ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২১ জানুয়ারি ২০২১ ৭ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ জানুয়ারি ২০২১

ভয়ঙ্কর ছিনতাই
আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২১, ১১:০৫ পিএম আপডেট: ১৪.০১.২০২১ ১২:০২ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 156

রাজধানীতে ভয়ঙ্কার রূপ ধারণ করেছে ছিনতাইকারীরা। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। রাত কিংবা দিন নয়, যেকোনো সময়ে আতঙ্ক হয়ে হানা দিচ্ছে সাধারণ নগরবাসীর সামনে। কখনও যাত্রী সেজে আবার কখনও মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাই করছে তারা। রিকশাযাত্রী বা পথচারী নারীদের ভ্যানিটি ব্যাগ হ্যাঁচকা টান মেরে নেওয়ার সময় গুরুতর আহত হচ্ছে অনেকে। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর সদস্য বা ভুয়া ডিবি পুলিশ সেজেও ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সর্বশেষ বুধবার ভোর রাতে যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে সাঈদ খোকন মীর (৩০) নামে এক পিকআপ চালক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯ ডিসেম্বর উত্তরায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে জিসান হাবিব (১৮) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী নিহত ও রুহুল আমিন (১৭) নামে আরেক স্কুলছাত্র আহত হন।
সাধারণত ব্লেড, খুর বা ছুরি দিয়ে আঘাত করে ছিনতাই করলেও গুলি করে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। ছিনতাইয়ে বাধা দিতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। গত কয়েক মাসে ছিনতাইকারীদের নৃশংসতায় কলেজছাত্রসহ প্রাণ হারিয়েছে বেশ কয়েকজন। গত কয়েক মাসে পৃথক অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকারী চক্রের শতাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেনÑ রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, সদরঘাট, নিউমার্কেট, মালিবাগ, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ ও কমলাপুর এলাকায় সব থেকে বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বেশিরভাগ ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানা মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে। সাধারণ ডায়েরি নিয়ে ক্ষান্ত হলেও সেগুলো আর তদন্ত হয় না। আবার প্রতিকার না পাওয়ায় বা হয়রানি এড়াতে অনেক ভুক্তভোগী পুলিশের দ্বারস্থ হন না।
তাদের ভাষ্য, সাধারণত বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট ও রেলওয়ে স্টেশন এলাকা ও আশপাশে বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে দেখা যায় না। যার কারণে ছিনতাইকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং বড় ধরনের ঘটনা ঘটাতে সাহস পাচ্ছে।
ডিএমপি উপ-কমিশনার (মিডিয়া) ওয়ালিদ হোসেন সময়ের আলোকে জানান, চলমান করোনার কারণে মানুষের রোজগারের ওপর প্রভাব পড়ায় ছিনতাই কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশ সব ধরনের অপরাধ দমনে সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, মাসিক অপরাধ সভায় রাতে বিশেষ করে ভোর রাতে নগরজুড়ে পুুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে টহল জোরদারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে চুরি ও ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ অনেকটা নির্মূল করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাজধানীতে ছিনতাই উল্লেখ করার মতো বাড়েনি। তবে করোনার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকায় প্রভাব পড়ায় নগরীতে অপরাধ কিছুটা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও সব ধরনের অপরাধীকে প্রতিরোধে সোচ্চার রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। গত মঙ্গলবারও ডিএমপির মাসিক অপরাধসভায় অপরাধীদের প্রতিরোধে রাতে বিশেষ করে ভোর রাতে নগরীতে টহল জোরদারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ সূত্র জানায়, বুধবার ভোর রাতে যাত্রাবাড়ী মাছ বাজার স্ট্যান্ডে পিকআপ চালক সাঈদ খোকন মীর ছিনতাইকারী চক্রের খপ্পরে পড়েন। এ সময় তার কাছে থাকা টাকা ও ফোন ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর সময় খোকন তাদের গতি রোধ করে প্রতিবাদ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এক ছিনতাইকারী তাকে ছুরিকাঘাত করলে তিনি গুরুতর জখম হন। পরে প্রত্যক্ষদর্শীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় মূল ঘাতকসহ ছিনতাইকারী চক্রের ৫ সদস্যকে আটকও করেছে পুলিশ।
