ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চান বঙ্গবন্ধুকে কবরে নামানো সেই সিরাজুল
মোস্তফা কামাল নড়াইল
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২১, ১১:০৪ পিএম আপডেট: ১৮.০১.২০২১ ১১:৫২ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 103

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দাফনকারী তৎকালীন পুলিশ কনস্টেবল নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাজী সিরাজুল ইসলাম (৭৪) প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেতে চান। এই সাহসী মানুষটি সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সামনে বলেছিলেন, ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক মুসলিম রীতিতে বঙ্গবন্ধুকে গোসলসহ দাফন-কাফন করতে হবে। সোমবার ইতনা গ্রামের নিজ বাড়িতে তিনি সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধুকে গোসল করানোসহ দাফন-কাফনের হৃদয়স্পর্শী ঘটনাগুলো। এ সময় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আলী আজগর রাজা, শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র বিশ^াস, কাজী সিরাজুল ইসলামের বাল্যবন্ধু কাজী বাবুল হোসেন, বড় ছেলে শরিফুল ইসলাম, শিকদার ফারুক হোসেন, কাজী শরাফত হোসেনসহ গ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিল।
কনস্টেবল কাজী সিরাজুল ইসলাম জানান, ‘১৯৭৫ সালের আগস্টে গোপালগঞ্জ তৎকালীন সাব-ডিভিশন পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) আব্দুল মান্নানের দেহরক্ষী ছিলেন তিনি। ১৪ আগস্ট পুলিশের নতুন পোশাক আনতে ফরিদপুরে যান। ওই সময় বেতন, রেশন, কাপড় সবই ফরিদপুর থেকে দেওয়া হতো। ওই রাতে খাবার খেয়ে ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়েছিলাম। আমাদের কাছে থাকা রেডিও বন্ধ করতে মনে ছিল না। রাত পৌনে ৩টার দিকে রেডিওর খবরে শুনি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। খবর শুনে ওই সময় পুলিশের পোশাক পরে গোপালগঞ্জের দিকে রওনা দিলাম। অনেক কষ্ট করে ভোরে গোপালগঞ্জের বাসায় এসে পৌঁছলাম। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে এক পুলিশ বাসায় এসে জানান, এসডিপিও স্যার দ্রুত ডেকে পাঠিয়েছেন। পোশাক পরে দ্রুত স্যারের কাছে চলে গেলাম। পরে তখনকার ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল কাদের, এসডিপিও আব্দুল মান্নান ও আমি একটি স্পিডবোটে করে টুঙ্গিপাড়ায় যাই। সেখানে গিয়ে থানায় অবস্থান করছিলাম। বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ তখনও আসেনি। এরই মধ্যে জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধুর জন্য কবর খোঁড়ার কাজ চলছে। বেলা আনুমানিক ১০টা-১১টার দিকে বঙ্গবন্ধুর লাশ হেলিকপ্টারে নিয়ে আসা হলো। লাশের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একজন মেজর ও সিপাহি দেখতে পেলাম। হাসপাতাল ও পুলিশের লোক লাশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে নিয়ে এলো। কাঠ দিয়ে তৈরি কফিন খোলার পর দেখা গেল লাশ চা পাতা আর বরফ দিয়ে ঢাকা। লাশ সাদা একটি কাপড় দিয়ে মোড়ানো। কাপড়টি কাফনের কাপড় নয়, এমনি একটি কাপড়। তখন ওই মেজরের