ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের অবদান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২১, ১১:৩৫ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 25

বাংলাদেশ দীপ্ত পায়ে পৌঁছে গেল স্বাধীনতার অর্ধশতবার্ষিকীতে। বাংলাদেশ আজ বিশে^র বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে। আজকের এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাঙালি জাতিকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে দীর্ঘ ৯ মাস। দেশের সব শ্রেণি-পেশার লোক জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাকিস্তান বাহিনীর হাত থেকে দেশমাতৃকাকে রক্ষার তাগিদে। এ যুদ্ধে অংশ নিয়ে ৩০ লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে, পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও অংশ নেয় সমানতালে।
তাই তো স্বাধীনতা অর্জনে ২ লাখ মা-বোনকে হারাতে হয়েছে সম্ভম। এত ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত আজকের বাংলাদেশ। এই স্বাধীনতা অর্জনে দেশের মানুষের পাশাপাশি বিদেশি কিছু বন্ধু তাদের অকৃত্রিম সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন যুদ্ধের শুরু থেকেই। তাদের সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টি করা হয়তো আরও কঠিন হতো। বিদেশি এই বন্ধুরা বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে গেছেনে প্রত্যক্ষভাবে আবার কেউ পরোক্ষভাবে। কেউ খাদ্য সহায়তা দিয়ে, কেউ আশ্রয় দিয়ে, কেউ বিশ^দরবারে জনমত তৈরি করে, গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করে, কলম হাতে লেখনীর মাধ্যমে আবার কেউ বা পাকিস্তানী হানাদারদের নির্মম অত্যাচারের স্থির চিত্র ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের আসল চিত্র বিশ^বাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। নতুন প্রজন্ম থেকে শুরু করে দেশের সব মানুষের তাদের এই অকৃত্রিম অবদানের কথা জানা জরুরি। আজীবন বাঙালি জাতির তাদের প্রতি
কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা কর্তব্য।

ইন্দিরা গান্ধী
মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে মুক্তিযুদ্ধের ধাত্রী বলা হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তান হানাদারদের পাশবিক নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে প্রায় ১ কোটি লোক আশ্রয় নেয় ভারতে। সে সময় ইন্দিরা গান্ধী এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দেশে ফেরত না পাঠিয়ে আশ্রয় ও খাদ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন। এ ছাড়াও বিশে^র বিভিন দেশে ঘুরে বাংলাদেশের জন্য সমর্থক জুগিয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করেছেন মূলত বাংলাদেশকে রক্ষার তাগিদেই। তার এই অবদান কোনো কিছুর বিনিময়ে শেষ হওয়ার নয়। তাই বাঙালি জাতি শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করবে তাকে।

জর্জ হ্যারিসন ও রবিশঙ্কর
কনসার্ট ফর বাংলাদেশ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত প্রায় সব বাঙালি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের নির্যাতন শুরু হলে ভারতের সেতার সম্রাট খ্যাত রবিশঙ্কর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য কিছু করতে নিজের ভেতর তাগিদ অনুভব করলেন। ঠিক করলেন বাদ্যযন্ত্রের দ্বারা সঙ্গীতের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবেন। সে সময় তার সঙ্গে যুক্ত হলেন বিখ্যাত বিটলস ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য বন্ধু জর্জ হ্যারিসন। মহান এ দুজন ব্যক্তির উদ্যোগে ১৯৭১ সালে ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে প্রায় ৪০ হাজার দর্শক নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক এক কনসার্ট। বিখ্যাত এ কনসার্টে একের পর এক গেয়েছেন বব ডিলান, লিওন রাসেল, রিঙ্গো স্টারসহ আরও অনেকে। সবশেষে জর্জ হ্যারিসন গাইলেন বিখ্যাত বাংলাদেশ গানটি। যা ইতিহাসে স্মরণীয় এক গানে পরিণত হয়েছে। রবিশঙ্কর ও হ্যারিসনের উদ্যোগে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নামক এই কনসার্ট হতে প্রাপ্ত প্রায় ২ কোটি ৪৩ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার ইউনিসেফের মাধ্যমে ভারতে আশ্রিত ১ কোটি শরণার্থীদের সাহায্য ব্যয় করা হয়।

ডব্লিউএএস ওডারল্যান্ড
যতদিন রবে বাঙালি জাতি ততদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে বিদেশি বন্ধু ওডারল্যান্ডকে। কেননা একজন বিদেশি হয়েও তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়। ১৯৭০ সালের শেষদিকে তিনি বাটা স্যু কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে ঢাকায় আসেন। ২৫ মার্চের ভয়াবহতা তিনি লুকিয়ে দেখেন এবং অসহ্য নির্যাতনের কিছু স্তির চিত্র ধারণ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। পাকিস্তানিদের ভয়াবহ নির্যাতন নিপীড়ন দেখে তিনি অবস্থান নেন হানাদারদের বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সে টঙ্গীতে অবস্থিত বাটা কোম্পানির ভেতর গোপনে গেরিলা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরে অংশ নিয়ে টঙ্গী ও এর আশপাশের বেশ কয়েকটি গেরিলা হামলায়ও অংশগ্রহণ করেন তিনি। এ ছাড়াও যুদ্ধ চলাকালীন তিনি ওষুধ ও খাদ্য দিয়ে সহায়তা করেন বাংলাদেশকে। তার এ অসামান্য অবদানকে স্বীকৃত দিতে বাংলাদেশ সরকার তাকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করেন। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশেই বসবাস করতেন ওডারল্যান্ড।

