ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

জন্ম থেকেই জ্বলছে শিশু আফরা
আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: বুধবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৪৩ পিএম আপডেট: ১৯.০১.২০২১ ১১:২৯ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 41

চার বছর বয়সের আফরা আনজুম এখন কিছুক্ষণ পরপর কাঁদছে। আবার চারদিকে ইতিউতি চোখ মেলে তাকাচ্ছে। দাদা-দাদির কোলে থাকা সত্ত্বেও সেই পরম মায়া-মমতার ওম যেন কিছুতেই পাচ্ছে না। যে বয়সে তার মায়ের আদরে, বাবার স্নেহে জড়িয়ে থাকার কথা, সে বয়সে আজ সে যেন এতিম হয়ে গেছে। বুকে তার অজানা এক যন্ত্রণা বাসা বেঁধেছে; কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। এ যেন তার জন্ম থেকে ধিকিধিকি জ¦লার মতো অবস্থা। দুদিন আগেও তার জন্য ছিল মা-বাবার বুকভরা ভালোবাসা। চার বছরের আনজুমের জীবন ছিল মায়া-মমতায় ঘেরা। অথচ আজ কি হারালো, নেই কি যেন, এই অন্তর্নিহিত অবুঝ হাহাকার কাউকে বলতে পারছে না। শুধুই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না বুকের ভেতর থেকে জেগে উঠছে।
রাজধানীর বিমানবন্দরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আকাশ ইকবাল (৩৩) ও মায়া হাজারিকা মিতু (২৫) দম্পতির মেয়ে আনজুম। চার বছর বয়সি আফরা আনজুমের জন্মের পর থেকেই শৈশব শুরু হয়েছে এক ধরনের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। মা-বাবা দুজনেই কর্মজীবী। এক সঙ্গে দুজনে বেরিয়ে যান। আনজুমের শৈশব শুরু নানাবাড়িতে। তাই মা-বাবাকে বেশি সময় কাছে পায়নি। দাদা-দাদির গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে। সে সুবাদে ঢাকায় নানা-নানি ও খালা-মামাদের কাছে বড় হতে থাকে শিশুটি।
সকালে মা-বাবা একসঙ্গে মোটরসাইকেলে অফিসের দিকে যাত্রা শুরু করত। সন্ধ্যায় অফিস শেষে রাতে যেটুকু সময় কাছে পেত তাতে কারোই মন ভরত না। শুরু থেকেই মা-বাবার পরিপূর্ণ আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয় শিশুটি। ভালোবাসা থেকে শিশুটি যেমন বঞ্চিত হতো, তেমনি মা-বাবার ভেতরেও আক্ষেপ থাকত আকাশচুম্বী। দুটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া আফরা আনজুমের মা-বাবারও কিছু করার ছিল না। ইট-পাথরের হৃদয়হীন নগরীতে জীবন-জীবিকার জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হন্য হয়ে ছুটতে হতো তাদের। নানা কষ্ট ও অপ্রাপ্তির মধ্যে সামান্য ভালোবাসা নিয়ে শৈশব শুরু হলে তাও স্থায়ী হলো না বেশিদিন। শৈশবের কষ্ট আর হাহাকারের মতো ছোট্ট আনজুমের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই হোঁচট খেতে হলো।
জীবনটা এত ছোট, এরপরও জীবনের শুরুতে হোঁচট খেতে হলো আনজুমকে। এতটুকু জীবনে নেমে আসে মহাপ্রলয়। চার বছরের ছোট্ট আনজুমকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। যেন দুদিন পরই সে লেখাপড়ার জগতকে চিনতে পারে। কিন্তু ভাগ্যের কি লিখন, স্কুলে ভর্তি হলো ঠিকই পেল না মা-বাবার আদর। ঘাতক বাসের চাকায় পৃষ্ট হয়ে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হলো মা-বাবা দুজনকেই।
ফরিদপুরে দাদা-দাদির সঙ্গে থাকবে, না ঢাকায় নানা-নানির সঙ্গে থাকবে তা নিয়েও চলছে দোটানা। যার কাছেই থাকুক না কেন জন্মদাতা মা-বাবাকে হারিয়ে এক অনিশ্চিত পথে ছিটকে পড়ল শিশুটির অনাগত দিনগুলো। দুজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছে পরিবার দুটি।
