ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১ ৫ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১

মিছার মা
শেলী সেনগুপ্তা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৪৯ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 51

 আমি তমা, ঢাকা বিশ^^বিদ্যালয় থেকে পাস করে যখন ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছিলাম, তখনই বাবা-মা’র বিবেচনায় খুব ভালো ছেলে রাদিবের সাথে বিয়ে হয়ে গেল। চলে এলাম মাধবদীতে।
রাদিব খুব ভালো এবং দায়িত্বশীল স্বামী। ব্যাংকে চাকরি করে। সকালে বের হয়, সন্ধ্যার পর ফিরে আসে। কাজের ফাঁকে ফোনে কথা বলে। খবর নেয় খেয়েছি কি না, অফিসে মজার কিছু হলে ফোন করে আমাকে জানায়। আমার একা মনে হয় না। ওর ব্রাঞ্চের পক্ষে থেকে আমাদের চাইনিজ রেস্টুরেন্টে নিমন্ত্রণ করল। সবাই সস্ত্রীক এসেছে। কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের সাথে কথা বলে বেশ ভালো লাগল।
একজন তো বলল, ‘ভাবি, বাসায় কাজের লোক রাখেননি?’
‘আমি তো কাউকে চিনি না, কাকে রাখব?’
‘আচ্ছা, আমি একজনকে পাঠিয়ে দেব। বয়স্ক মহিলা, রাখতে পারেন।’
‘আচ্ছা।’
রাদিব বলল, ‘ভালোই হবে।’
দু’দিন পর এক মধ্যবয়সি মহিলা এলো। ব্যাংক কলোনির ভাবি পাঠিয়েছে। মহিলার পোশাক আর কথা বলার ধরন বেশ ভালো। সুন্দর কাজ করে। সবসময় হাসিমুখে থাকে।
টাকার কথা জানতে চাইলে বলল, ‘দিয়েন যা হয়।’
রাদিব বলল, ‘মোশারফ ভাবিকে জিজ্ঞেস করো।’
মোশারফ ভাবিকে ফোন করলাম।
তিনি বললেন, ‘খালার তো আসলে তিন কুলে কেউ নেই, টাকার লোভও কম। আপনি এখানকার কাজের রেটে দেবেন।’
ভাবির সাথে কথা বলতে বলতে কেউ যেন কলিং বেল বাজাল। দেখি পাঁচমিশালি শাক হাতে এক মহিলা অস্থিরভাবে বলল, ‘শাক নেন, মিছার মা পাডাইছে।’
‘মিছার মা কে?’
‘আপনাগো বাসার বুয়া, হ্যার নাম তো মিছার মা।’
‘তাই নাকি? জানি না তো?’
আমি হেসে দিলাম। মহিলাও হেসে চলে গেল।
রাতে রাদিবের বুকে মাথা রেখে বললাম, ‘জানো , আজ একটা মজার কাÐ হয়েছে।’
‘কী হলো?’
‘আমাদের কাজের খালার নাম কী জানো?’
‘কী?’
‘মিছার মা।’
‘বলো কী, কারও কি এমন নাম হয়?’
‘খালা যাকে দিয়ে শাক পাঠিয়েছে সে-ই বলল।’
‘অদ্ভুত তো!’
পরদিন খালা আসতেই আমি বললাম, ‘খালা, তোমার নাম কি মিছার মা?’
লজ্জায় লাল হয়ে আঁচলে মুখ ঢেকে বলল, ‘হ, হেতাইনে মিছার মা বইলে ডাকত।’
‘এর কারণ কী? এত নাম থাকতে মিছার মা কেন?’
‘আমারে বিয়া কইরা রাইখাই হেতাইনে যুদ্ধে চইলা গেছেন। কতদিন দেহি না। একবার হেতাইনের দোস্তরা আইলো। রাইতের বেলায়ই আইছিলো, খাইয়া ঘুমাইলো, বেইন্যা কালে যাওনের সময় আমি কইলাম, ‘হেতাইনরে কইয়েন পোলার নাম রাখন লাগল।’
‘তারপর কী হলো?’
‘হুইনাই চইলা আইলেন, কইলো, ‘পোলা অইবো, শরীরের যতœ নিস।’
কইলাম, ‘মিছা কইছি।’
‘ক্যান মিছা কইলি?’
‘আপনেরে দেখতে মন চাইলো।’
‘হেতাইনে আমার থুতনি নাইড়া দিয়া কইলো, হোন রে মিছার মা, এমন মিছা আর কইস না, দেশের কামে যাইতাছি, পিছু ডাহিস না, আইসা হাচা হাচাই তোরে একখান পোলা দিমু, স্বাধীন দেশের বীর পোলা, ততদিন তুই মিছার মা অইয়াই থাক।’
বলতে বলতে মিছার মা’র মুখটা উজ্জ্বল হয়ে গেল, সূর্যের প্রথম আলোতে আলোকিত আকাশের মতো।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নুয়ে গেল হাঁটুর কাছে, ফিসফিস করে বলল, ‘হেইতো গেলো, অহনও আইলো না, আমারে মিছার মা বানাইয়া রাইখা গেলো।’
কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকার পর বলল, ‘আইজ কাম করণের তাগদ নাই, কাইল আইসা কইরা দিমুনে...’
পরাজিত সৈনিকের মতো ধীর পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছে মিছার মা, ভালোবাসার কাছে হেরে যাওয়া মিছার মা।







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]