ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১ ৫ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১

স্বাভাবিক জীবনে ফেরাদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জঙ্গিবাদ ছেড়ে সুন্দর  জীবনে ওরা ৯ জন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৪৫ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 18

মোহাম্মদ সাইফুল জঙ্গিবাদে জড়িয়ে ৩ বছর ছিলেন পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। এলিটফোর্স র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণের পর ফিরে পেলেন পরিবার ও সমাজকে। তাই তো মঞ্চে আয়োজিত আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানেই গর্ভধারিণী মাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভাসালেন একে অন্যকে। আবেগাপ্লুত এমনই চিত্র দেখা যায় আত্মসমর্পণ করা ইঞ্জিনিয়ার শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত ও তার স্ত্রী ডা. নুসরাত আলী জুহির ক্ষেত্রেও। জঙ্গি সংগঠনে জড়িয়ে পড়া মোট নয়জন এভাবেই বৃহস্পতিবার রাজধানীর কুর্মিটোলায় র‌্যাব ফোর্সেস সদর দফতরে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন।
র‌্যাব ফোর্সেস আয়োজিত ‘নব দিগন্তের পথে’ শীর্ষক জঙ্গি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদের কাছে ফুল দিয়ে তারা সমাজের মূল ধারায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।
এ সময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ কখনই জঙ্গিবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় না। অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত মাদক ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের জিরো টলারেন্স নীতিতেই এগোচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
মন্ত্রী বলেন, আমরা শুধু জঙ্গিবাদ কঠোর হস্তে দমন করছি তা-ই নয়, পাশাপাশি ‘ডির‌্যাডিকালাইজেশনের’ মাধ্যমে তাদের ভুল পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন তাদের কৃষি ট্রাক্টর, গরু ও খামারের জন্য অর্থসহ নানা উপকরণ দিয়ে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ওই নয় তরুণ-তরুণীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে নজরদাবি চালানো হয়। জঙ্গি সেজেই তাদের সঙ্গে মিশে পড়ে নজরদারিতে এনে তাদের পথটি যে ভুল, তা তাদের বোঝানো হয়েছে। তাদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনার এটা প্রথম ধাপ।
র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারপারসন খন্দকার ফারজানা রহমান ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সভাপতি আবুল খায়ের।
আত্মসমর্পণ করা জঙ্গিদের মধ্যে ৬ জন জেএমবির এবং ৩ জন আনসার আল ইসলামের সদস্য ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, একের পর এক জঙ্গির উত্থান যখন হচ্ছিল, আমরা সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। তখন দলমত ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আহŸান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সবাই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। মানববন্ধন হয়েছে, সমাবেশ হয়েছে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। স্কুলের শিক্ষার্থীরাও গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়েছিল ‘জঙ্গিবাদকে সমর্থন করি না’। আমরা পঞ্চগড়ে হিন্দু ইস্কন মন্দিরে পুরোহিতকে হত্যা, বৌদ্ধ পুরোহিতকে হত্যা, শিয়া মসজিদে নামাজরত অবস্থায় ঈমামকে গুলির দৃশ্য দেখেছিলাম। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে র‌্যাব এক্ষেত্রে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করেছে। আজ তারই প্রতিফলন এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। জঙ্গিরা ভুল বুঝতে পেরে আজ যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরল সেটি এক অভ‚তপূর্ব দৃশ্য। যারা বিভ্রান্ত হয়েছিল, পথ হারিয়েছিল, যারা ভুল পথে ভুল আদর্শ বুকে নিয়েছিল তারা আজ বাবা-মায়ের কাছে ফিরেছেন। বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, যা অনেক দিন পর দেখছি। এ জন্য র‌্যাবকে ধন্যবাদ জানাই। এ প্রচেষ্টা যেন অব্যাহত থাকে।