পরিবার ও স্বজনরা জানায়, সোমবার রাতে রাজধানীর মোল্লারটেক এলাকায় জানাজা শেষে দুজনের লাশ গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। মঙ্গলবার দ্বিতীয় জানাজা শেষে ফরিদপুরের গেরদা ইউনিয়নের বৌঘাটা এলাকার নিখুরদী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। ছেলে ও ছেলেবউকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। তারা একসঙ্গে ছিলেন, তাই একসঙ্গেই দাফন করা হয়েছে। আকাশ ও মিতুর লাশ মঙ্গলবার সকালে ফরিদপুরের নিজ বাড়িতে এসে পৌঁছলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
স্বজনরা জানায়, দুতিনদিন ধরে শিশুটি মা-বাবাকে দেখছে না। তাদের মারা যাওয়ার বিষয়টি এখনও বুঝে উঠতে পারেনি অবুঝ শিশু আনজুম। কিছুক্ষণ পরপর মা-বাবার কথা জিজ্ঞাসা করে। শিশুটির জিজ্ঞাসা, অফিস থেকে কখন ফিরবে মা-বাবা। কখন তাকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় যাবে। মা-বাবার কথা বলে একটু পরপর কেঁদে ওঠে আনজুম। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষাও জানা নেই স্বজনদের। সবার মুখের ভাষা যেন অচল হয়ে গেছে। শিশুটির কান্নায় স্বজনদের চোখেও অসহায়ের ছাপ পড়ে গেছে। আর নিজেদের অজান্তে চোখের কোণ বেয়ে নোনাজল বইছে। তবে সবার একটাই চাওয়া, ঘাতক চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। একই সঙ্গে তারা আশা করছেন, এ অসহায় শিশুটির জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ।
দাদা জাফর শেখ জানান, তিনি আগে ব্যবসা করলেও ছেলেটি চাকরিতে যোগদানের পর পরিবারের সব খরচ বহন করে আসছিল। এখন কীভাবে সংসার চালাবেন তা বুঝতে পারছেন না। এ ছাড়া কীভাবে শিশুটিকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তিনি জানান, কারও জীবনে যেন এত বড় আঘাত না আসে। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ বহন করা যে কি কষ্টের তা কাউকে বোঝানো যাবে না। তিনি ঘাতক বাসচালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ শিশুটির একটি সুন্দর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। শিশুটি কোথায় থাকবে, এমন প্রশ্নে তিনি জানান, মাত্রই দুটি পরিবারের ওপর দিয়ে এত বড় ঝড় বয়ে গেল। এখনও শিশুটির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শিশুটি এখন যেখানেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে সেখানেই থাকবে।
আনজুমের নানি ফিরোজা বেগম জানান, মা-বাবাকে না পেয়ে আফরা আনজুম এখন শুধুই কান্না করছে। কোনোভাবেই কান্না থামানো যাচ্ছে না। আবার পরিবারের কেউ কান্না করলে তাদের কান্না দেখেও বারবার কান্নার কারণ জানতে চাইছে। মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে কখনও মায়ের সঙ্গে আবার কখনও বাবার সঙ্গে মিছেমিছি কথা বলছে। শিশুটির এমন অবস্থা দেখে উপস্থিত অন্যদের চোখেও পানি চলে আসে।
নানি জানান, মিতুরা তিন বোন ও এক ভাই। মিতুই মেজ ছিল। দক্ষিণখানের মোল্লারটেক এলাকায় তাদের নিজেদের বাড়ি। তার স্বামী মানিক মিয়া বলাকা পরিবহনের একটি বাসচালক। মিতুও স্বামীকে নিয়ে পাশের একটি বাসায় ভাড়া থাকত। প্রতিদিনের মতো সোমবার সকালে অফিসে যাওয়ার আগে আফরাকে তার (নানি) কাছে রেখে যায়। গত শনিবার আবদুল খালেক মডেল স্কুলে প্লে শ্রেণিতে ভর্তি করা হয় আফরাকে। স্কুলে ক্লাস শুরু না করতেই শিশুটির জীবনে এমন কঠিন পরিস্থিতি নেমে আসে। তিনি বলেন, আফরার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই। ইতোমধ্যে ওকে একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। আফরার ছোট খালা মরিয়ম আক্তার রেশমি ও মামা আব্দুর রহমানের সঙ্গে থাকত। মরিয়ম ও রহমান এ বছর নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। মিতু মাঝেমধ্যে আমাদের সহযোগিতা করত। কয়েকদিন পর দুই ভাই-বোনকে স্কুলে ভর্তি করার কথা। ভর্তির টাকা না থাকায় মিতুই টাকা দেওয়ার আশ^াস দেয়। এর মধ্যে দুজনই পৃথিবী থেকে বিদায় নিল।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]