ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১ ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১

মাতৃসেবার মাহাত্ম্য ও মর্যাদা
মুফতি আমিরুল ইসলাম লুকমান
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৩৬ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 40

 ‘মা’ পৃথিবীর অন্যতম মধুর একটি শব্দ। একজন নারীকে সর্বোচ্চ যোগ্যতা ও গুণাবলি দিয়েই আল্লাহ তায়ালা মাতৃত্বের মর্যাদা দান করেন। আসমানি সমস্ত গ্রন্থে মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার ও উত্তম আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমস্ত নবী (আ.) মায়ের খেদমতে অসাধারণ উদাহরণ স্থাপন করেছেন। ইতিহাসের সোনালি পাতার ছত্রে ছত্রে তার প্রচুর বর্ণনা বিদ্যমান। কেয়ামত পর্যন্ত আগত মানবজাতির জন্য সেসব ঘটনা উপমা স্বরূপ অবশিষ্ট থাকবে। তেমনিভাবে নবী করীম (সা.)-এর অনুসারী ও অনুগত এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরাও সময়ে সময়ে মাতৃসেবার আশ্চর্য নিদর্শন রেখে গেছেন। এমন কিছু অনুসরণীয় ঘটনা ও বর্ণনা এখানে বিবৃত হলো।
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, আমি জান্নাতে কোরআন তেলায়াতের আওয়াজ শুনে ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোরআন তেলায়াতকারী ব্যক্তিটি কে? তারা বললেন, আপনার সাহাবি হারিসা বিন নুমান। এ ঘটনা শ্রবণ করে সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে কৌত‚হল সৃষ্টি হলো, হারিসা (রা.)-এর কোন আমলের ফলে এই মহান মর্যাদা অর্জিত হলো যে, তার কোরআন তেলায়াতের আওয়াজ নবী (সা.) জান্নাতে শ্রবণ করেছেন! নবী করীম (সা.)-এর কারণও বর্ণনা করেছেন, পিতা-মাতার খেদমত করার বদৌলতে তার এই মর্যাদা লাভ হয়েছে। হারিসা বিন নুমান (রা.) নিজের পিতা-মাতার সঙ্গে অত্যন্ত উত্তম ও মর্যাদাকর ব্যবহার করতেন। (মেশকাত : ২/৪৭০)
বুরাইদা (রা.) বলেন, বায়তুল্লাহ শরিফে এক ব্যক্তি নিজের মাকে কাঁধের ওপর উঠিয়ে তওয়াফ করছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি নবীজির (সা.) নিকটে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি আমার মায়ের হক আদায় করতে পেরেছি? নবী (সা.) বললেন, না, একটি নখ পরিমাণও হক আদায় করতে পারনি। (ইবনে কাসির : ৩/৩৫)
একবার আলী ও উমর (রা.) একত্রে তওয়াফ সম্পন্ন করে বিদায় মুহূর্তে হজরত আলীর দৃষ্টি একজন গ্রাম্য ব্যক্তির ওপর নিবদ্ধ হলো। গ্রাম্য ব্যক্তিটি নিজের বৃদ্ধা মাকে নিজের কাঁধের বহন করে তওয়াফ করছেন আর খুশিতে কবিতা আবৃত্তি করছেন, ‘আমি আমার মায়ের বাহন, এতে আমার কোনো অপমান নেই। এই সময় (গরমের কারণে) ভালো বাহনও মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু আমি বেঁচে আছি। আমার মা আমাকে এর চেয়েও বেশিবার কাঁধে উঠিয়েছেন, বেশিবার দুধপান করিয়েছেন।’ আলী (রা.) উমরকে (রা.) বললেন, আমিরুল মুমিনিন! চলুন, ওই গ্রাম্য ব্যক্তির সঙ্গে আরেকবার তওয়াফ করি। মায়ের খেদমত করার ফলে তার ওপর যে রহমত ও বরকত বর্ষিত হচ্ছে তার কিছু অংশ যেন আমরাও অর্জন করতে পারি। দুজনই গ্রাম্য ব্যক্তির সঙ্গে আবার তওয়াফ করলেন। আলী (রা.) কবিতা আবৃত্তি করলেন, ‘তুমি নিজের মায়ের খেদমত করে কখনও হতাশ হয়ো না, আল্লাহ তায়ালা অনেক বড় দাতা। তোমার সামান্য খেদমতের বিশাল প্রতিদান তিনি দেবেন।’ (কানজুল উম্মাল : ১৬/২৪৫)