র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, আত্মসমর্পণকৃত ৯ জনের মধ্যে ৮ জন আজই তাদের স্বজনদের কাছে ফিরে যাবেন। একজনকে আইনি প্রক্রিয়ার পর তাকেও পরে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, র‌্যাবের অনেকে করোনাকালে আক্রান্ত হয়েও নিয়মিত অভিযান থেকে পিছিয়ে ছিল না। জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে র‌্যাবের নজরদারি ও অভিযান সবসময় জোরালোভাবে চলবে।
অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, পরিবার, সমাজ ও সংঘ একসঙ্গে কাজ করলে জঙ্গিবাদের এই ব্যাধি থেকে আমরা মুক্তি পাব। যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায় তাদের ক্ষেত্রে এফবিসিসিআই পাশে থাকবে।
অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বলা হয়ে থাকে ‘বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা’, এটা শুনতে কেমন বিরক্তি লাগে। কেননা বৈশি^ক সন্ত্রাসবাদপ্রবণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৩ নম্বরে। অথচ ৩০-এর নিচে রয়েছে যুক্তরাজ্য, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ারই তিনটি দেশ। সে হিসাবে বাংলাদেশ অনেক শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্র। বাংলাদেশকে ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণেই টার্গেট করে এসব বলা হয়ে থাকে।
সাংবাদিক আবুল খায়ের বলেন, কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূল সম্ভব নয়। এ জন্য সব পর্যায়ের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সঠিক পথে তরুণ সমাজকে পরিচালিত করতে ভ‚মিকা রাখতে হবে। সবার আগে সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা রাখতে হবে পরিবারকে।
অনুষ্ঠানে জঙ্গি আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার। এ সময় তিনি বলেন, র‌্যাব এক্ষেত্রে মাত্র ২৫.৭ ভাগ কাজ করতে পারে, বাকিটা অন্যদের করতে হবে। আমরা তাদের জঙ্গি থেকে পৃথক করতে চাই। যারা আত্মসমর্পণ করেছেন, তাদের মধ্যে মামুনকে ফার্মেসি, সাইফুল্লাহ ও সোহেলকে গাভি, সাইদুর, হাসান ও সাইফুলকে চাষাবাদের জন্য ট্রাক্টর উপহার দিয়ে পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এ অনুষ্ঠানে জঙ্গিবাদ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কয়েকজন এবং তাদের স্বজনরা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। যখন ফুল দিয়ে আত্মসমর্পণ করছিলেন তখন স্বজনদের দীর্ঘদিন পর কাছে পেয়ে তারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এ সময় জঙ্গিবাদ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা শাওন জানান, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তেই জড়িয়ে পড়েছিলেন উগ্রবাদী এক সংগঠনে। পরে ডা. স্ত্রী নুসরাত আলী জুহির সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়েন। এরপর বিয়ে করে তাকেও সেই জালে জড়িয়ে নেন। সংগঠনের নির্দেশে চার বছর আগে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে পরিবার থেকেও আলাদা হয়ে যান। কিন্তু সে সবই যে ‘ভুল’ ছিল, এখন তা বুঝতে পারছেন তারা। জঙ্গিবাদ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা প্রায় সবাই বলেছেন, প্রথমে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাওয়াত পেয়ে আকৃষ্ট হন। এরপর ধীরে ধীরে তারা জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু র‌্যাবের প্রচেষ্টায় একসময় তারা বুঝতে পারেন যে জঙ্গিবাদের পথটি ভুল। ইসলাম জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না। সমাজ ও পরিবার কেউই জঙ্গিবাদ পছন্দ করে না।
প্রতিক্রিয়ায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইঞ্জিনিয়ার শাওনের বাবা বলেন, আমার অগোচরেই আমার ছেলেটি (শাওন) জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত হয়েছে। সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সমাজে আমার একটি ভালো অবস্থান আছে, কিন্তু ছেলেটির কারণে আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। সব বাবা-মায়ের উদ্দেশে বলব, আপনার সন্তানের প্রতি আরও বেশি যতœশীল হোন। সন্তানের চলাফেরার দিকে আরও বেশি নজর দিন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]