ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ১৭ জানুয়ারি ২০২১ ২ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার রোববার ১৭ জানুয়ারি ২০২১

ট্রাম্প থেকে জো বাইডেন : মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি
সৈয়দ ফারুক হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০, ১০:৫৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 32

 সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের মত দিয়েছেন। গত সোমবার রিপাবলিকান নেতা নিউ জার্সির সাবেক মেয়র ক্রিস ক্রিস্টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে এ অনুরোধ জানালে তিনি তাতে সম্মতি প্রকাশ করেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ২০ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণ করবেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার মন্ত্রিসভা প্রায় চ‚ড়ান্ত করে ফেলেছেন। এরই মধ্যে দেশটির পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অভিজ্ঞ ক‚টনীতিক অ্যান্টনি বিøঙ্কেনকে বেছে নিয়েছেন। তিনি বৈশি^ক জোটের দৃঢ় সমর্থক এবং বাইডেনের ঘনিষ্ঠতম পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশি^ক মিত্রদের মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, বিøঙ্কেন তা নিরসনের চেষ্টা করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। এ ছাড়া তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে জেক সুলিভান এবং জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে টমাস গ্রিনফিল্ডকে বেছে নিয়েছেন।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ২৩ নভেম্বর সৌদি আরবে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। সৌদি-ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর এ বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৎপরতায় ইতোমধ্যে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন। ইরানকে টেকানোর এ প্রক্রিয়ায় যেকোনো সময় সৌদি আরবও আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে রাজি হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সৌদির দাবি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি না দিলে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা হবে না। যদিও ইসরাইলকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে সৌদি। সম্প্রতি সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রাজপুত্র ফয়সাল বিন ফারহান বলেছিলেন, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক করতে অনেকদিন ধরেই তার দেশ ইতিবাচক। তবে তার আগে ফিলিস্তিনের সঙ্গে ইসরাইলের শান্তিচুক্তি হওয়া আবশ্যক। গত মাসে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও বলেছিলেন, ‘ইসরাইলের সঙ্গে শিগগিরই সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে সৌদি।’ যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আনুক‚ল্য পেতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ বৈঠক সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদের সহায়ক হতে পারে। কেননা বাইডেন বরাবরই ইয়েমেনে সৌদির আগ্রাসন এবং সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাÐের সমালোচক। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করলে এসব ক্ষেত্রে ছাড় পেতে পারেন সৌদির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।
ইসরাইলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্থাপনকে কেন্দ্র করে ভিন্ন এক বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রীতিমতো পরিবর্তনশীল সেখানকার অর্থনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ প্যালেস্টাইনকে বিভক্ত করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রটির জন্মলগ্ন থেকেই আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক কোনো সম্পর্কই ছিল না আরব বিশে^র। উল্টো ইসরাইলকে দখলদার রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে। ইতিহাসের প্রতিটি সময় আরব বিশে^র সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক ছিল সামরিক প্রতিদ্ব›িদ্বতায় পরিপূর্ণ। এই সূত্র ধরে ইসরাইলের সঙ্গে তিনটি যুদ্ধে জড়ায় আরব দেশগুলো। কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধেই সম্মিলিত আরব শক্তির শোচনীয় পরাজয় তাদের মনোবল ভেঙে দেয়। যদিও ওই তিন যুদ্ধেই পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রকাশ্য সমর্থন পেয়েছিল ইসরাইল। তেল আবিবের প্রতি পশ্চিমাদের পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণেই ইসরাইল কর্তৃক জাতিসংঘ বিভক্তি পরিকল্পনার একতরফা বরখেলাপ, ফিলিস্তিনি ভ‚মি দখলের সর্বগ্রাসী প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। তা সত্তে¡ও ফিলিস্তিনিদের নায্য অবস্থানের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল একট্টাই ছিল আরব বিশ^। এই আলোকেই আঞ্চলিক পরিসরে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও দেশটির ক‚টনৈতিক পরিক্রমা ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিগুলো বিশেষত আমেরিকা, ব্রিটেনের মতো দেশগুলোর অকুণ্ঠ সমর্থন ইসরাইলকে দ্রæতই বেপরোয়া করে তোলে। ফলে ক্রমাগত ফিলিস্তিনি ভ‚মি দখল ছাড়াও আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যায় দেশটি। বলা চলে, ইসরাইলি দমন নীতির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক আইন।