কাছে বললাম, মনে হচ্ছে লাশের তো গোসল হয়নি। মেজর সাহেব রাগান্বিত স্বরে বললেন, কে কার গোসল করাবে। আমি বললাম, মুসলমান হিসেবে তাকে গোসল করাতে হবে, কাফন দিতে হবে। তারপর দাফন করতে হবে। তখন তিনি রেগে গিয়ে বললেন, আপনার বাড়ি কোথায়। তিনি ভেবেছিলেন আমি বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় হবো। আমি বললাম নড়াইলের লোহাগড়া থানার ইতনা গ্রামে আমার বাড়ি। মেজর বললেন, দেরি করলে লাশ ছিনতাই হয়ে যেতে পারে। আমি বললাম, স্যার ১৪৪ ধারা জারি আছে। ফোর্স দিয়ে টুঙ্গিপাড়া ঘেরাও আছে। তিনি বললেন, গোসল কে করাবে, কত সময় লাগবে। আমি বললাম, গোসল আমি করাব ও আধা ঘণ্টার মধ্যে হয়ে যাবে। তখন গোসল করানোর অনুমতি দিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর পরনে ছিল পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। গোসল করানোর সময় বঙ্গবন্ধুর চাচাতো চাচা আব্দুল মান্নান টিনের দুটি পুরনো বালতি আর সিলভারের একটি বদনা নিয়ে এলেন। গোসল করানোর জন্য আনা হলো ৫৭০ সাবান। তখন এত খারাপ লাগল এই ভেবে যে, বঙ্গবন্ধুকে গোসল করাতে হলো ৫৭০ কাপড় কাচা সাবান দিয়ে। একথা চিন্তা করতেই দুচোখ দিয়ে পানি এলো। জাতির জনককে গোসল করালাম নিজ হাতে। বঙ্গবন্ধুকে গোসল করাতে গিয়ে দেখলাম বুকের বামপাশে তিনটি গুলির চিহ্ন। আরেকটি গুলি ডান হাতের আঙুলে লেগেছিল। গুলি লেগে আঙুলটি উল্টে গেছে।
গোসলের পর কাফনের কাপড়ের দরকার। তখন ইতনা গ্রামের বাসিন্দা মোকলেছুর ছিলেন টুঙ্গিপাড়া থানার সেকেন্ড অফিসার। ওনি বললেন, আমি কাফনের কাপড় নিয়ে আসছি। কাফনের জন্য যে কাপড় পাওয়া গেল সেটি মার্কিন থান কাপড়। এটি রিলিফের কাপড়। কাপড় জোড়া দিয়ে কাফনের কাপড় প্রস্তুত করা হলো। কাফন দেওয়ার সময়ও বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। কয়েকবার রক্ত পরিষ্কার করার পর কাফন করলাম। এরপর জানাজা অনুষ্ঠিত হলো। জানাজায় ২০-২৫ জন লোক ছিলাম। পুলিশ স্টাফ আর হাসপাতালের লোক জানাজায় অংশ নিল। জনসাধারণকে জানাজায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। জানাজা শেষে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ দাফনের জন্য কবরের কাছে নিয়ে এলাম। জাতির জনকের লাশ আমি নিজ হাতে কবরে রেখেছি। কবরে বাঁশের স্তর দিয়ে ঢেকে দেব। এমন সময় কয়েকজন মহিলা ওই মেজরের হাত-পা ধরে কান্নাকাটি করছে এই বলে, তাদের যেন একবার বঙ্গবন্ধুর মুখটা শেষবারের জন্য দেখতে দেওয়া হয়। মেজর বললেন না এখন দেখানো যাবে না। তখন আমি তাদের বললাম, আপনাদের বাড়ি কোথায়। তারা জানাল, বাড়ি কাউলিপাড়া। তখন আমি বললাম, স্যার ১০-১২ মাইল রাস্তা পার করে এরা কষ্ট করে এসেছে চোখের দেখা দেখতে। তখন মেজর বললেন, কে দেখাবে। তখন আমি বললাম, স্যার আমি দেখাব। মেজর আমার ওপর খেপে গিয়ে বললেন, আপনি তো আচ্ছা লোক। লাশ আসার পর থেকে এর পেছনে লেগেই আছেন। তখন আমি আবার কবরে নেমে তাদের লাশের মুখ দেখালাম। উনারা বঙ্গবন্ধুর মুখ দেখেই হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন। আমি তাদের বললাম, আপনারা উনার জন্য দোয়া করেন। পরে দোয়া পড়ে কবর থেকে উঠে এলাম।’






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]