ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১ ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১

সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় করণীয়
রায়হান রাশেদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৩৬ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 75

 সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য নির্ভর করে মানুষের চারিত্রিক শুদ্ধতার ওপর। মনন জগৎ পরিশুদ্ধ হলে সমাজ হয় হানাহানি ও অনাচারমুক্ত। মানুষের চিন্তা-চেতনা, মেধা-বুদ্ধিকে পরিশীলিত ও অন্তরের কসুর দূর করার মাধ্যমে রাসুল (সা.) সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছেন। অশান্তি ও হানাহানিপূর্ণ পৃথিবী মহানবী (সা.)-এর আদর্শেই পেতে পারে শান্তি ও সম্প্রীতি। এমনই কয়েকটি শিক্ষা নিম্নরূপÑ
সালামের প্রচার-প্রসার
সালাম ইসলাম ধর্মের নিদর্শন। মুসলমানদের সাক্ষাতের প্রথম সম্বোধন। কথা সূচনার উৎকৃষ্ট মাধ্যম। সালাম পরস্পরের ভেতর অন্তরঙ্গতা ও হৃদ্যতা সৃষ্টি করে। ভালোবাসার সৌধ নির্মাণ করে। মান-অভিমান, ঝগড়া-ফাসাদ ভুলিয়ে দেয়। সমাজে বইয়ে দেয় শান্তি ও সুন্দরের সমীরণ। এত সুন্দর অর্থবহ মোহনীয় সম্বোধন ইসলাম ধর্ম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মে নেই। ইসলাম ভিন্ন ধর্মে পরস্পর মিলনের প্রথম সম্ভাষণে ধর্ম মতে যে বাণী রয়েছে, এতে প্রাণ নেই। আবেগ নেই। ভালোবাসা নেই। মহান মালিকের দরবারে ব্যক্তির জন্য কল্যাণ প্রার্থনা নেই। অথচ ‘আসসালামু আলাইকুম’ (তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) শব্দটি দ্বারা ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে শান্তি কামনা করা হয়। সুন্দর সমাজ নির্মাণে সৃজনে সালামের ভ‚মিকা রাতের আকাশে তারার মতো। সমাজ সভ্যতার প্রধান বিদ্যা হলো সালামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসুলকে (সা.) জিজ্ঞাসা করল, ইসলামের কোন কাজ সবচাইতে উত্তম? তিনি বলেন, ‘তুমি লোকদেরকে খাওয়াবে এবং পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সবাইকে সালাম করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭)
পরস্পর নম্র ব্যবহার
ভালো ব্যবহার মানুষকে সম্মান দেয়। প্রশংসা বাড়ায় এবং বাঁচিয়ে রাখে। নম্র ব্যবহার মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করে। সমাজে বইয়ে দেয় শান্তির হাওয়া। মানুষের হৃদয় মিনারে জাগ্রত করে সত্য ও সুন্দরের নিশান। নম্র ব্যবহার মুছে দেয় ভেতরের ঘৃণিত কালি ও গৌরবের উল্লম্ফন। শিক্ষা দেয় বাড়াবাড়ি না করার মন্ত্র। ফলে মানুষের মাঝে তৈরি হয় সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এক সুদৃঢ় দেওয়াল। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত ইয়াজ ইবনে হিমার (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমার নিকট এ প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছেন যে, তোমরা পরস্পরে পরস্পরের সঙ্গে নম্র ব্যবহার করবে। যাতে কেউ কারও ওপর গৌরব না করে এবং একজন অন্যের ওপর বাড়াবাড়ি না করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬০৭)
প্রতিশ্রæতি পূরণ করা
সমাজে চলতে-ফিরতে মানুষ মানুষকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিশ্রæতি দেয়। প্রতিশ্রæতি আদায়ের সময় বেঁধে দেয়। মানুষ অপেক্ষা করে প্রতিশ্রæতি ব্যক্তির সময় পর্যন্ত। সময়মতো প্রতিশ্রæতি পূরণ না হলে ব্যক্তির মধ্যে আর ভালোবাসা থাকে না। তার ভেতরে জন্ম নেয় ঘৃণার বোধ। নষ্ট হয় গড়ে ওঠা সম্পর্ক। সম্পর্ক রূপ নেয় শত্রæতায়। ইসলাম নিষেধ করেছে ওয়াদা খেলাফ করতে। ওয়াদার লাঠি ভাঙতে নিষেধ করেছে ইসলামের নবী মোহাম্মদ (সা.)। ওয়াদা খেলাফকারীকে তিনি ঘোষণা করেছেন ‘মুনাফিক’ হিসেবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটিÑ ১. কথা বললে মিথ্যা বলে। ২. ওয়াদা করে খেলাফ করে। ৩. আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৪)
মুমূর্ষু ব্যক্তির খবর নেওয়া
মানুষ একাকী চলতে পারে না। মানুষকে কেন্দ্র করে সমাজ গড়ে ওঠে। সং¯্রব মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক। সুখ-দুঃখ, সুস্থ-অসুস্থ মিলিয়েই মানুষের জীবন। বিপদ-আপদে, বিপন্নতা ও দুর্যোগে পরস্পরে সহযোগিতার হাত বাড়াবে, রোগীর খবর নেবে, সেবা দেবে এটাই তো মানবতার ধর্ম। সমাজের মানুষ, প্রতিবেশী, আত্মীয়-কুটুম সময়ে-অসময়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন রোগে কাতর হয়ে যায়। তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো, ভালোবেসে হাত বাড়ানো, স্নেহের পরশ বুলানো আমাদের মহানবীর সুন্নত। কারও অসুস্থতার সংবাদ পেলে আমাদের নবীজি তাকে দেখতে যেতেন। দোয়া করতেন। সেবা দিতেন।
