ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২৪ জানুয়ারি ২০২১ ১০ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার রোববার ২৪ জানুয়ারি ২০২১

উল্টো পথে গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০, ১১:৪৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 35

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সড়ক পরিবহন আইন পরিবর্তন করেছে সরকার। মামলার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ জরিমানার বিধান রেখে করা হয়েছে নতুন আইন। কিন্তু কিছুতেই সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা করা যাচ্ছে না। এখনও রাজধানীর রাস্তায় প্রতিদিনই উল্টো পথে গাড়ি চলতে দেখা যায়। অনেকেই দ্রুত বাড়ি ফেরার জন্য উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই কাজ করলে রাস্তায় যানজট সৃষ্টি হয়। এতে করে একজনের জন্য হাজারও মানুষ পথের মধ্যে আটকে থাকে। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা বলছে, প্রভাবশালীরা নিয়ম ভাঙছে। তাদের প্রতিহত করার চেষ্টাও হয়েছে। এ কারণে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের শরীরে ক্যামেরা স্থাপনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এই উদ্যোগ সফলতা পায়নি। অনেক ট্রাফিক সার্জেন্ট ও সদস্য পেশাগত সমস্যার ভয়ে প্রভাবশালীদের পথ রোধ করে না।
উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে পার হওয়া সবচেয়ে বেশি অভিযোগ মোটরসাইকেল, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা-ভ্যানের বিরুদ্ধে। শহরের যেকোনো রাস্তায় উল্টো পাশ দিয়ে ট্রাফিক পুলিশের সামনেই যত্রতত্র রিকশা, মোটরসাইকেল, রিকশা-ভ্যান চলছে। এ ছাড়াও সড়কের উল্টো পাশে চলাচল করতে দেখা যায় গণমাধ্যমের স্টিকারযুক্ত গাড়ি, পুলিশের গাড়ি, সরকারি কর্মকর্তাদের বহনকারী গাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গাড়ি, আইনজীবীর গাড়ি, এমপির গাড়ি, মন্ত্রীর গাড়ি। ধৈর্যহীন ক্ষমতাবানরা উল্টো পথে বেশি চলে। উল্টো পথে গাড়ি চালানোয় শুধু আইন অমান্য করাই হয় নাÑ এ কারণে ঘটে দুর্ঘটনাও। উল্টো মানসিকতা যাদের, তারাই সোজা রাস্তায় না গিয়ে উল্টো রাস্তায় চলে। নিয়ম অনুযায়ী সবার সোজা পথে যাওয়ার কথা। কিন্তু আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকায় তারা উল্টো পথে গিয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে।
বিগত ২০১৭ সালের ২৪, ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধা, বাংলামোটর ও তেজগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে ট্রাফিক পুলিশ উল্টো পথে আসা গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। সে সময় উল্টো পথে চলাচলের জন্য মন্ত্রী, এমপি, সচিব, বিচারক, নেতা, পুলিশ ও সাংবাদিকদের গাড়িও আটকায় ট্রাফিক পুলিশ। যার মধ্যে সরকারি গাড়ির সংখ্যাই ছিল বেশি। উল্টো পথে সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রভাবশালীদের গাড়ি বেশি চলে।
রাস্তায় জ্যাম থাকলে জরুরি প্রয়োজনে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, সরকারি বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিপরীত রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের গাড়িগুলো এই সুবিধার অপব্যবহার করছে, এমনকি যাত্রীশূন্য সরকারি গাড়ি উল্টো পথে চলাচলের অনেক নজির রয়েছে। উল্টো পথে গাড়ি চালানোর বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে। কারণগুলো হচ্ছেÑ প্রভাবশালীদের প্রভাব দেখানোর প্রবণতা, রাজনৈতিক প্রতিপত্তি-ছত্রছায়া, অসহনীয় মনোভাব, মিথ্যাচার ও ট্রাফিক পুলিশের উদাসীনতা।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় ছাত্ররা উল্টো পথে চলাচলকারী অনেক ব্যক্তিগত, সরকারি, বেসরকারি, সাধারণ, ভিআইপির গাড়িও আটকে দিয়ে ট্রাফিক বিভাগের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর আবার নিয়ম ভাঙার কাজ শুরু হয়ে গেল। যানজট ও নিরাপদ সড়কের জন্য ঘুষ ও হয়রানি বন্ধ, আলাদা লেন বাস্তবায়ন, প্রভাবশালীদের আইন মান্য করতে বাধ্য করা, চালকের যোগ্যতা যাচাই, গাড়ির ফিটনেস নিশ্চিতকরণ, স্বয়ংক্রিয় বাতি ব্যবহার, অটোরিকশার নিয়ম বাস্তবায়ন, উল্টো পথে গাড়ি চলাচল প্রতিরোধ এবং বিশেষ নির্দেশনা বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক ছিল। কিন্তু তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।
