ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ২২ জানুয়ারি ২০২১ ৮ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার শুক্রবার ২২ জানুয়ারি ২০২১

ভাস্কর্য : ইসলাম কী বলে
মুজতাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০, ১০:৪৯ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 164

 মানুষের জন্য ইসলাম স্বমহিমায় চিরভাস্বর একটি ধর্ম। ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা এ মূল্যবোধ ধারণ করেন পূর্ণ মাত্রায়। অপার সৌন্দর্য ও মানবতাবোধ ইসলামের মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি করে। তবে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা, স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তার গÐি অতিক্রম করে নতুন কিছু সৃষ্টির সুযোগ নেই ইসলামে। ইসলামের এই স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় ‘হারাম’ বলে একটি পারিভাষিক রক্ষাকবচ রয়েছে। হারাম থেকে বাঁচতে এর নিকটবর্তী না হওয়ারও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দুয়ের মাঝে রয়েছে বহু সংশয়পূর্ণ বিষয়Ñ যা অনেকেই জানে না। যে ব্যক্তি সেই সংশয়পূর্ণ বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে সংশয়পূর্ণ বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তার উদাহরণ সে রাখালের ন্যায়, যে তার পশু বাদশাহর সংরক্ষিত চারণভ‚মির আশপাশে চরায়, অচিরেই সেগুলো সেখানে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেনে রাখো যে, প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। আরও জেনে রাখো যে, আল্লাহর জমিনে সংরক্ষিত এলাকা হলো তাঁর নিষিদ্ধ কাজসমূহ। জেনে রাখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরো আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখো, সে গোশতের টুকরোটি হলো কলব।’ (বুখারি : ৫২)
বর্তমান সময়ে দেশে আলোচিত বিষয় ভাস্কর্য। ভাস্কর্য বা মূর্তি সাধারণত তিন ধরনের। ১. জড়বস্তুর ভাস্কর্য। যেমন ফুলের ভাস্কর্য বা মিনারের ভাস্কর্য। এগুলো নির্মাণ করা বৈধ। এর মাধ্যমে শহর বা এলাকার সৌন্দর্য বর্ধন করা যেতে পারে। ২. অমুসলিমদের ইবাদতখানায় প্রাণী
আকৃতির যে ভাস্কর্য বা মূর্তি তৈরি করা হয়, যেগুলো পূজা বা ইবাদত করার জন্য তৈরি করা হয়, সেগুলোকে সাধারণত প্রতিমা বলা হয়। এ ধরনের ভাস্কর্য বা প্রতিমা তৈরি হারাম বা নাজায়েজ। ইবাদতের নিয়তে এগুলো নির্মাণ করা হলে ঈমানই থাকবে না। ৩. আরেক শ্রেণির ভাস্কর্য আছে যা ইবাদতের জন্য বানানো হয় না এবং জড়বস্তুও না; তবে প্রাণী আকৃতির। যেমন মহান কোনো ব্যক্তির ভাস্কর্য, যা তার প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান নিবেদন বা তাকে স্মরণের জন্য বানিয়ে রাখা হয়, ইবাদত বা পূজা করার জন্য নয়। এ ধরনের ভাস্কর্য তৈরি করলে ঈমান চলে যাবে না, তবে কবিরা গুনাহ হবে। এই প্রকারের ভাস্কর্য নির্মাণ করা আল্লাহ তায়ালার নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের অন্যতম উপসর্গ। এর মাঝে পরোক্ষভাবে নিহিত রয়েছে মূর্তি পূজার প্রতি ধাবিত হওয়ার চোরাপথ। এতে করে মানুষের অন্তর থেকে ক্রমেই হ্রাস পাবে মূর্তি ও ভাস্কর্যের অসারতা। মনের অজান্তেই মানুষের অন্তরে স্থান পাবে মূর্তি ও ভাস্কর্য প্রীতি। মুসলিম হয়েও পৌত্তলিকদের মূর্তি পূজোয় অংশগ্রহণে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ হবে না মনে। সময়ের ব্যবধানে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নির্মিত ভাস্কর্যই পরিণত হবে একান্ত পূজনীয় উপাস্যরূপে। মানুষ ভুলে যাবে ঐশী গ্রন্থ কুরআনুল কারিমের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, ‘নিশ্চয়ই শিরক করা ভয়াবহ জুলুম।’ (সুরা লুকমান: ১৩)। ভুলে যাবে মহা গ্রন্থ আল কোরআনের কঠিন সতর্কবাণী, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করবেন না, তবে এ ছাড়া অন্যান্য (গুনাহ) যার জন্য ইচ্ছা, ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরিক করেছে, সে ভয়াবহ গোমরাহীতে লিপ্ত হয়েছে।’
এর জ্বলন্ত প্রমাণ মেলে কোরআন, হাদিস, তাফসির ও ইতিহাসের পাতা উল্টালে। হজরত নূহ (আ.)-এর যুগে পৃথিবীতে প্রথম ভাস্কর্য নির্মাণের সূচনা হয়। তাঁর সম্প্রদায় নির্মাণ করেছিল পাঁচটি ভাস্কর্য। তারা সেগুলোর পূজা করত। নূহ (আ.) তাদেরকে একত্ববাদের দাওয়াত দিলে ঔদ্ধত্যভরে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, নূহ বললেন, হে আমার রব! ওরা আমার কথা অমান্য করেছে এবং এমন ব্যক্তির আনুগত্য করেছে, যার সম্পদ ও সন্তানসন্ততি কেবল তা ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে। আর ওরা ভয়ানক চক্রান্ত করেছে এবং বলেছে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদের কিছুতেই ত্যাগ কর না এবং ত্যাগ কর নাÑ ‘ওয়াদ’, ‘সুয়াআ’, ‘ইয়াগুছ’, ‘ইয়াউক’ ও ‘নসরকে’। এভাবে ওরা পথভ্রষ্ট করেছে বহু মানুষকে। (সুরা নুহ : ২১-২৪)