নিহতের ভগ্নিপতি ফারুক হোসেন জানান, বরিশাল গৌরনদী উপজেলা বাগমারা গ্রামে শামসুল হক মীরের ছেলে সাঈদ খোকন। এক মেয়ে ও স্ত্রী মালাসহ পরিবার নিয়ে যাত্রাবাড়ী কাজলা নয়ানগর এলাকায় ভাড়া থাকতেন। ভগ্নিপতি বলেন, মঙ্গলবার রাতে যাত্রাবাড়ী মাছ বাজার স্ট্যান্ডে পিকআপ ভ্যান পার্কিং করে বসেছিলেন তিনি। সে সময় কয়েকজন ছিনতাইকারী তার পেটে ছুরিকাঘাত করে তার সঙ্গে থাকা সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে অন্য গাড়িচালকরা তাকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. শাহিনুর রহমান জানান, ছিনতাই করে পালানোর সময় ছিনতাইকারীদের পথ আটকে প্রতিবাদ করেন সাঈদ। এ সময় ছিনতাইকারীদের একজন সাঈদকে ছুরিকাঘাত করে। ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপু, মুন্না, জাহিদুল ও রাসেলসহ ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, এ ছাড়া চোরাই গাড়ি দিয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে গত শনিবার গাজীপুর থেকে চার ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের কাছ থেকে ছিনতাইকাজে ব্যবহৃত প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। গত ৪ জানুয়ারি খেলনা পিস্তল ও ১টি সুইচ গিয়ার চাকুসহ যাত্রাবাড়ী থেকে দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১০। সিএনজির যাত্রীবেশে ছিনতাইয়ের অভিযোগে চক্রের মূলহোতা তাজুল ইসলাম ওরফে তাজুকে (৩০) ২১ ডিসেম্বর গ্রেফতার করে ডিবির ওয়ারী বিভাগ। এর আগে ১ অক্টোবর সন্ধ্যায় মতিঝিল থেকে নজরুল ইসলাম হিরা নামে একজন সাংবাদিক সিএনজিতে উঠিয়ে সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে পোস্তগোলা এলাকায় ফেলে চলে যায় তাজুল। একইদিন মোহাম্মদপুর থানার সাতমসজিদ হাউজিং এলাকায় ছিনতাই করার সময় দেশি অস্ত্রসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-২।
৯ ডিসেম্বর উত্তরায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে জিসান হাবিব নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী নিহত ও রুহুল আমিন নামে আরেক স্কুলছাত্র আহত হন। এ ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ৭ ডিসেম্বর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকা থেকে ছিনতাইকারী চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১০। ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত ৪টি চাকু, ১টি মোবাইল ফোন ও ৮টি ব্লেড উদ্ধার করা হয়। ১ ডিসেম্বর লালবাগ থানার আজিমপুর এলাকায় ছিনতাই করে পালানোর সময় দুজনকে গ্রেফতার করেছে আজিমপুর ফাঁড়ি পুলিশ। ৩০ নভেম্বর মোহাম্মদপুরের জাফরাবাদ এলাকায় গলায় ছুরি ধরে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার দেব দুলাল মিত্র ও মগবাজার এলাকায় চোখে গুঁড়ো মরিচ ছিটিয়ে আরটিভির সাংবাদিক মিথুন চৌধুরীর কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। ৭ নভেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় পৃথক অভিযানে চাকু ও ব্লেডসহ ছিনতাইকারী চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১০। ৫ জুলাই রাজধানীর খিলক্ষেতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই ছিনতাইকারী নিহত হয়।
পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ছিনতাইসহ যেকোনো ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে রাজধানীসহ সারা দেশে নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানে চক্রের অনেক সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু কিছু দিন পরই তারা জামিনে বেরিয়ে একই পেশায় ফিরে আসে। কোনো কোনো ছিনতাইকারীকে ১০ থেকে ১৫ বারও গ্রেফতার করা হয়। কোনোভাবেই তাদের অপরাধ থেকে ফেরানো যায় না। এরপরও নিয়মিতভাবে অভিযান চলমান রয়েছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]