ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ১৮ জানুয়ারি ২০২১ ৪ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ১৮ জানুয়ারি ২০২১

‘ভাবছিস ব’সে যেদিন গেছে, সেদিন কি আর ফিরবে?
সেইক‚লে কি এই তরী আর ভিড়বে?’
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৪৯ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 10

প্রথম পর্ব
বিশ^কবির এই দার্শনিক তত্ত¡টি মনে  উঠলে হৃদয়টি যেন এক অজানা আশঙ্কায় আঁতকে ওঠে। সমস্ত সৃষ্টি রহস্যের অবিরাম চলার ¯্রােতে খড়কুটার মতো ভেসে চলেছে ‘জীবন-যৌবন-ধনমান’। সকালের প্রস্ফুটিত পাপড়িগুলি বিকালে শুকিয়ে যায়। সবেমাত্র সূর্যের আলো দেখা শিশুটা কৈশোর-যৌবন পেরিয়ে কখন যে বার্ধক্যের দ্বারে পৌঁছে গেল নিজেও জানে না। জন্ম আর মৃত্যুর মাঝেই সৃষ্টির পালাবদল চলছে কোনো এক অদৃশ্য জাদুকরের দক্ষ হাতের খেলায়। সে খেলায় মুহূর্তে কেউ সামনে এসে অভিনয় করছে, আবার চোখের সামনেই বুদবুদের মতো মিলিয়ে যাচ্ছেÑ সীমাহীন অথৈ সাগরের নীল জলরাশিতে। তারপর আর কোনোদিনই তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
জন্ম-মৃত্যুর এই নিয়মে কবে যে শিশু হয়ে মায়ের কোলে এলাম, সেই সন তারিখ সঠিকভাবে বলা সম্ভব না হলেও যতটা জানি জানুয়ারি আঠারো, উনিশশত ঊনচল্লিশ সালে বর্তমান মাগুরা জেলাধীন শ্রীপুর উপজেলাস্থ স্বনির্ভর জোকা গ্রামে আমার জন্ম। এক মধ্যবিত্ত পরিবারের চার সন্তানের আমি দ্বিতীয়। পিতা-মাতা উভয়েই ছিলেন বিদ্যোৎসাহী। জমাজমি, ঘরবাড়ি ও সম্পদ বৃদ্ধি অপেক্ষা সন্তানদের শিক্ষা ও জ্ঞান বৃদ্ধিতে তারা ছিলেন কঠোর সংকল্পবদ্ধ। মা শ্রæতিধর, ধর্মপরায়ণা ও পরিশ্রমী মহিলা; বাবা ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও মিতব্যয়ী। উভয়ের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা সংসারে ছিল না কোনো দায়দেনার বোঝা, মামলা-মোকাদ্দমার ঝামেলা। সংসারে বাড়তি কাজের লোক ছিল না; মা নিজ হাতে সব করতেন এবং ঠিক সময়েই বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতেন। বাড়িতে কাঠের ঢেঁকি ছিল; বাবা গাভী পুষতেন, সারা বছর আমরা দুধ খেতামÑ খাঁটি দুধ।
আমার একমাত্র মামা মুন্সী বদরউদ্দিন অত্যন্ত জ্ঞানী আলেম ছিলেন। তিনি আমাদের প্রাণাধিক ¯েœহ করতেন। শুনেছি আমার বড়ভাই মরহুম জোনাব আলী পড়া মনে রাখতে পারতেন না। ভাইকে পড়িয়ে যাবার সময়, মামা মাকে বলে যেতেনÑ বু’রে তুই কথা ক’টা শুনে রাখ, মনি ভুলে গেলে বলে দিস।’ মা নিজে অক্ষর না চিনলেও তার ভাইয়ের থেকে শুনে পড়া মনে রেখে ছেলেকে পড়াতেন।
আমি বড়ভাইয়ের প্রায় সাত বছরের ছোট। আমার ছেঁড়া-পড়ার বয়সটা কখন শুরু আর শেষ, তা মনে পড়ে না। শিশু বয়সের একটা স্তর থাকে যখন তারা শুধুই বই ছেঁড়ে আর শ্লেট ভাঙে। তাদের জন্য একই বই বারবার আনতে হয়। হাঁটু গেড়ে বসে বইখানা দুহাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলেÑ চোখের পলকে। এই ছেঁড়াতেই শিশু মজা পায় যেন একটা বড় কিছু করে ফেলেছে। মা-বাবা খুব খুশি; পরদিনই আর একখানা নতুন বই এসে হাজিরÑ এই সময়টাকে আমি ‘ছেঁড়াপড়ার’
ক্লাস বলছি।