এদিকে, ইরানের সঙ্গে ফের পারমাণবিক চুক্তিতে ফেরা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উচিত হবে না বলে মন্তব্য করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই বছর আগে ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। নেতানিয়াহুর এ মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রতি তেল আবিবের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পর্যায়ে সম্প্রতি কয়েকটি আরব দেশ কর্তৃক ইসরাইলের সঙ্গে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসকে একেবারে পাল্টে দিয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক মেরুকরণের এক ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতের অবতারণা হওয়ায় বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আরব দেশগুলো এমন একটি সময় বেছে নিয়েছে, যখন বিশ^ব্যবস্থার কর্তৃত্ব থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়েছে আমেরিকা। এই বাস্তবতা খুব সহজভাবেই যে বিষয়গুলো দৃষ্টিগ্রাহ্য করে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধ ফ্রন্টের সক্ষমতা। কয়েক যুগের মার্কিন ইসরাইলি চাপের মুখে কোণঠাসা হয়ে থাকা ইরান, লেবানল, সিরিয়াসহ তাদের প্রক্সি যোদ্ধারা এই মুহূর্তে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। ফলে ইসরাইলের ওপর মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সামরিক চাপ। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, জাতিসংঘের বিভক্তি পরিকল্পনা মোতাবেক যে ইসরাইল রাষ্ট্রের উৎপত্তি, সেই রাষ্ট্রই এখন মোট ফিলিস্তিনি ভ‚মির ৯৬ শতাংশ নিজেদের দখলে নিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী পূর্ব জেরুজালেমকে দখলে নিয়ে নিজেদের রাজধানীর মর্যাদা দিতে চলেছে। ঠিক এ রকম সময়ে কতিপয় আরব দেশ ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার ফলে আঞ্চলিক মেরুকরণের ফল আরব ভিন্ন আবহ। বিদায় বেলায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানাবিধ বিক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে গভীর থেকে গভীরতর সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সম্ভাব্য প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় না করেই এসব করছে ট্রাম্প প্রশাসন। অনেক ক্ষেত্রে বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বেশ কিছু এজেন্ডা ট্রাম্প প্রশাসন আগে থেকেই আটকে দিতে চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। এ প্রসঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, ‘বিদায় বেলায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণে মার্কিনিরা আজ বিভক্ত ও গভীর সঙ্কটে নিপতিত’।
যদিও নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার তার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তবুও এ সময়ের মধ্যে আবার কোন চাল চালেন, সে আশঙ্কা তো রয়েই গেছে। এ জন্য আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রে দ্রæত কিছু দৃশ্যের অবতারণা হতে পারে বলে অনেকের ধারণা।
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে ইরানের ওপর দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ইরানে হামলাও চালাতে চেয়েছিলেন তিনি। পরে উপদেষ্টারা বিস্তৃত আকারে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা বলে প্রেসিডেন্টকে নিবৃত করেন। তবে ইরাকে ইরানের মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির জন্য বরাবরই ট্রাম্পকে দায়ী করে আসছেন বাইডেন। তিনি ফের ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে ফিরতে চান। কিন্তু তেহরানের বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা তুলতে গিয়ে বিভক্ত কংগ্রেসে বাধার মুখে পড়তে হবে বাইডেনকে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন এবং ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে গুটিয়ে আনার চাপ রয়েছে বাইডেনের ওপর। কিন্তু আরব আমিরাতের সঙ্গে যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি এবং ইয়েমেনে ইরান-ঘনিষ্ঠ হুতি বিদ্রোহীদের সন্ত্রাসী সংগঠন বিবেচনা করে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছেন ট্রাম্প। ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরে অবৈধ ইহুদি বসতি পরিদর্শন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিরা বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে আরেকটি অবৈধ নজির সৃষ্টি হলো। এসব অবৈধ বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্যে ‘মেড ইন ইসরাইল’ লেবেল জুড়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন পম্পেও। ট্রাম্প প্রশাসনের এমন পদক্ষেপ ইসরাইল সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের চেয়ে বেশি আগ্রাসী বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। রাখঢাক রেখেই ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবস্থান নেয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইসরাইলের পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ অবস্থান বাইডেনকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে একপক্ষীয় নীতি ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে আরও ক্ষুণœ করবে। কারণ, পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতিকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশ। ট্রাম্প প্রশাসনের নজিরবিহীন ইসরাইল তোষণ বাইডেন প্রশাসনকে ফিলিস্তিনিদের আস্থার পরীক্ষায় ফেলবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালের নির্বাচনে জিতেছিলেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রতিশ্রæতি দিয়ে। ক্ষমতায় আসার পর পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা অতীতে অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট নেননি। তিনি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তার ভাষায় ‘অন্যায্য’ বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করেছেন।
