ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ২২ জানুয়ারি ২০২১ ৮ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার শুক্রবার ২২ জানুয়ারি ২০২১

মুনীর ভাইয়ের প্রতি অন্তিম শ্রদ্ধা
রণেশ মৈত্র
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০, ১১:৪৫ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 50

সংবাদে এ কী হলো? মাত্র কদিন আগে তার সাবেক সাময়িকী সম্পাদক সুসাহিত্যিক খ্যাতনামা সাহিত্য পত্রিকা ‘কালি ও কলম’ সম্পাদক আবুল হাসনাতকে বিদায় জানাতে হলো। আজ ২৪ নভেম্বর সংবাদের মালিক-সম্পাদক প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব আহমেদুল কবীরের সপ্তদশ মৃত্যুবার্ষিকী। বেশ কয়েক বছর আগে চলে গিয়েছেন প্রথম ভারপ্রাপ্ত সংবাদ বজলুর রহমান। আর আজ ২৪ নভেম্বর সকালে একটি লেখা লিখছিলাম প্রিয় বৌদি, সংগ্রামী সহযোদ্ধা রাখী দাশ পুরকায়স্থ স্মরণে। হঠাৎ টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ভেসে উঠল সকাল সাতটার পর সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খোন্দকার মুনীরুজ্জামান ঢাকার মুগদা হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা চলাকালে বিদায় নিলেন ইহধাম থেকে।
জানি না, কে দায়িত্ব নেবেন এখন ‘সংবাদ’-এর সম্পাদনায়। তবে পত্রিকাটির সম্পাদনা বিভাগ একটি মারাত্মক সঙ্কটের সম্মুখীন হলো। এই পত্রিকাটিই দেশের প্রাচীনতম দৈনিক এবং পাকিস্তান আমলের দুঃসাহসী প্রগতিশীল আন্দোলনের মুখপত্র রূপে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে এক গৌরবের ইতিহাস রচনা করেছিল। তার কঠিন মাশুলও দিতে হয়েছিল পত্রিকাটিকে। নিষিদ্ধ করেছিল পাকিস্তান সরকার। আবার ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকেই পাকিস্তানি সেনারা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ‘সংবাদ’-এর বংশাল রোডস্থ দোতলা ভবনকে। অতঃপর সামরিক সরকার চাপ দিয়েও খোলাতে পারেনি সংবাদকে। বাংলাদেশ অবরুদ্ধ থাকাকালে। প্রকাশিত হলো মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে বাঙালির বিজয় অর্জনের পর থেকে।
অতঃপর নানা দুর্যোগের মধ্য দিয়েই ‘সংবাদ’-এর দিনগুলো কেটেছে এই স্বাধীন বাংলাদেশেও। দফায় দফায় সামরিক শাসন, সংবাদ ও মতামত প্রকাশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও হুমকি সামাল দিয়েই চলছে পত্রিকাটি। ঘোরতর সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী। এই ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছে প্রাচীনতম এই দৈনিকটি। এককভাবে হাল ধরেছিলেন পত্রিকাটির প্রখ্যাত সাংবাদিক বজলুর রহমান। নানা প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার মধ্যে তিনি সম্পাদকীয় বিভাগসহ সব বিভাগই দক্ষতা, সততা ও নীতি-নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচালনা করে গেছেন।
আহমেদুল কবীরের কথা বলতে চাই না। আমার দৃষ্টিতে তিনি সংবাদের মালিক পার্টির সাবেক নেতা, সুবক্তা বিশেষ করে ঘরোয়া আলোচনায়। আমার ধারণা, তিনি উপযুক্ত নজর দিলে ‘সংবাদ’ আরও ভালো আঙ্গিকে বেরুতে পারত-প্রচার সংখ্যাও যথেষ্ট পরিমাণে বাড়তে পারত। আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি সংবাদ যদিও একটি সংবাদপত্র তবু সংবাদ মানে সংগ্রাম, সংবাদ মানে অকুতোভয় যোদ্ধা। সংবাদ যুদ্ধ করে চলেছে সেই ১৯৫৫ সাল থেকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, অশিক্ষা-কুশিক্ষা-দারিদ্র্য-বেকারত্বের বিরুদ্ধে, নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবর সমঅধিকার ও বৈষম্যমুক্ত, কূপমণ্ডকতামুক্ত একটি শোষণহীন সাম্যের সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘সংবাদ’-এর যুদ্ধ অবিরাম-আপসহীন ও দুঃসাহসী ১৯৭২-এর সংবিধানের চার মৌলনীতি অক্ষুণ্ন রাখা এবং ১৯৭৫ পরবর্তী পর্যায়ে সংবিধানে সৃষ্ট তাবৎ আবর্জনামুক্ত করায় প্রত্যয়ী।