বাংলাদেশের রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে যে আইনের আওতায় থাকতে হয়, সেটার নাম হচ্ছে মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩। যদিও পরে ১৯৯০ সালে এ আইনের কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। এই আইনের আওতায় রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে এর প্রতিটি বিধান মেনে চলতেই হবে। এ আইনে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর সাজা দুই রকমভাবে বলা আছে। আইনের ১৪০ ধারায় সরাসরি বলা হয়েছে, একদিকে চলাচলের রাস্তা (ওয়ানওয়ে) অমান্য করলে ২০০ টাকা জরিমানা হবে। এ ছাড়া ১৪৩ ধারা অনুযায়ী বিপজ্জনক বা বেপরোয়া গাড়ি চালালে এর জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল অথবা ৫০০ টাকা জরিমানা হতে পারে। সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্সও স্থগিত থাকবে। যদি পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে আবার একই অপরাধ করা হয়, তবে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল কিংবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে। মনে রাখতে হবে, উল্টো দিকে গাড়ি চালানো কিন্তু বিপজ্জনক বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর মধ্যেই পড়ে। দণ্ডবিধির ২৭৯ ধারায় বলা হয়েছে, জনসাধারণের ব্যবহৃত কোনো সড়কের ওপর দিয়ে বেপরোয়া বা অবহেলামূলক গাড়ি চালালে তিন বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড কিংবা সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকাসহ উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।
মোটরযান আইন অনুযায়ী, রাস্তায় গাড়ি আইন মেনে চলছে কি না তা দেখার দায়িত্ব পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের। আইনে ট্রাফিক পুলিশকে লাইসেন্সসহ কাগজপত্র যাচাই এবং সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া এবং জরিমানা করার মতো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে তারা। তবে প্রভাবশালীদের কারণে সড়কে নৈরাজ্য বন্ধে ট্রাফিক পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। অন্যদিকে ট্রাফিক বিভাগের বিরুদ্ধে হয়রানি, চাঁদাবাজি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগতো রয়েছেই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, উল্টো পথে গাড়ি চালাতে গিয়ে ধরা পড়লে পুলিশ কোন ধারায় ব্যবস্থা নেবে সেটি তাদের ব্যাপার। পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতারও করতে পারে। তবে যে ধারায় দিক না কেন, আইনের হাত থেকে মুক্তির উপায় কিন্তু সহজ নয়। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতেরও এখতিয়ার রয়েছে তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়ার। তারা আরও বলেন, উল্টো পথে চলা বন্ধ করতে শাস্তি বা জরিমানা নয়, দরকার জনসচেতনতা। ট্রাফিক পুলিশের ওপর ক্ষমতা আর দাম্ভিকতা দেখানো এক ধরনের আভিজাত্যের রেওয়াজ।
ঢাকায় রাস্তায় নামলেই একটি জিনিস পরিষ্কার হয়ে ওঠে, ঢাকাবাসীর কোনো শৃঙ্খলা বোধ নেই। আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে আমাদের নাগরিক অধিকার বোধ, বিশেষ করে নিয়মনীতি বোধের উন্মেষ ঘটেনি। আমরা বরং দিন দিন খুবই বিশৃঙ্খল হয়ে উঠেছি। আমাদের চিন্তায় ট্রাফিক আইন না মানার একটি ব্যাধি ঢুকে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ট্রাফিক আইনের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে ট্রাফিক বিভাগকে কাজ করতে হবে। সেই সঙ্গে সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে। মূল কথা হলোÑ মানুষ সচেতন হলে ও ট্রাফিক আইন মেনে চললে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।

ষ এটিএম মোসলেহ উদ্দিন জাবেদ
      ঢাকা




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]