ন্যাটো জোটভুক্ত দেশ যাতে আরও বেশি ব্যয় করে, সে জন্য তিনি চাপ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সবসময়ই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগের কেন্দ্রে অবস্থান করে। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এনেছেন। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন এসে নতুন নীতি নির্ধারণ করবেন তা এখনও নিশ্চিত নয়। তিনি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের নির্বাচনি প্রতিশ্রæতি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন হোয়াইট হাউস থেকে বিপুল রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে ইসরাইলের ডানপন্থি সরকার। তার বদৌলতেই তিনটি আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিতে পৌঁছাতে পেরেছে তারা। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নিলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জন্য যথেষ্ট ক্ষতির কারণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত সাল্লাই মেরিডোর বলেন, ‘ট্রাম্প শাসনক্ষমতায় থাকলে হোয়াইট হাউস ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার সম্পর্ক আরও বেশি আলোক ঝলমলে হবে। লেবাননের সংবাদপত্র আন্নাহার আল আরাবির কলাম লেখক হিশাম মেলহেম বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে মিসর, সৌদি আরব এবং তুরস্কের স্বৈরশাসকদের জন্য ওয়াশিংটনে কোনো বন্ধু থাকবে না বললেই চলে। বাইডেনের বিজয় ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে সৌদি আরবকে ভাবনায় ফেলতে পারে। কারণ সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে দেখে থাকেন বাইডেন। তার জয়ের পর সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে রিয়াদকে।’ রয়টার্সের নিবন্ধে চীন ইস্যুতে বলা হয়েছে, ‘ট্রাম্পের সময় ‘যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাসে বলা চলে তলানিতে ঠেকেছে।’ ট্রাম্পের দাবি কয়েক দশকের মধ্যে তিনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে চীনের সঙ্গে আংশিক ধাপ-১ বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছানোর আগেই বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন। এ কারণে পরবর্তী ধাপের আলোচনার দরজাও বন্ধ হয়ে যায়। ট্রাম্পের দাবি বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে মার্কিনিদের চীনাদের কাছ থেকে শিখতে হবে। মার্কিনিদের অনেক কর্মসংস্থান নষ্ট হবে। তিনি করোনা মহামারি মোকাবিলায় চীনের ভ‚মিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু করোনা মহামারি মোকাবিলায় ট্রাম্পের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন বাইডেন। তার দাবি চীনে করোনার ভয়াবহতা নিয়ে গোয়েন্দাদের তথ্যে গুরুত্ব দেননি ট্রাম্প। বাইডেনের দাবি ট্রাম্প প্রশাসনের বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণে সুবিধা নিয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের থেকে দূরে সরে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ বৈশি^ক প্রতিষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব হারিয়েছে। চীনের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। বাইডেন বলেন, ‘মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে চীনের ওপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করবেন।’
ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির বেশ কয়েকজন সিনেটর এবং সামরিক জোট ন্যাটো ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার এই সেনা প্রত্যাহারে একমত না হওয়ায় ট্রাম্প তাকে বরখাস্ত করেন। ক্রিস্টোফার মিলার ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি ঘোষণা দেন, আগামী জানুয়ারিতে বাইডেনের ক্ষমতা গ্রহণের আগেই এ দুই দেশ থেকে সব মিলিয়ে সাড়ে সাত হাজার সেনা প্রত্যাহার করা হবে। ইরাক ও আফগানিস্তানে আড়াই হাজার করে সেনা রেখে দেবে যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে চুক্তি করে বেরিয়ে আসতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। বাইডেনের জন্য সে চুক্তি বাতিল করা খুবই কঠিন। ফলে ন্যাটো ও মিত্র দেশগুলোর বিরাগভাজন হতে পারেন বাইডেন। জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতেও বাইডেনকে বেশ জোরালো অবস্থানে দেখা গেছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসায় সারা বিশে^ই বেশ সমালোচিত হয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথমেই নতুন করে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আবারও ফিরতে চান বলে জানিয়েছেন জো বাইডেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনের লক্ষ্য ব্যক্ত করেছিলেন সমগ্র আমেরিকার কাছেই। ‘এই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা। এই জাতিকে রক্ষা করা।’
ট্রাম্পের সমগ্র রাজনৈতিক পদ্ধতির সমালোচনা করে সাবেক এই ভাইস প্রেসিডেন্ট তার এক প্রচারণায় বলেন, ‘রাজনীতি আসলে সাধারণ সাজসজ্জা, ব্যবসা আর মিডিয়ার সামনে কথা বলার চেয়ে অনেক বেশি সম্মানজনক একটি বিষয়। এই কাজগুলো দ্বিধাবিভক্তি আর অসমতা ছাড়া অন্য কিছুই এনে দিতে পারে না।’ মার্কিন জনগণের উদ্দেশে নিজের প্রচারণায় বাইডেন বাইবেলের উক্তি সামনে এনে বলেন, ‘বাইবেল আমাদের বলেছে, ভেঙে পড়ার একটা সময় আছে। নতুন কিছু গড়ার একটা সময় আছে। আর কোনো কিছুর উন্নয়ন করারও একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। আমাদের উন্নয়নের এটাই সময়।’ গ্রিন এনার্জিতে আরও বড় আকারের বিনিয়োগ করার পরিকল্পনাও আছে তার। আর সেই সঙ্গে ট্রাম্পের সময়ে বাড়তে থাকা বর্ণবৈষম্য ও জাতিগত বিদ্বেষ কমিয়ে আনতেও বদ্ধপরিকর বাইডেন। সেই সঙ্গে বাইডেনের শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্য নীতিরও নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত বহন করছে।

ষ ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]