‘সংবাদ’-এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ১৯৫৫ সাল থেকে। সেই থেকে আজতক ৬৫ বছর ধরে ‘সংবাদ’-এর সঙ্গেই আছি। থাকবও বাদ বাকি কয়টা দিন। ‘সংবাদ’ পেয়েছে জহুর হোসেন চৌধুরী, রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত, শহীদুল্লাহ কায়সার, তোয়াব খানসহ প্রায় সব দিকপাল সাংবাদিক সাহিত্যিককে যেমন আলাউদ্দিন আল আজাদ, কে জি মুস্তফা মেনন? সবাই স্মরণীয়-সবাই বরণীয় আমিও নিজেকে ধন্য মনে করি ওইসব দিকপাল সাংবাদিকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুবাদে। তোয়াব তাই আজও সক্রিয় জনকণ্ঠে, উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে বাদবাকি সবাই লোকান্তরিত।
বাংলাদেশে সাংবাদিক তৈরির কারখানা ছিল ‘সংবাদ’-এর বংশাল রোডের সাবেক কার্যালয়টি। যে কার্যালয় গুঁড়িয়ে দিয়েছিল রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশে আজও খ্যাতনামা কোনো সাংবাদিক খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি সংবাদ থেকে সাংবাদিকতার শিক্ষা গ্রহণ করেননি। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সংবাদ দেশের সাংবাদিক তৈরির সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেনি-বোধ করি সে চেষ্টাও করেনি। দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমান চাপে আজ যে আর আগের মতো ব্যয়ে কোনো সাংবাদিক কর্মচারীর দিন চলতে পারে না। সাবেকী ধরনের অঙ্গসৌষ্ঠব, মেকআপ, প্রিন্ট প্রভৃতি বজায় রেখে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ‘সংবাদ’ যে পাঠকপ্রিয়তা বাড়তে পারবে না। আশা করব সংবাদের বর্তমান মালিক তা উপলব্ধি করবেন এবং সে ব্যাপারে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। দেশের স্বার্থে প্রগতির সঙ্গে, শিশু-সাহিত্যের স্বার্থে এটার প্রয়োজন।
সংবাদের বংশাল রোডের কার্যালয় ছিল বামপন্থি রাজবন্দিদের ঢাকা জেল থেকে মুক্তির পর প্রথম মিলনস্থল ও অনেকের বাড়ির মতো থাকারও জায়গা। সারা প্রদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আটক রাজবন্দিদের একটি বড় অংশকে এনে রাখা হতো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাই ঢাকার বাইরের যে রাজবন্দিরা মুক্তি পেতেন তাদের ২-১ রাত ‘সংবাদ’ অফিসেই থাকতে হতো। আমি পাবনাস্থ সংবাদদাতা, বংশাল অফিসে ১৯৫৯-৬০ সালে ডেস্কে সাব-এডিটর, পরে আবারও পাবনা সংবাদদাতা এবং ২০০১ থেকে এ যাবত কলাম লিখে চলেছি? না, কোনো বৈষয়িক প্রাপ্তি সংবাদ থেকে কোনোদিন ঘটেনি-তবু
আকর্ষণ কমেনি।
মুনীরুজ্জামান যাকে মুনীর ভাই বলে ডাকতাম। তাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ‘সংবাদ’ নিয়ে বিশাল পটভূমি হিসেবে লেখাটি দাঁড়িয়ে গেল। পাবনাতে থাকাতে ব্যক্তিগত যোগাযোগ মুনীর ভাইয়ের সঙ্গে তেমন একটা হতো না। তবু প্রতিটি সাক্ষাৎ ছিল আনন্দের। কর্তব্যনিষ্ঠা ও আদর্শ বজায় রেখে রাজনীতির বাইরে এসেও সংবাদকে করে নিয়েছিলেন আদর্শ প্রচারের মূল বাহনে। বিপ্লব পিয়াসী মুনীর ভাইকে তাই ভুলতে পারব না।

ষ  সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]