সায়মন ড্রিং
যুদ্ধে অবদান রাখা অন্যতম আরও একজন বিদেশি বন্ধু সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। প্রথম বিদেশি সাংবাদিক যিনি প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের গণহত্যা সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি করেন। কলম আর ক্যামেরার হাতে তিনি সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন এ দেশের মুক্তিকামীদের পক্ষে। যুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের চাপে পরে বিদেশি সাংবাদিকদের দেশে আসার অনুমতি দেন পাকিস্তান বাহিনী। সায়মন তাদের মধ্যে অন্যতম। সে সময় তিনি পাকিস্তান হানাদারদের বর্বর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন বিশ^দরবারে। যুদ্ধের পরিস্থিতি তার বিপক্ষে গেলেও তিনি এদেশ ত্যাগ না করে গা ঢাকা দেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। ২৫ মার্চের ভয়াবহতার পর ঢাকা শহরের হত্যা, ধ্বংসের চিত্র নিয়ে চলে যান ব্যাংককে। সেখান থেকে তিনি বিশ^বাসীর সামনে মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরেন ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ প্রকাশের মাধ্যমে। তার প্রকাশিত খবরই প্রথম বিশ^বাসীকে নাড়া দেয়।

অ্যালেন গিন্সবার্গ
অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটা সম্পর্কে সবাই কম বেশি জানি আমরা। মার্কিন কবি অ্যালেন মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলেন তার এই কবিতাটির মাধ্যমে। তার এ কবিতাটি আলোড়ন জোগায় সারা বিশে^ ছড়িয়ে থাকা অগণিত সাহিত্যপ্রেমীদের মনে। তার এই কবিতার প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ সময়ে বাঙালি জাতির অসহায়ত্বের চিত্র, পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মম নির্যাতনের চিত্র। যা এখনও আলোড়িত করে বাঙালি জাতিকে।

অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি
আমৃত্যু তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু। যুদ্ধকালীন অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি কর্মরত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হিসেবে। শুরু থেকেই তিনি বাঙালি গণহত্যার বিরোধিতা করেছেন। ভারতে আশ্রয় নেওয়া ১ কোটি শরণার্থীর অমানবিকতা দেখে গিয়ে তিনি সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির কাছে ‘ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া’ নামে একটি রিপোর্ট পেশ করেন। এত উঠে আসে পাকিস্তান বাহিনীর নির্মমতার বিস্তারিত চিত্র। এ ছাড়াও তিনি বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য বিশ^বাসীর কাছে সাহায্য আবেদন করেন। বাংলাদেশের
অকৃত্রিম এই বন্ধু ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশ ভ্রমণেও আসেন।

পল কনেট দম্পতি
পল ও কনেট দম্পতি পাকিস্তানিদের নির্মম হত্যা কাণ্ডের বিরুদ্ধে লন্ডনে জনমত তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে তারা ‘অপারেশন ওমেগা’ প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশে খাদ্য ও ওষুধ পাঠান। এ ছাড়াও তারা পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে লন্ডনের ক্যামডেনে ‘বাংলাদেশ অ্যাকশন’ নামে একটা কার্যালয় স্থাপন করেন। পল বিশ^দরবারে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরিতে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে গেছেন। বাংলাদেশ ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে লুকিয়ে আসার সময় পল পাকিস্তান বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হোন। দুই বছরের কারাদণ্ড শেষে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তি পান।

মার্ক টালি
মার্ক টালি তৎকালীন সময়ে কর্মরত ছিলেন বিবিসিতে। যুদ্ধকালীন রেডিও হাতে সময়ে সকাল-সন্ধ্যা দেশবাসী অপেক্ষা করত মার্ক টালির কথা শোনার জন্য।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর বর্বরতার বাস্তব চিত্র বিশ^বাসীর সামনে তুলে ধরেন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (বিবিসি) সাংবাদিক মার্ক টালি। তার খবরের মাধ্যমে সারা পৃথিবী বুঝতে সক্ষম হয় মুক্তিযুদ্ধের সঠিক চিত্র। ফলে অনেকাংশেই উপকৃত হয় মুক্তিকামী
বাঙালি জাতি।
১৯৭১ সালে বিদেশি এসব বন্ধুদের অবদানের কথা বলে শেষ করার নয়। তাদের উপকারের কোনো প্রতিদান হয় না। তাই বাঙালি জাতিকে আজীবন শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে যেতে হবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুদের। যারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে। বাঙালি জাতির চরম সঙ্কটকালে পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ষ ইসরাত জাহান চৈতী
    শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]