ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২১ জানুয়ারি ২০২১ ৭ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ জানুয়ারি ২০২১

ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি উৎসব আজ
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২১, ১১:১৪ পিএম আপডেট: ১৪.০১.২০২১ ১২:২৪ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 99

পুরো ছাদভর্তি মানুষ। আশপাশের ছাদগুলোতে সবাই ঘুড়ি ওড়ানো নিয়ে ব্যস্ত। এটি ‘বাকাট্টা’ অর্থাৎ ঘুড়ি কাটাকাটির প্রতিযোগিতার দৃশ্য। একজন অন্যজনের ঘুড়ির সুতা কাটার কসরত করে। কে কার ঘুড়ি কাটতে পেরেছে সে প্রতিযোগিতা, ঘুড়ি কেটে ফেলার আনন্দ আর চিৎকার। ‘বাকাট্টা’, ‘বাকাট্টা’ বলে চিৎকার। আতশবাজি পটকা ফোটানোর আওয়াজ। ছাদেই রান্নাবান্নাÑ পোলাও, মুরগি, গরু ও খাসির গোশতসহ নানা আয়োজন। মুক্ত আকাশে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ রঙিন সব ঘুড়ির ওড়াউড়ি। সন্ধ্যার পর আতশবাজির আলোয় আবারও আকাশ ভরে ওঠে। আগুন মুখে নিয়ে খেলা। আকাশে রঙবেরঙের ফানুস। বুধবার দিনভর ঘুড়ি ওড়ানোর পাশাপাশি সন্ধ্যায় বর্ণিল আতশবাজি ও রঙবেরঙের ফানুসে ছেয়ে যাবে বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী ঢাকার আকাশ। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব ‘সাকরাইন’ আজ। বঙ্গাব্দ বর্ষপঞ্জির নবম মাস পৌষ। এই মাসের শেষ দিন গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারের হিসাবে জানুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ। বাংলায় দিনটি পৌষসংক্রান্তি এবং ভারতীয় উপমহাদেশে মকড় সংক্রান্তি নামেও পরিচিত। রঙিন ঘুড়িতে আকাশ রাঙাতে সাকরাইন উৎসবে এবার যুক্ত হচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
‘এসো ওড়াই ঘুড়ি, ঐতিহ্য লালন করি’Ñ সেøাগানে
প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই উৎসব একযোগে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে আয়োজন করা হবে। দুপুর ২ থেকে শুরু হয়ে উৎসব চলবে রাত
৮টা পর্যন্ত।
পৌষসংক্রান্তির এই সার্বজনীন ঢাকাইয়া উৎসব হচ্ছে সাকরাইন। এক কথায় বলা যায়, সাকরাইন হচ্ছে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব। সংস্কৃত শব্দ সংক্রান্তি যা, ঢাকাইয়া অপভ্রংশে সাকরাইন শব্দে রূপ নিয়েছে। ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, গোয়ালনগর, লক্ষ্মীবাজার, সূত্রাপুর, মিলব্যারাক, নারিন্দা, নবাবপুর, ওয়ারী, গেণ্ডারিয়া, পোস্তগোলা, হাজারীবাগ, লালবাগ ও এর আশপাশ এলাকাগুলোয় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে ছোট-বড় সবাই মেতে ওঠে এ উৎসবে। প্রাচীন উৎসবের মধ্যে পুরান ঢাকার সাকরাইন অন্যতম। এটা গোটা দেশে পালিত না হলেও সাকরাইন ঐক্য এবং বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। শুধু ঢাকাতেই নয়; দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পৌষসংক্রান্তির এই উৎসব পালনের রীতি চালু রয়েছে। নেপালে একে বলে মাঘি, থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি মা লাও, মিয়ানমারে থিং ইয়ান, কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান ও ভারতে মকড়সংক্রান্তি।
এই উৎসবকে মাথায় রেখে টানা এক সপ্তাহ পুরান ঢাকার রাস্তাগুলোর অধিকাংশ গলিতে আর খোলা ছাদে হয় সুতা মাঞ্জা দেওয়ার ধুম। রোদে সুতা শুকানোর কাজও চলে পুরোদমে। পুরান ঢাকার বাসিন্দারা জানান, ঘুড়ি উৎসবে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন জৌলুস বেড়েছে, নানারকম জিনিস এসে ঢুকছে। ঘুড়ি বাকাট্টার প্রতিযোগিতা অর্থাৎ কাটাকাটির বিষয়, সেটার জন্য তো আসলে বড় জায়গা লাগে, মাঠ লাগে। ঢাকায় এখন খোলা মাঠ নেই; এখন ছাদে ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো হয়। পুরনো আমলে গান বাজতো মাইকে আর এখন লাউড স্পিকারে গান বাজানো হয়। আগে খিচুড়ি রান্না করা হতো। এখন সেখানে স্থান করে নিয়েছে বিরিয়ানি। এক সময় ঘরে ঘরে মুড়ির মোয়া, বাকরখানি আর পিঠা বানানোর ধুম পড়ত। বর্তমানে এ উৎসবে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানো। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এসব এলাকায় চলে আতশবাজির খেলা। এক সময় সাকরাইনে পুরান ঢাকায় শ^শুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই, বাহারি ঘুড়ি উপহার দেওয়া এবং পিঠার ডালা পাঠানো হতো। ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়ার লোকদের মধ্যে বিলি করার রেওয়াজ ছিল।
এ বছরের আয়োজনে পুরান ঢাকার ৭৫টি ওয়ার্ডের ৭৫ জন কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত আসনের ২৫ জন মহিলা কাউন্সিলরকে ১০০ করে ঘুড়ি সরবরাহ করবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। পরে কাউন্সিলররা সেসব ঘুড়ি ওয়ার্ডের জনসাধারণের মধ্যে বিলি করবেন। নির্ধারিত মাঠ কিংবা বাড়ির ছাদে অবস্থান নিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো উৎসব হবে।
উৎসব আয়োজন প্রসঙ্গে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ২৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মোকাদ্দেস হোসেন জাহিদ বলেন, সাকরাইন উৎসব পুরান ঢাকার ঐতিহ্য। কালের পরিক্রমায় এই ঐতিহ্য পুরান ঢাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু যান্ত্রিক জীবনের বাস্তবতায় আমরা অনেকেই ভুলতে বসেছি। ঢাকার ঐতিহ্য লালন, সংরক্ষণ এবং প্রসারে মেয়র মহোদয় যে রূপরেখা ঘোষণা করেছেন সে ধারাবাহিকতায় আমরা প্রথমবারের মতো এই ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করতে যাচ্ছি। এই উৎসব সবার জন্য উন্মুক্ত, সার্বজনীন বলে তিনি জানান।
সাকরাইন উৎসবেরে বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ঐতিহ্যের সুন্দর, সচল, সুশাসিত ও উন্নত ঢাকা গড়ে তুলতে চাই। আমরা বিশ^াস করি, এই আয়োজন পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ফিরিয়ে আনতে একটি মাইলফলক হিসেবে ভূমিকা রাখবে। আমরা ঘুড়ি উৎসবকে শুধু ঢাকা শহরেই নয়, সারাবিশে^ পৌঁছে দিতে চাই।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]