মুমূর্ষ ব্যক্তির খবর নেওয়ার ফলে উভয়ের মনে মুহাব্বত পয়দা হয়। আন্তরিকতা তৈরি হয়। সামাজিক ভারসাম্য ঠিক থাকে। গড়ে ওঠে সভ্য সমাজ। হজরত বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) আমাদেরকে সাতটি জিনিস করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাতটি জিনিস থেকে বিরত
থাকতে বলেছেন। আমাদের প্রতি তন্মধ্যে একটি নির্দেশ এই যে, রোগীকে দেখতে যাওয়া ও সালামের ব্যাপক প্রচার করা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৭৫)। রোগীকে দেখতে গেলে মেলে অফুরন্ত সওয়াবের ভান্ডার। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোগীকে দেখতে যায়, সে জান্নাতের ফলমূলে অবস্থান করতে থাকে।’ রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞাসা করা হলো, জান্নাতের ফলমূলে অবস্থান করা কী? তিনি বললেন, জান্নাতের ফলমূল সংগ্রহ করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৬৮)
ঘরে প্রবেশে অনুমতি
সম্প্রতিকালে আমাদের সমাজে ঘরে প্রবেশের সময় অনুমতি নেওয়ার ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। কারও ঘরে ঢোকার ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করে না। যার ফলে সমাজে প্রত্যহ ফ্যাতনা-ফাসাদ, অনৈতিক ও অশালীন কর্মকাÐ তীব্র গতিতে বেড়ে চলছে। অসভ্যতায় ছেয়ে যাচ্ছে সমাজের চারপাশ। অথচ ইসলাম ঘরে প্রবেশের সময় অনুমতি নিতে জোর তাগিদ করেছেন। কারণ ঘরের অভ্যন্তরে অপ্রস্তুত অবস্থায় প্রবেশ করলে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। আপন মায়ের ঘরে প্রবেশের সময় পর্যন্ত অনুমতি নিতে বলেছেন ইসলামের নবী মোহাম্মদ (সা.)। এক সাহাবি আল্লাহর রাসুলের (সা.) কাছে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি আমার মায়ের ঘরে প্রবেশ করতেও অনুমতি নিতে হবে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, অবশ্যই। সাহাবি বললেন, আমি তার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তারপরও অনুমতি নেবে। সাহাবি বলেন, আমি তার সার্বক্ষণিক সেবক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তারপরও অনুমতি নিতে হবে। তুমি কি তোমার মাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে চাও? সাহাবি বললেন, কখনই নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তা হলে তুমি অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করবে। (মুয়াত্তা মালেক, হাদিস : ৭৭৩)। হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিতÑ আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি তিনবার চাইবে। অনুমতি দিলে প্রবেশ করবে। অন্যথায় ফিরে যাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬২৪৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১৫৩)
অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ না করা
অধুনাকালে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি মার্কেটে বা কোথাও একটি পণ্যের দরদাম করছে, দরদাম শেষ হওয়ার পূর্বেই বেশি দাম দিয়ে অন্য ব্যক্তি নিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে পরস্পরের মাঝে দ্ব›দ্ব-কলহ সৃষ্টি হয়। মানুষের অধিকার নষ্ট করা হয়। গরিবের আশার কপালে খরা পড়ে। কিন্তু মানবতার নবী মোহাম্মদ (সা.) একজনের দরদামের ওপর দাম করাকে নিষেধ করেছেন। নিষেধ করেছেন একজনের বিয়ের প্রস্তাবের ওপরও অন্যজন প্রস্তাব করতে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর ক্রয়-বিক্রয় না করে। কেউ যেন তার ভাইয়ের বিয়ের প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব না করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২০০৭)
লেনদেনে সময় নির্ধারণ করা
মানুষ জীবনযাপনে অন্যের মুখাপেক্ষী। প্রয়োজনে পরের দ্বারস্থ হয়। দরকারে মানুষ টাকা-পয়সাও ঋণ করে। ‘করযে হাসানা’ দেওয়া ইসলামে অনেক পুণ্যের আমল। কীভাবে মানুষ ঋণ আদান-প্রদান করবে সে ব্যাপারে প্রাণের ধর্ম ইসলাম দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময় নির্ধারণ করার কথা বলেছে এবং নির্ধারিত মেয়াদকাল লিপিবদ্ধ করতে বলেছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণের আদান-প্রদান করবে, তখন তা লিপিবদ্ধ করে রাখবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮২)






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]