ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

বিরল বাদ্যযন্ত্র সংগ্রাহক আসলাম
জাহাঙ্গীর কবির জুয়েল ময়মনসিংহ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২১, ১১:০৪ পিএম আপডেট: ১৮.০১.২০২১ ১১:৫২ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 43

একত্রিশ বছর আগের কথা। নবাব অ্যান্ড কোম্পানি নামে দোকানটি ছিল টিনশেড বিল্ডিং। বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয় দোকানটিতে। রেজাউল করিম আসলামের বয়স তখন ১৫। মাঝেমধ্যে দোকানে বসেন। নবাব আলী সাহেব ছিলেন তার দাদা। আসলাম দোকানে গিয়ে টুং টাং করেন। একদিন আসলাম দেখেন মেঝেতে কিছু একটা পড়ে রয়েছে, ভাঙা। বাবার কাছে জানতে চানÑ ওটা কী? বাবা বললেন, ‘ওটা বেহালা। অনেক পুরনো।’ আসলাম সেটা ঠিক করে দেওয়ার বায়না ধরেন। বাবা ঘ্যান ঘ্যান সইতে না পেরে ঠিক করে দেন। আসলাম মহাখুশি, কাছছাড়া করেন না বেহালা।
বংশপরম্পরায় বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে সংসার পেতেছেন রেজাউল করিম আসলাম। তবে তার নেশা বিরল বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের দিকে। অবিরাম এ কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। ইতোমধ্যে ৬শ’রও বেশি বিরল যন্ত্র সংগ্রহে রয়েছে তার। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য চলছে মিউজিয়াম তৈরির কাজ। লোকসঙ্গীতের বিকাশ ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের এই পথে নেমেছেন আসলাম। ময়মনসিংহ শহরে রয়েছে ‘নবাব অ্যান্ড কোং’ নামে তার একটি দোকান।
ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া এলাকার বাসিন্দা আসলাম। তিনি ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সঙ্গীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের বিভাগীয় কমিটিরও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৪৪ সালে তার দাদা নবাব আলী বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা শুরু করেন। সে সময় শহরে ‘নবাব অ্যান্ড কোং’ ছিল দ্বিতীয় বাদ্যযন্ত্রের দোকান। প্রথম দোকান ‘সুরেন অ্যান্ড কোম্পানি’। পরে দোকানমালিক ভারতে চলে যাওয়ার সময় সেতার ও এস্রাজসহ কিছু যন্ত্র দিয়ে যান ‘নবাব অ্যান্ড কোং’কে।
নবাব আলীর পর তার ছেলে জালালউদ্দিন এ ব্যবসার হাল ধরেন। ২০০৬ সাল থেকে দোকানের দায়িত্ব নেন আসলাম। তারপর থেকেই বিরল যন্ত্রপাতি সংগ্রহের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। আসলামের সংগৃহীত বাদ্যযন্ত্রগুলোর অন্যতমÑ একতন্ত্রী বীণা (প্রচলিত নাম একতারা, বাউল, বৈরাগী ও ভিক্ষুকরা যন্ত্রটি বেশি ব্যবহার করেন), সেতার, সারেঙ্গী (পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মীয় ও ভক্তিমূলক গানের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়), এস্রাজ (উচ্চাঙ্গ একক যন্ত্র), সুর সংগ্রহ (প্রচলিত নাম স্বরাজ, লোকজ গানে ব্যবহার হয়), তম্বুরা (প্রচলিত নাম তানপুরা, গায়ক ও বাদকের সঙ্গীতচর্চায় ব্যবহার হয়), বেহালা, গোপীযন্ত্র (প্রচলিত নাম লাউয়া, বাউল, বৈরাগী ও ভিক্ষুক সম্প্রদায় বেশি ব্যবহার করে), ব্যাঞ্জো, সারিন্দা (প্রাচীন ও দেশীয় সঙ্গীতে ব্যবহৃত হয়), আনন্দ লহরি (প্রচলিত নাম গুবগুবি-খমক, বাউল ও ভিক্ষুক সম্প্রদায় বেশি ব্যবহার করে), সুরবাহার (উচ্চাঙ্গে অনুগামী যন্ত্র), ম্যান্ডেলিন (আরবি সুর ও সঙ্গীতে ব্যবহৃত হয়), তুবড়ি (প্রচলিত নাম বীণ, গ্রাম্য গান ও সাপুড়িয়াদের সাপখেলায় ব্যবহার হয়), বাঁশি, শঙ্খ (পূজা, মাঙ্গলিক, প্রাত্যহিক অনুষ্ঠান ও সঙ্কেত জ্ঞাপনে ব্যবহার হয়), সানাই (উচ্চাঙ্গসঙ্গীত জলসায়, মাঙ্গলিক ও বিয়েতে ব্যবহার হয়), ক্ল্যারিওনেট (অর্কেস্ট্রা ও ব্যান্ডদলে ব্যবহার হয়), ট্রাম্পেট (অর্কেস্ট্রা ও ব্যান্ডদলে ব্যবহার হয়), হারমোনিয়াম (সবধরনের সঙ্গীতে ব্যবহার হয়), প্রেমজুড়ি (প্রচলিত নাম চটি, লোকজ ও ভক্তিমূলক সঙ্গীতে ব্যবহার হয়), নাকারা (রাজকীয় কাজ, খাজনা আদায় ও লাঠিখেলায় ব্যবহার হয়), ঢোলক (যাত্রা, থিয়েটার ও ঐকতানে ব্যবহার হয়), ডমরু (প্রচলিত নাম ডুগডুগি, ভালুক, বানর ও সাপখেলায় ব্যবহার হয়), খঞ্জরি (প্রচলিত নাম হাতবায়া, লোকজ ও ভক্তিমূলক সঙ্গীতে ব্যবহার হয়), মৃদঙ্গ (প্রচলিত নাম খোল, কীর্তনসঙ্গীতে ও মনিপুরী নৃত্যে ব্যবহার হয়), তবলা ও বায়া, ঢোল (কবি ও বাউল গানে ব্যবহার হয়), ঝাঁঝর (প্রচলিত নাম ঝাঁঝ, ঐকতান ও রণসঙ্গীতে ব্যবহার হয়), ঘণ্টা (দেবপূজায় ব্যবহার হয়), খঞ্জনি (প্রচলিত নাম মন্দিরা, মাঙ্গলিক ও রবীন্দ্রসঙ্গীতে ব্যবহার হয়), খরতাল (ঐকতান ও ভজনগীতে ব্যবহার হয়), ঘড়ি, কৃষ্ণকাঠি (প্রচলিত নাম চটি, লোকজ ও ভক্তিমূলক সঙ্গীতে ব্যবহার হয়), মেকুড় (প্রচলিত নাম মেহুর, জারিগান ও পালাগানে ব্যবহার হয়), নূপুর, সেকাস (পারকারসনে ব্যবহার হয়), পাখোয়াজ (লহর ও নৃত্যে একক যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়) ও শারদ (উচ্চাঙ্গ ও একক যন্ত্র হিসেবে বেশি পরিচিত)।
এর বাইরে জলসাঘরের তৈজসপত্রও আসলামের সংগ্রহে রয়েছে। এগুলো হলোÑ ফুলের সাজি, ফুলদানি, প্যাঁচানো ফুলদানি, পানি সাকি, সুরাপাত্র, ঘণ্টা, নর্তকী, হুঁকো, তামাপাত্র, পানিপাত্র, মোমদানি, দেওয়াল নকশি, খানদানি হুঁকো, পিকদানি, ছাইদানি জুতা, ছাইদানি ও দুধপাত্র।
আসলাম জানান, ‘১৯৯২ সাল থেকেই আমি দোকানে নিয়মিত আসি। বাদ্যযন্ত্রগুলো আসলে লোকজন ঠিক করতে দিয়ে গিয়েছিল। আর ফেরত নিতে আসেনি। অনেক দিন পড়ে থাকতে থাকতে একেকটি জঞ্জাল মনে করে কর্মচারীরা ফেলে দিতে চাইত। আমি ধুয়েমুছে তুলে রাখতাম। খবর জানতে পেরে অনেকে আবার পুরনো বাদ্যযন্ত্র বিক্রি করে যেত। একসময় দোকানে আর জায়গা হচ্ছিল না। আমি বাড়ির লোকদের বলে একটা ঘর খালি করে ফেললাম। বিভিন্ন মাপের শোকেস বানালাম। এখন সেগুলো ভালো আছে।
সংগৃহীত যন্ত্রগুলো নিয়ে রেজাউল করিম আসলাম প্রথম প্রদর্শনী করেন ২০০৩ সালে ময়মনসিংহ লোকজ মেলায়। ২০০৪ সালে প্রদর্শনী করেন জয়নুল সংগ্রহশালায়। ২০০৬ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ঢাকার বৈশাখী উৎসবেও আসলাম যন্ত্রগুলো প্রদর্শন করেন। এরপর ২০০৮ সালে জয়নুল উৎসব, ২০১২ সালে মোতাহার হোসেন বাচ্চুর জন্মবার্ষিকী, ২০১২ সালে হালুয়াঘাটে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহে, ২০১৬ সালে ঢাকায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব, ২০১৭ সালে সিলেটে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের লোকজ উৎসব ও ২০১৮ সালে জাতীয় জাদুঘরের ২৮নং গ্যালারি ৩২টি পুরনো বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সুসজ্জিত করে আসলাম তার বাদ্যযন্ত্র প্রদর্শন করেন।
সংগ্রহের পাশাপাশি রেজাউল করিম আসলাম বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গবেষণাও করছেন। কারিগর দিয়ে হারিয়ে যাওয়া যন্ত্রগুলোর আদলে নতুন করে বাদ্যযন্ত্র তৈরি করছেন। এ ছাড়া ভাড়া করা একটি বাড়িতে ‘এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম’ নামে একটি জাদুঘর গড়ে তুলেছেন। নগরীর আঞ্জুমান ঈদগা মাঠের বিপরীত দিকে একটি গির্জার নিচতলায় এই মিউজিয়াম নির্মাণের কাজ চলছে।
আসলাম জানান, কারও গবেষণায় বা কারও শেখার আগ্রহে কাজে লাগছে যন্ত্রগুলো। মানুষ জানতে পারছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। নাম ‘নোভিস ফাউন্ডেশন’।
নোভিন আর্টিস্টিক এডুকেশন সেন্টার নামে একটি শিক্ষালয়ও পরিচালনা করেন তিনি। উপমহাদেশীয় ও পাশ্চাত্য রীতির সমন্বয়ে সঙ্গীত, নৃত্য, চারুকলা, গিটার, বেহালা ও দোতারা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এখানে। আসলাম স্বপ্ন দেখেন বাদ্যযন্ত্রের একটি বৃহৎ আকারের জাদুঘর করার।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]