ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১ ৫ মাঘ ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১

নরসিংদী পৌর নির্বাচন
নৌকা পেলেন লোকমান  হত্যার আসামি!
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২১, ১১:০৩ পিএম আপডেট: ১৪.০১.২০২১ ১১:২৬ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 20

নরসিংদীর জনপ্রিয় মেয়র লোকমান হোসেন হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি আশরাফ হোসেন সরকার পেয়েছেন নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নরসিংদীর প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেন হয়ে উঠছিলেন গণমানুষের নেতা। শহর থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছিল মেয়র লোকমানের সুনাম, যা
 
ছড়িয়ে পড়েছিল দেশব্যাপী। নরসিংদীর সেই জনপ্রিয় মেয়র লোকমান হোসেন হত্যা মামলারই চার্জশিটভুক্ত এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া আসামিই যখন নৌকা প্রতীক বরাদ্দ পান তখন মারাত্মক হোঁচট খাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘গণভবনে’ স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভায় নরসিংদী পৌরসভায় মেয়র পদে আশরাফ হোসেন সরকারকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ কারণে নরসিংদী জেলা এবং শহর আওয়ামী লীগ ও সব অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী-সমর্থকসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে জানা যায়। তবে এ ঘটনার পর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও দলের সাধারণ সম্পাদকের কাছে আশরাফ হোসেন সরকারের মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগ, পৌর আওয়ামী লীগসহ সব সহযোগী সংগঠনের জেলার সভাপতি-সম্পাদক। তারা এ বিষয়ে একটি লিখিত আবেদন করেছেন। তারা তৃণমূলের সিদ্ধান্ত বিবেচনার আহŸান জানিয়ে প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের ছোটভাই বর্তমান মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামানকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানান ওই চিঠিতে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, জনপ্রিয় নেতা ছিলেন লোকমান হোসেন, নরসিংদীর উন্নয়নে যার বিশাল ভ‚মিকা। জামায়াত-বিএনপির অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন যিনি। আওয়ামী লীগের প্রিয় নেতা লোকমান হত্যার খুনি কীভাবে পৌর নির্বাচনে মনোনয়ন পায় বুঝি না। এর মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের জন্য ভুল মেসেজ যাবে। বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে ভুল তথ্য দিয়ে এই মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ করছেন স্থানীয় নেতারা।
জানা গেছে, জেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে তিনজন প্রার্থীও নাম পাঠানো হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে। এক নম্বরে ছিল নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল। যিনি প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের ছোটভাই। তালিকায় ২ নম্বরে ছিল শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চু ও তিন নম্বরে ছিলেন শহর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান। কিন্তু আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকাÐে ছিল না আশরাফের কোনো সম্পৃক্ততা। যিনি দলের কোনো পদেও ছিলেন না দীর্ঘদিন। সেই বিতর্কিত এবং জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তি, যার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও আছে। সেই আশরাফ সরকার নৌকার মনোনয়ন পাওয়ায় দলের ভেতরেই তীব্র অসন্তোষ চলছে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলছেন, যার হাতে লোকমানের রক্তের দাগ লেগে আছে, তার হাতে হাত মিলাব কীভাবে? আমাদের নেত্রী যেন এই বিষয়টি বিবেচনা করে লোকমানের ভাই বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুলকে মনোনয়ন দিলে নরসিংদীবাসী নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত হবে। আমরা আওয়ামী লীগ মনে প্রাণে করি। আর একজন জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতার খুনির জন্য মানুষের কাছে ভোট চাইতে যাব কীভাবে?
নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পীরজাদা কাজী মো. আলী বলেন, লোকমান হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। সেই কমিটির আহŸায়ক হিসেবে আমি এখনও দায়িত্ব পালন করছি। এখন সেই আমি কি করে লোকমানের খুনি আশরাফ সরকারের জন্য মানুষের কাছে ভোট চাইতে যাব? আমাদের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এই ঘটনায় ধিক্কার দিচ্ছে, কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছে না। আশরাফের মনোনয়ন বাতিল করে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানিয়ে নেত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছি, আশা করছি আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের চাওয়া পূরণ করবেন। একজন খুনিকে দলের মনোনয়ন দেওয়া কেউ কামনা করে না।
নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চু বলেন, ‘আশরাফ হোসেন সরকারের মতো একজন খুনিকে নৌকার প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ায় আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা হতবাক এবং ক্ষুব্ধ। তার এই মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আমরা কেন্দ্রেও চিঠি দিয়েছি। শুধু খুনিই নয় যিনি গত ১০ বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগের কোনো দলীয় পদে নেই, কোনো কর্মসূচিতেও দেখা যায়নি। জনবিচ্ছিন্ন খুনি সেই আশরাফ কীভাবে মনোনয়ন পেলেন, আমরা ভেবে পাই না।
জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান শামীম নেওয়াজ বলেন, আমার ভাইকে যিনি হত্যা করলেন, আদালতে স্বীকারোক্তিও তিনি দিলেন। চার্জশিটও হলো। সেই খুনি এখন নৌকা মার্কার প্রতীক পেলেন। আর আমি এখন জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়ে তার জন্য আমার ভোট চাইতে হবে! আমাদের নেত্রী নিশ্চয়ই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন।
জেলা শ্রমিক লীগের আহŸায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শুধু লোকমান হত্যার আসামিই নয় এই একাধিক মামলার আসামি আশরাফ সরকার। তিনি ২০ বছর ধরে দলের সঙ্গে নেই। এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে মেনে নিতে পারি না। আমরা নিশ্চিত বঙ্গবন্ধুকন্যা আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী একজন খুনিকে মনোনয়ন দিতে পারে না, এটা কেউ ভুল তথ্য দিয়ে করিয়েছেন। নরসিংদীর শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল। যিনি নরসিংদীর প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেন হত্যা মামলার বাদীও। তিনি বলেন আমার ভাইয়ের হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হচ্ছেন আশরাফ সরকার আর ওই মামলার বাদী আমি। এখন আমি আওয়ামী লীগ করি, শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি। এখন ভাই হত্যার বিচার চাইব নাকি নৌকার প্রার্থী সেই ভাইয়ের খুুনির জন্য ভোট চাইব?
লোকমান হত্যা মামলা : ২০১১ সালের ১ নভেম্বর পৌর মেয়র লোকমান হোসেনকে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ হত্যার ঘটনায় নিহতের ছোটভাই বর্তমান মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান কামরুল বাদী হয়ে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা করেন। ওই ঘটনায় আশরাফ হোসেন সরকারকে গ্রেফতার করা হলে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তৎকালীন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মÐল প্রায় দীর্ঘ ৮ মাস তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ২৪ জুন সালাহউদ্দিনসহ এজাহারভুক্ত ১১ আসামিকে বাদ দিয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। এদের মধ্যে মামলার এজাহাভুক্ত তিনজন এবং হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ৯ জন আসামির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এজাহারভুক্ত তিন নম্বর আসামি শহর আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ মোবারক হোসেন, এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি নরসিংদী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবদুল মতিন সরকার, তার ছোটভাই শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি আশরাফ হোসেন সরকারসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে বলা হয়, নাজমুল হাসান ওরফে কিলার শরীফ সরাসরি হত্যাকাÐ সংগঠিত করে ৩০২ ধারার এবং হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করে মোবারক হোসেন ওরফে মোবা, আশরাফুল ইসলাম সরকার, আবদুল মতিন সরকার, হাজী ফারুক ও শাহিন মিয়া ১২০(খ) ধারার অপরাধে সংশ্লিষ্ট থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অভিযুক্ত বাকি আসামি হাজী সেলিম, আওলাদ হোসেন, শিবলী সরকার ওরফে ইশু সরকার, হিরু, মাহফুজুর রহমান ওরফে সবুজ সরাসরি হত্যায় উদ্দেশ্যে সহযোগিতা করে দÐবিধির ৩৪ ধারার এবং হত্যার আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করে আসামি সারোয়ার হোসেন ২০১ ধারার অপরাধ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]