জন্য উৎসাহ হয়।
এ কার্যক্রমে শেখা যায়, কীভাবে অসুখ নিয়ে ব্যায়াম করে সুস্থ থাকা যায়। এ কার্যক্রমের অংশ ৫টি।
ষরোগীকে পরিপূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা অর্থাৎ তার ফুসফুসের রোগ ও তার ক্ষমতা বুঝে নেওয়া।
ষফুসফুস ও শারীরিক ব্যায়ামের প্রশিক্ষণ
ষশিক্ষা কার্যক্রম
ষখাদ্যাভ্যাস উন্নতিকরণ
ষসবসময় মানসিক চাপ কমান ও কমাতে সাহায্য করা।
ফুসফুস পুনর্বাসন কার্যক্রম একটা টিমের মাধ্যমে বা দলবদ্ধরূপে করতে হয়। এ দলে ডাক্তার, নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং প্রশিক্ষণ ইত্যাদি থাকতে পারে।
ফুসফুস পুনর্বাসন কার্যক্রম মানুষের শ^াসকে সহজতর করে, তাদের জীবনের মানকে উন্নত করে, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন এবং হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন কমায়। এ পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পর রোগীরা অনেক সময় তার পূর্ব কাজে ফিরে যেতে পারে যা ছেড়ে দিয়ে ছিল একসময় সিওপিডি বা শ^াসকষ্টের কারণে।
কীভাবে ফুসফুসের পুনর্বাসন কার্যক্রম রোগীকে সাহায্য করতে পারে?
এ কার্যক্রমে শিক্ষা কার্যক্রম আছে :
যেখান থেকে আপনি শিখবেন সহজ ভাষায়Ñ
ষফুসফুস সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য
ষকীভাবে ওষুধ কাজ করে
ষকখন আপনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন
ষকীভাবে নিজেকে হাসপাতালে ভর্তি থেকে বাঁচাতে পারবেন।
এ ফুসফুসের পুনর্বাসন কার্যক্রমে আপনার সঙ্গে দেখা হবে অন্য অনেক মানুষ যাদের সিওপিডি আছে এবং অন্য শ^াসকষ্ট রোগ আছে। এ প্রোগ্রামের মাধ্যমে অন্য রোগীর কাছ থেকে নিজেদের কষ্ট লাঘবের বিভিন্ন তথ্য, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা পরস্পর জ্ঞানের আদান-প্রদান করতে পারবেন।
এ ব্যায়ামের ক্লাসগুলোতে ফুসফুসের পুনর্বাসন কার্যক্রম যেমন বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম
ষদুই হাতের ব্যায়াম
ষদুই পায়ের ব্যায়াম
ষফুসফুসের ব্যায়াম
বেশিরভাগ মানুষ এ শিক্ষা কার্যক্রম, ট্রেনিং এবং নিয়মিত ব্যায়াম করে নিজের দৈনন্দিন কার্যক্রম সহজতর করতে পারে। ফুসফুসের পুনর্বাসন কার্যক্রম কতদিন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হয়?
এ পুনর্বাসন কার্যক্রমে সাধারণত : সপ্তাহে ২ দিন এবং ৮ সপ্তাহ ধারাবাহিকভাবে করা উচিত।
প্রতিটা প্রোগ্রামে থাকেÑ
ষধারাবাহিক শিক্ষামূলক ক্লাস
ষব্যায়াম প্রদর্শনী
ষপারস্পরিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা।
এ কার্যক্রমে প্রথমে রোগীর ইতিহাস নিতে হয় এবং রোগীর ব্যায়াম করার ক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখে নিতে হয়। এ কারণে সাধারণত আমরা ৬ মিনিট হাঁটার পরীক্ষাটি করে নিই। আপনার হাঁটার শক্তি মেপে ঠিক করতে হবে কতটুকু ব্যায়াম দিয়ে এ পুনর্বাসন কার্যক্রমে আপনি চলতে শুরু করবেন। ৮ সপ্তাহ পর ব্যায়াম অনুশীলনের পর আবার হাঁটার পরীক্ষা করে দেখতে হবে আপনার উন্নতি কতটুকু। শেষের পরীক্ষার পর বাসায় প্রতিদিন ব্যায়াম কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]