ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৫ ডিসেম্বর ২০২০ ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ৫ ডিসেম্বর ২০২০

কর্মসংস্থান তৈরি ও দারিদ্র্য দূরীকরণে জাকাত
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২০, ১১:৪২ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 50

হাফেজ হাসানুর রহমান
ইসলামের মৌলিক ৫ স্তম্ভের অন্যতম একটি ফরজ ইবাদত জাকাত। নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে জাকাত আদায় করা আবশ্যক। সারা বছরই যেকোনো সময় জাকাত আদায় করা যায়। বর্তমান সমাজের চিত্র হলো, অনেকেই নামাজ, রোজা ঠিকঠাক আদায় করলেও জাকাতের হিসাব রাখেন না। অথচ পবিত্র কোরআনে ৩২ জায়গায় জাকাতের আদেশ প্রদান করা হয়েছে। তার মধ্যে নামাজ কায়েমের পরই জাকাত আদায় প্রসঙ্গে নির্দেশ এসেছে ২৮ জায়গায়।
অর্থাৎ নামাজের মতোই জাকাতেরও গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা নামাজ কায়েম কর এবং জাকাত আদায় কর।’ (সুরা বাকারা : ৪৩)। অন্য আয়াতে বলেছেন, ‘ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা নামাজ কায়েম করে ও জাকাত আদায় করে।’ (সুরা মায়েদা : ৫৫)
নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে বছর শেষে নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ হকদার অসহায় মানুষকে প্রদান করতে হয়। এই জাকাতকে দান বা সদকা ভাবা যাবে না। এটা ধনীর সম্পদে গরিবের অধিকার। সমাজের মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে
অধিকাংশ সম্পদ রক্ষিত থাকে, অন্যদিকে অধিকাংশ মানুষ মিলে সামান্য কিছু সম্পদ ভোগ করছে। অর্থাৎ ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে আর গরিবদের অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ হচ্ছে।
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মহানবী (সা.) মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু করে সেখানে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই দারিদ্র্যমুক্ত এবং বৈষম্যমুক্ত মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। হজরত আবু বকর (রা.) বলেছেন, ‘যারা একটি উটের রশি পরিমাণ সম্পদও জাকাত দেবে না, তাদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করলাম।’ (বুখারি : ১৩১২)। তার এ ভাষণের মর্মার্থই ছিল দরিদ্রের অধিকার নিশ্চিত করা এবং পুঁজিপতির বিরুদ্ধে ইসলামের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া।
জাকাত মানে পবিত্রতা, শুদ্ধি ও বৃদ্ধি পাওয়া। জাকাত আদায়ের মাধ্যমে ব্যক্তির অবশিষ্ট সম্পদ পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়ে যায়। সম্পদে বরকত বৃদ্ধি পায়। শারীরিক ইবাদতের মধ্যে যেমন নামাজ শ্রেষ্ঠ তেমনি আর্থিক ইবাদতের মধ্যে জাকাত সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ।
জাকাত আদায় না করার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘যারা স্বর্ণ ও রুপা জমা করে এবং সেগুলো আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে কঠিন শাস্তির সুখবর শোনাও। যেদিন তাদের জমানো স্বর্ণ ও রুপা জাহান্নামের আগুনে গরম করে তাদের কপালে, পাশে ও পিঠে ছ্যাঁকা দেওয়া হবে, সেদিন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যা জমা করেছিলে তার মজা ভোগ কর।’ (সুরা তওবা : ৩৪-৩৫)। ধনী-গরিবের মধ্যে সমতা আনতে ইসলামে জাকাতের এ সুন্দর বিধান প্রদান করা হয়েছে। সমাজের মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সব সম্পদ যাতে আটকে না থাকে। সমাজের সব মানুষের মধ্যে একটা সমতা যাতে আসে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের অধিকাংশ ধনীরা জাকাতকে ফরজ ইবাদত  হিসেবে গুরুত্ব দেয় না। জাকাত দিলেও সঠিক হিসাব করে সঠিক লোককে দেয় না। আর যারা জাকাত দেয় তাদের অধিকাংশই লোক দেখানো প্রচার সর্বস্ব দান করে। কোরআন মতে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জাকাত আদায় এবং বণ্টনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করার কথা।
 কিন্তু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ না থাকলে জাকাতদাতারা নিজ উদ্যোগে তার উদ্বৃত্ত সম্পদের হিসাব করে জাকাত দিতে হবে। জাকাত এমনভাবে প্রদান করা উচিত যেন জাকাত গ্রহীতা দ্রুতই স্বাবলম্বী হয়ে যেতে পারে। প্রতিবছর যেন তাকে জাকাত গ্রহণ করতে না হয় বরং ২-৩ বছরের মধ্যে স্বাবলম্বী হয়ে সে নিজেও আবার জাকাত প্রদান করতে পারে।
অনেকে লোক দেখানোর জন্য হাজার হাজর মানুষ জড়ো করে কম দামি লুঙ্গি আর মানহীন শাড়ি দিয়ে বিদায় করেন। অথচ এত লোক জড়ো না করে অল্প কিছু লোককে একটু বড় অঙ্কের মূলধন দিলে তারা নিজেরাও তার মাধ্যমে অল্প দিনেই স্বাবলম্বী হতে পারত।
জাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বপ্রথম নিকটাত্মীয়দের প্রাধান্য দেওয়া উত্তম। জাকাত দেওয়ার সময় আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, আমার সম্পদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের ওপর গরিবের অধিকার রয়েছে। আমি কেবল সেই অধিকারটি পালন করছি। বিষয়টি এমন, জাকাতদাতা হচ্ছেন দেনাদার আর গ্রহীতা হচ্ছেন পাওনাদার। পাওনাদারকে যেভাবে সম্মানের সঙ্গে সময়মতো অর্থ পরিশোধ করতে হয়, ঠিক তেমনিভাবেই জাকাতের অর্থও হকদারকে পরিশোধ করতে হবে।
কর্মঠ গরিবদের আত্মকর্মসংস্থানে সহায়তা করে স্বাবলম্বী করার জন্য জাকাতের অর্থ ব্যয় করার মাধ্যমেই দারিদ্র্যমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব। দ্বীনের প্রসারে ও দ্বীনি শিক্ষার বিস্তারেও জাকাতের অর্থ ব্যয় করা যায়। যথার্থ কারণে ঋণগ্রস্ত এবং ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়লে তাদের ঋণমুক্তির জন্য জাকাতের অর্থ দিয়ে সাহায্য করা যাবে। মুসাফির যদি আর্থিক অসুবিধায় পড়েন, তবে তাকে জাকাতের অর্থ দিয়ে সাহায্য করা যাবে, যদিও তার বাড়ির অবস্থা ভালো থাকে।
ইসলামের সোনালি যুগে জাকাত নেওয়ার মতো লোক পাওয়া যেত না। তখন মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি সব নাগরিক বৈষম্যহীন সামজের গর্বিত সদস্য হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিত। সমাজে শান্তি ও সাম্য সৃষ্টি করতে সবাইকে সারা বছর গুরুত্বের সঙ্গে জাকাতের ফরজ ইবাদত আদায় করতে হবে। এতে পার্থিব জীবনেও সার্বিক কল্যাণ, পরকালেও অফুরন্ত প্রতিদান।











সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]