ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

খেলাপি ঋণে ধুঁকছে ব্যাংক খাত
শাহীন হাওলাদার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২১, ১১:০৪ পিএম আপডেট: ১৮.০১.২০২১ ১১:৫৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 18

খেলাপি ঋণের বোঝায় রীতিমতো ধুঁকছে ব্যাংক খাত। করোনার কারণে নতুন করে কাউকে খেলাপি না করতে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য বিদায়ি বছরে কাউকে খেলাপি ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গত এক বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে। এ বিশাল খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ প্রত্যাহার করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবার বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া সঙ্কটকালে বেশি উপকৃত হচ্ছে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা। করোনা সঙ্কটে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দিক বিবেচনায় নানা সুবিধা দেওয়ায় ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উল্টো চিত্র দেখল বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ (সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী) ৯৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণের ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ১৫টি ব্যাংকের।
অন্যদিকে কম সুদে আমানত সংগ্রহ, খেলাপি ঋণ আদায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা জারি, ঋণ বিতরণে অসুবিধাসহ নানা সমস্যায় ভুগছে দেশের ব্যাংকিং খাত। তবে মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণই এখন ব্যাংক খাতের প্রধান ঝুঁকি। সঙ্কটের এ মুহূর্তে ব্যাংকগুলো নীতিগত সুবিধা উপভোগ করলেও স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে এলে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, যেকোনোভাবেই হোক খেলাপি ঋণ আদায় করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গণবিজ্ঞপ্তিতে অনিচ্ছাকৃতদের চেয়ে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরাও পার পেয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের প্রকৃত গ্রাহক কারা তা ভালো করেই জানে ব্যাংকগুলো। তাদের মতে, ক্ষতিগ্রস্তদের সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা উচিত। এভাবে গণসুবিধা দেওয়া হলে আগামীতে ব্যাংকগুলোর টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে জানান, ব্যাংকগুলোর প্রথম পদক্ষেপ হবে খেলাপি ঋণ আদায় করা। আদায় করতে না পারলে তাদের প্রভিশনে প্রভাব পড়ে। এককথায়, এটা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং ঋণ আদায় করা না গেলে অন্তত ঋণের সুদ আদায় করা উচিত। দ্বিতীয় পদক্ষেপ হলো খুব সাবধানে ঋণ দেওয়া। বৃহৎ ঋণের কী অবস্থা ব্যাংকগুলো ভালো করেই জানে। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের বেশি বেশি ঋণ দেওয়া উচিত। কারণ এ খাতে খেলাপি ঋণের রেকর্ড কম। এদের যাচাই-বাছাই করে বেশি বেশি ঋণ দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় বা বাহুল্য ব্যয় আরও কমাতে হবে। বিশেষ করে বিলাসবহুল গাড়ি, ভাড়া নেওয়া অফিসগুলো ছোটখাটো করা, অর্থাৎ লোক দেখানো অফিস না করে ফাংশনাল অফিস করে কাজ চালিয়ে যাওয়া উচিত।
আগেই ঋণখেলাপিরা ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার বড় সুযোগও লুফে নিয়েছে। এই দুই সুযোগকে মূলধন হিসেবে নিয়ে সর্বশেষ সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধাও নিয়েছে অনেকে। সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়। ব্যাংকগুলো নানা উপায়ে প্রভিশন ঘাটতি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে ১২টি ব্যাংকÑ যার পরিমাণ ৯ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতির মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি এবং বেসরকারি আটটি ব্যাংক রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণ না হওয়ায় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতিও রাখা হয়নি। প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ আরও বেশি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং রীতি ব্যাসেল ৩-এর নীতিমালা অনুযায়ী, ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। নিয়মানুযায়ী, একটি ব্যাংকের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি সে পরিমাণ মূলধন রাখতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এসব শর্তও পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে ১১টি ব্যাংক। বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পরও এসব ব্যাংক ১৯ হাজার কোটি টাকা মূলধন সংরক্ষণ করতে পারেনি। ঘাটতিতে থাকা ১১ ব্যাংকসহ ১৭ ব্যাংকেরই মূলধন সংরক্ষণের পরিমাণ কম রয়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে একদিকে খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়া, অন্যদিকে সঙ্কট দির্ঘায়িত হলে ব্যাংকগুলো আগামীতে ভয়াবহ আর্থিক দুর্যোগে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জানা গেছে, সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার বাস্তবায়ন, করোনা ধাক্কায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে উদ্যোক্তাদের টিকে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা নির্দেশনা পরিপালন করতে গিয়ে অধিকাংশ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা কমেছে। এদিকে খেলাপি না হওয়া বা অশ্রেণিকৃত ভালোমানের ঋণে খাতভেদে সাধারণ সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে হয়। দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সাধারণ নিরাপত্তা সঞ্চিতির বাইরে নতুন করে আরও ১ শতাংশ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে নিট মুনাফার ক্ষেত্রে ভীষণ চাপে পড়েছে দেশের ব্যাংকগুলো। কারণ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয় ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা থেকে। অন্যদিকে মুনাফা কমলেও ব্যয় অব্যাহত থাকায় ব্যাংকগুলো এখন নাজুক পরিস্থিতিতে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে ঋণ বিতরণ করতেও হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আবার আমদানি-রফতানিতে ধস নেমেছে। আমদানি-রফতানি কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো আবার দুশ্চিন্তায় পড়েছে। অন্যদিকে অনেক ব্যাংকের আমানত বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ করছে না। পরিচালকদের ও আমানতকারীদের মুনাফা ঠিকই দিতে হচ্ছে এবং পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে।
ব্যাংকাররা জানান, বিদায়ি বছর করোনা হলেও সরকারের নানা প্রণোদনা তহবিল ঘোষণাসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন ছাড় ও সহযোগিতার কারণে ব্যাংকগুলোর ক্ষতি কিছুটা কমেছে। এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এ বছরও ক্ষতি কম হবে বলে মনে করছেন তারা। তবে যে ক্ষতি হবে তা পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর সময় লাগবে বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, ব্যাংক খাতের মূল সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ। তাই সেক্টর বুঝে ক্ষতিগ্রস্তদের সুবিধা দেওয়া উচিত। এভাবে ঢালাওভাবে সুবিধা দিলে সুযোগসন্ধানীরাই বেশি সুবিধা পাবে। এতে ব্যাংকগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সময়ের আলোকে জানান, বর্তমান ব্যাংক খাতের মূল বাধা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ আদায় না হলে ব্যাংকগুলো কীভাবে জনগণের আমানত ফেরত দেবে। এক সময় দেখা যাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যাংকের ক্ষেত্রেও আমানতকারীরা আস্থাহীনতায় ভুগবে। এমন পরিস্থিতি হলে ব্যাংক খাতে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যায়, সবাইকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। আমার মতে, ঢালাওভাবে সুবিধা না দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত কোনো বিশেষ সেক্টরের ক্ষেত্রে বা ক্ষতিগ্রস্তদের সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া।








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]