উনিশশ চুয়াল্লিশে আমার ‘ছেঁড়াপড়া’ ক্লাস শেষ হয়। উনিশশ পঁয়তাল্লিশে আমি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হই। এই শ্রেণিতে যে বইটা পড়েছিলাম তার নাম ‘মুসলিম শিক্ষা’ যার দুটি খÐ ছিলÑ প্রথম খÐে কোনো যুক্তাক্ষর ছিল না। ছিল না বানানের জটিলতা বা ভীতিপ্রদ কোনো শব্দ। দ্বিতীয় খÐে দুই, তিন বা চার বর্ণের ছোট শব্দ, কবিতা ও ছড়া ছিল। আমরা খুবই আনন্দ পেতাম কোরাস সুরে ছড়া আর নামতা পড়ে। শব্দগুলো ছিল আ-কারবিহীন, যেমনÑ বই, দই, কলম ইত্যাদি। ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিতীয় ভাগের সেই দাঁতভাঙা শব্দ, যেমনÑবন্ধ্যা, রন্ধ, বাল্মিকী, ক্ষণজন্মা ইত্যাদি এই বইটায় ছিল না। ফলে ভাষা নিয়ে আমার মনে কখনও ভীতির সঞ্চার হয়নি। অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সাবলীল গতিতে ছোট কবিতা ও ছড়া মুখস্থ করে, অনাবিল আনন্দ পেতাম; আর সেই কারণেই ‘বাংলা’ আমার এত প্রিয় হয়ে উঠেছিল এবং বিশ^বিদ্যালয়ের সেরা ডিগ্রিটাও আমি বাংলাতেই নিয়েছিলাম। আমি যশোর শিক্ষা বোর্ডে বাংলা বিষয়ে প্রধান পরীক্ষক হবার গৌরবও অর্র্র্র্র্জন করেছিলাম। এখানে বলা প্রাসঙ্গিক, বাংলার সাথে সাথে ইংরেজিও আমাকে একই রকম আনন্দ দিত, যে কারণে আমার শিক্ষকতা জীবনে বাংলা এবং ইংরেজি দুটোই সমান প্রিয় বিষয় ছিল। নবম ও দশম শ্রেণিতে আমি বাংলা এবং ইংরেজি পড়াতাম; শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ আমাকে বাংলার সঙ্গে ইংরেজি বিষয়েরও প্রধান পরীক্ষক হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এই গৌরব-ভাগ্যের জন্য আমি আল্লাহকে হাজার হাজার শোকর জানাই।
শিক্ষার ব্যাপারে শিশুমনে কখনও কোনো রকম ভীতির সঞ্চার নয়; লাউয়ের কচি ডগার মতো শিশু আপন বৈশিষ্ট্যে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠবে। তার ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আজকাল নার্সারি, কিন্ডার গার্টেন এবং প্রাইমারিতেও দেখা যায় শিশুর নিজের ওজনের চেয়ে তার পাঠ্যপুস্তকের ওজনই যেন বেশি। শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকেই এ যেন তার ওপর অত্যাচার! অবশ্য বিবেকবানদের আবিষ্কৃত এই নীতিমালাকে অযৌক্তিক বলা যাবে নাÑ তাই বইখাতায় ভর্তি ব্যাগের বোঝা শিশুর পিঠে ঝুলিয়ে আমরা অভিভাবকেরা তাকে পিছনে থেকে আগলে ধরে কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করে চলেছি।
ফিরে আসি শিশুবেলার কথায়; উনিশশ আটচল্লিশ সাল পর্যন্ত আমি আমার জোকা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করি। তখন প্রাইমারি বিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্তই ছিল। আমি আজ অতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি তাদের, যারা সেই সময়ে প্রাইমারিতে আমার শিক্ষক ছিলেন। তারা হলেনÑ বাবু বসন্ত কুমার সরকার, বাবু সুধাংশু কুমার রায়, বাবু তুষ্টুলাল সোম ও জনাব আব্দুর রহমান মোল্লা। আল্লাহ্ তাদের আত্মার শান্তি দান করুন।
জোকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনী পরীক্ষা শেষে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য একজন শিক্ষক আমাদেরকে শ্রীপুরে নিয়ে গেলেন। সেই প্রথম শ্রীপুর হাইস্কুল দেখলামÑ বাপরে! কতবড় স্কুল! আমরা নির্ধারিত আসনে বসলাম; স্যার সঙ্গেই আছেন। দেখলাম প্রত্যেকের আসনে উঁচু বেঞ্চটায় একটা করে কাঠের দোয়াত আটকানো। একজন এসে বোতল থেকে সেই দোয়াতে কালি ঢেলে একটা করে কঞ্জির কলম ও একখÐ চোষ কাগজ রেখে গেলেন। চোষ কাগজ দিয়ে কী হবে বুঝতে না পেরে ভয়ে ভয়ে স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম।
তিনি এগিয়ে এসে একটা কলম নিয়ে কাঠের দোয়াত থেকে কালি তুলে বেঞ্চের ওপর ছিটিয়ে ওই কাগজ দিয়ে চাপ দিলেন আর বললেনÑ এইভাবে তোমরা লেখার ওপর চাপ দেবে, দেখবে বাড়তি কালি আর খাতার ওপর নেই। ভারি মজার ব্যাপার তো!
(ক্রমশ)




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]