এর ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন, মুহাম্মদ ইবনে কাব (রহ.) বলেন, হজরত আদম (আ.)-এর পাঁচ পুত্র ছিল, পর্যায়ক্রমে তারা হলেনÑ ১. ওয়াদ। ২. সুয়াআ। ৩. ইয়াগুছ। ৪. ইয়াউক ও ৫. নসর। তারা ছিল ইবাদতগুজার বান্দা। এক দিন তাদের একজন মৃত্যুবরণ করে। এতে সবাই ব্যথিত হয়। ইতোমধ্যেই শয়তান এসে বলে, আমি তোমাদের জন্য তার একটি প্রতিকৃতি বানিয়ে দেই। তোমরা তা দেখে তাকে স্মরণ করবে। তারা তার কথায় সম্মতি জানায় এবং তাকে তাদের ভাইয়ের প্রতিকৃতি বানানোর অনুমতি দেয়। ফলে শয়তান মসজিদে পিতল ও সিসা দ্বারা তার প্রতিকৃতি বানিয়ে দেয়। এরপর আরেকজন মৃত্যুবরণ করলে সে তারও প্রতিকৃতি বানায়। একের পর এক সবাই মৃত্যুবরণ করে। শয়তান তাদের সবার
প্রতিকৃতি নির্মাণ করে। সময়ের পরিক্রমায় তারা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দেয়। শয়তান তাদেরকে নিন্দার স্বরে বলে, কী ব্যাপার! তোমরা দেখি কোনো কিছুরই ইবাদত করছ না? উত্তরে তারা বলে, আমরা কিসের ইবাদত করব? শয়তান উত্তরে বলে, তোমাদের এবং তোমাদের বাপ-দাদাদের প্রভুসমূহের ইবাদত করবে। তোমরা কি তোমাদের এবং তোমাদের বাপ-দাদাদের প্রভুদেরকে তোমাদের মসজিদে দেখ না? তোমাদের বাপ-দাদারা এদেরই ইবাদত করেছে। তখন আল্লাহ তায়ালা হজরত নূহকে (আ.) প্রেরণ করেন। নূহ (আ.) তাদেরকে একত্ববাদের দাওয়াত দিলে তারা তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে তারা বলে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদের কিছুতেই ত্যাগ কর না এবং ত্যাগ কর নাÑ ‘ওয়াদ’, ‘সুয়াআ’, ‘ইয়াগুছ’, ‘ইয়াউক’ ও ‘নসরকে’। (তাফসিরে কুরতুবি : ১০/৫০৮)
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, যে প্রতিমার পূজা নূহ (আ.)-এর কওমের মাঝে প্রচলিত ছিল, পরবর্তী সময়ে আরবদের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল। ‘ওয়াদ’ দাওমাতুল জান্দাল নামক স্থানে অবস্থিত কালব গোত্রের একটি দেবমূর্তি। ‘সুয়াআ’ হলো হুযায়ল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং ‘ইয়াগুছ’ ছিল মুরাদ গোত্রের, অবশ্য পরবর্তীতে তা গাতিফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল কওমে সাবার নিকটবর্তী ‘জাওফ’ নামক স্থানে। ইয়াউক ছিল হামাদান গোত্রের দেবমূর্তি, নাসর ছিল যুলকালা গোত্রের হিময়ার শাখারদের মূর্তি। এসব নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের কতিপয় নেক লোকের নাম। তারা মারা গেল। তারা মারা গেলে, শয়তান তাদের কওমের লোকদের অন্তরে এ কথা ঢেলে দিল যে, তারা যেখানে বসে মজলিস করত, সেখানে তোমরা কতিপয় মূর্তি স্থাপন কর এবং ওই সব পুণ্যবান লোকের নামানুসারেই এগুলোর নামকরণ কর। সুতরাং তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ওই সব মূর্তির পূজা করা হতো না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলো সম্পর্কে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা করতে শুরু করে দেয়। (বুখারি : হাদিস ৪৯২০)। এভাবেই শ্রদ্ধা ও সম্মানের জন্য বানানো মূর্তিগুলোর পূজা শুরু হলো।
ভাস্কর্য নির্মাণ পৌত্তলিকদের সঙ্গে সাদৃশ্যতার প্রমাণ বহন করে। ইসলাম কোনো বিজাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সাদৃশ্য অবলম্বন সমর্থন করে না। এ থেকে বারণ করে ইসলাম ঘোষণা দিয়েছে ‘যে ব্যক্তি নিজ কাজে-কর্মে কোনো জাতির অনুসরণ করবে কিয়ামতের দিন সে তাদের দলভুক্ত হবে।’ (আবু দাউদ : ৪০৩১)। অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কেয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে তাদের, যারা ছবি বানায় এবং মূর্তি ও ভাস্কর্য নির্মাণ করে।’ (বুখারি : ৫৯৫০)। রাসুল (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, ‘যারা এ জাতীয় প্রাণীর ছবি, মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরি করে, কেয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে, তোমরা যা বানিয়েছিলে তা জীবিত কর।’ (বুখারি : ৫৯৫১)
তাই, আমাদের উচিত এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকা যাতে বিজাতীয়দের সঙ্গে সাদৃশ্য অবলম্বন হয়, আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হন ও তার লানত বর্ষিত হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তার সন্তুষ্টি অনুযায়ী জীবনযাপন করে জান্নাতের অধিকারী হওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]