ওমর (রা.) একজন নারীকে বায়তুল্লায় দেখলেন, যিনি বার্ধক্যে উপনীত নিজের পিতা-মাতাকে পালাক্রমে কোমরে উঠিয়ে তওয়াফ করাচ্ছেন। উক্ত মহিলা পিতা-মাতাকে ইয়ামান থেকে এভাবেই মক্কায় এনেছেন। উমর (রা.) তাকে দেখে বললেন, আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তুমি তোমার পিতা-মাতার হক আদায় করে ফেলেছ। উক্ত নারী পূর্ব থেকেই পিতা-মাতার খেদমতে নিজের প্রাণ উজাড় করে দিয়েছিলেন। মহিলা উত্তরে বললেন, কখনও নয়, পরিপূর্ণ তো দূরের কথা আমি অর্ধেক হকও আদায় করতে পারিনি। শিশু বয়সে আমার পিতা-মাতা আমাকে কোলে করে ঘুরে বেড়াতেন আর আমার দীর্ঘ জীবনের জন্য দোয়া করতেন। কিন্তু আমি তাদেরকে কোলে করে তওয়াফ করছি ঠিকই, কিন্তু অন্তর কামনা করছে, আল্লাহ তায়ালা যেন দ্রæত তাদেরকে নিজের কাছে ডেকে নেন! (বাহরুল মুহিত : ১/৪৫)
এক ব্যক্তি নবীজি (সা.) নিকটে নিজের মায়ের বদ অভ্যাসের ব্যাপারে অভিযোগ করেন। নবীজি (সা.) বললেন, তোমাকে ৯ মাস গর্ভে ধারণের সময় তোমার মা বদ আখলাকি ছিল না? লোকটি আবার অভিযোগ করলে নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, মায়ের বুক থেকে আড়াই বছর দুধ পানকালে তোমার মা বদ চরিত্রের ছিল না? লোকটি তৃতীয়বার অভিযোগ করলে নবী (সা.) বললেন, নিজে না খেয়ে তোমাকে খাওয়ানোর সময়, তোমার কারণে রাত্রি জাগরণের সময় তোমার মা বদ ছিল না? লোকটি বলল, আমি আমার মাকে কাঁধের ওপর রেখে হজ করানোর মাধ্যমে তার সমস্ত উপকারের বদলা দিয়ে দিয়েছি। নবীজি (সা.) বললেন, কখনই নয়, কখনই নয়। বদলা দেওয়া তো অনেক উপরের বিষয়, গর্ভ ধারণ সময়ের সামান্য কষ্টের বদলা তুমি দিতে পারনি। (কাশশাফ : ২/৬১৭)
আবু মুসা আশআরী ও আবু আমের (রা.) নবীজি (সা.) নিকট এসে ইসলামের বাইয়াত করলে নবীজি (সা.) তাদেরকে একজন মহিলার নাম ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের গোত্রের অমুক মহিলার কী খবর? সাহাবিদ্বয় উত্তর দিলেন, তাকে আমরা এলাকায় দেখে এসেছি। নবীজি (সা.) বললেন, আল্লাহ তায়ালা তাকে মাফ করে দিয়েছেন। সাহাবি দুজন জিজ্ঞাসা করলেন, কিসের বিনিময়ে মাফ করেছেন? নবীজি (সা.) বললেন, মায়ের খেদমত ও আনুগত্যের বিনিময়ে। ওই মহিলার মা অত্যন্ত দুর্বল ও বৃদ্ধা ছিল। এক রাতে তাদের ঘরে দুশমনেরা হামলা করে লুটপাটের চেষ্টা চালায়। মহিলা কৌশলে মাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। বৃদ্ধা মাকে বহন করানোর মতো কোনো বাহন তার ছিল না। মহিলা সাহস করে নিজের পিঠে মাকে উঠিয়ে চলতে শুরু করল। ক্লান্ত হয়ে পড়লে নিচে নামিয়ে রাখত। নিজের পেট মায়ের পেটের সঙ্গে মিলিয়ে দিত। মায়ের পায়ের নিচে নিজের পা বিছিয়ে দিত। যাতে গরমের কারণে মায়ের পায়ে কষ্ট না হয়। এই সেবা করার কারণে আল্লাহ তায়ালা তাকে মুক্তি দিয়েছেন।’ (দুররে মানসুর : ৪/৩১৬)
ষ খতিব, আল-মক্কা জামে মসজিদ শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জ






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]