ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২১ ১৪ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২১

আগুনে পোড়া সাততলা বস্তি : ‘সবাই ভিডিও করে আমগর পরান পুড়ে’
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০, ১১:২৪ পিএম আপডেট: ২৫.১১.২০২০ ১২:০৬ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 119

শীতের সকালের রোদ মুখে এসে পড়েছে। আঁচল দিয়ে মুখের অর্ধেক ঢেকে আছেন শিল্পী আক্তার। পোড়া ঘরের কয়লায় হাত-পায়ে কালি লেগে আছে। আগুনে ঘরের সবই ভস্মীভূত হয়েছে। সাততলা বস্তির ওই পোড়া ঘরের এক কোনায় বসে ঢুকরে কাঁদছেন তিনি। রোদে চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে। দুপুর পর্যন্ত জোটেনি খাবার। রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে সোমবার রাত পৌনে ১২টায়। ঘণ্টাখানেক পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের অক্লান্ত চেষ্টায়। তবে পুড়ে গেছে দেড় শতাধিক ঘর ও দোকানপাট। অগ্নিকাণ্ডে রাকিব ইসলাম নামে এক যুবক দগ্ধ হয়। এর আগে ২০১৬ সালেও সাততলা বস্তিতে আগুন লাগে।
আশপাশের মেস-বাসায় কাজ করতেন শিল্পী। নয় বছর আগে জামালপুর থেকে এসে সাততলা বস্তিতে ঠাঁই নেন। সংসারে দুই মেয়ে। স্বামী কাঁচামালের ব্যবসা করার কারণে ঘরের বাইরে ছিলেন। বাসা-বাড়ির কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন শিল্পী। তবে আগুন লাগার পরপরই সন্তানদের নিয়ে বাইরে চলে আসায় প্রাণে বেঁচে যান। তিনি জানান, তার স্বামী বাইরে থেকে দৌড়ে এসে তাদের বের করেন। না হলে ঘুমের মধ্যে পুড়ে যেতেন।
শিল্পী জানান, ‘জিনিসপাতি হগলই পুইড়া ছাই অইয়া গেল। আমি হাত পুইড়া আর স্বামী গতর খাইটা এইগুলা জুড়াইছিলাম। আমরা বাঁইচা আছি। কিন্তু এখন খাইমু কী? অহনও দুইডা মেয়ের মুখে কিছু দিতে পারলাম না।’
পাশেই বসে রয়েছেন স্বামী। সারারাত ঘুম নেই। ক্লান্ত শরীরে কথাও বলতে পারছেন না। ঘুমানোর জায়গাও পাচ্ছেন না। শিল্পীর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই জড়ো হলেন আরও কয়েকজন।
প্রতিবেদককে বললেন তাদের নাম ও মোবাইল নাম্বার নিতে। একটু বয়স্ক স্বামীহারা রুমা বেগম অঙ্গার হয়ে যাওয়া তার ঘরটি দেখিয়ে বলেন, ‘আমি এই ঘরটাত থাকতাম। ঘরে ম্যালা জিনিস আছিল। আগুনে সব শেষ। পিন্দনের কাপড়টা ছাড়া অহন কিছু নাই। আমার মোবাইল নাম্বারটাও নেও। অহন সবাই ভিডিও করে আর আমগর পরান পুড়ে।’
গোসল করে কি পরবেন বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন রুমা। তিনিও বাসা-বাড়িতে কাজ করতেন। কিন্তু করোনায় কাজ কমে গেছে। এখন যা আয় হয়, তার বেশিরভাগই চলে যায় ঘর ভাড়ায়। করোনার মধ্যেই থাকার জায়গাটাও পুড়ল। একটু সামনে পোড়া দোকানে দুবছরের মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে আছেন মুদি ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম। তার দোকানে চাল-ডাল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসই ছিল। আগুনে তেলের ড্রাম পর্যন্ত পুড়ে গেছে। দীর্ঘশ^াস ছেড়ে বললেন, এসব লিখে আর কী হবে। আমরা পুড়ছি মেয়র-এমপির কী? ছবি তুলেই শেষ।
অনেক কষ্টে শখের কানের জিনিস কিনেছিলেন শিরীন আক্তার। অঙ্গারের মধ্যে তন্ন তন্ন করে খোঁজেন। কিন্তু সবই ছাই হয়ে গেছে। তাড়াহুড়ো করে ভেতরে মোবাইলটাও রেখে বের হয়ে যান তিনি। পুড়ে যাওয়া মোবাইলটা দেখিয়ে বলেন, ‘পোড়ার আর কিছু বাকি নাই। কবে আবার এইগুলা জুড়ায়াম।’ খুব সকাল সকাল পুড়ে যাওয়া নিজের বিয়ের শাড়িটি খোঁজেন বীথি রানী। শাড়িটি নতুনই ছিল। আলনায় যত্নে রেখেছিলেন। পুড়ে যাওয়া শাড়ির অংশ হাতে নিয়ে কাঁদেন তিনি। চার বছর আগে সাততলা বস্তির দক্ষিণ পাশে ছোট্ট একটা রুমে থাকতেন নূরজাহান বেগম। করোনাকাল থেকে স্বামী অসুস্থ। কাল রাতে সবার আগুন লাগার চিৎকার শুনে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। চোখের সামনে দোতলা ধসে নিচে পড়ে যায়। ধসে যাওয়া দেওয়ালের ওপর বসে আহাজারি করছেন তিনি। এই গৃহবধূ জানান, একটি এনজিও থেকে ৩০ হাজার টাকা কিস্তিতে এনেছিলেন। ছোট এক বাক্সের ভেতরে রেখেছিলেন। আগুনে পুড়ে সব ছাই হয়ে গেছে। আট-নয় বছরের আবু বক্কর একই বয়সের দু-তিনজনের সঙ্গে পুড়ে যাওয়া বস্তিতে ঘুরছে। তাদের সবার ঘর পুড়েছে। পাশের এনজিও পরিচালিত একটি স্কুলে পড়ে আবু বক্কর। তার স্কুলব্যাগ-বই সব পুড়ে যাওয়ায় খুব কান্না করেছে। কান্নায় চোখ-মুখ ফুলে গেছে। ক্যামেরা দেখে ছলছল তাকিয়ে থাকে। তার বন্ধু ফাহিমের পরিবার থাকত বস্তির দোতলায়। সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নেমে তারা সবাই রাতে সংক্রমণ ব্যাধি জামে মসজিদে আশ্রয় নেয়।
ক্ষতির দিক থেকে সাততলা বস্তিতে দোকানিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেউ বলছে ১ লাখ, ২ লাখ, এমনকি ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সাহায্যের আশায় সকাল থেকে অপেক্ষা করেছে তারা। তখনও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কেউই আসেননি। তবে ব্র্যাকের উদ্যোগে সহায়তা কার্যক্রমের তৎপরতা দেখা গেছে।
স্থানীয় কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, কাউন্সিলর নিজ উদ্যোগে একটি আবাস ক্যাম্প করেছেন। তিনি বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে কথা বলছেন। খাবার ও সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করছেন।
বস্তিতে লাগা আগুনের কারণ হিসেবে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগকেই দুষছে স্থানীয়রা। এক বৈধ সংযোগ থেকে পুরো বস্তিতে ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ লাইন। যে কারণেই বারবার আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ছে বস্তিবাসীর স্বপ্ন। ফায়ার সার্ভিস সদর দফতরের ডিউটি অফিসার এরশাদ হোসেন জানান, আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পর আগুন লাগার সঠিক কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানা যাবে।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]