ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১ ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১

ঐতিহ্যময় বাদশাহী মসজিদ
মোস্তফা কামাল গাজী
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৩৬ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 52

 পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী লাহোরে ঐতিহাসিক বাদশাহী মসজিদের অবস্থান। এটি মোগল আমলের মসজিদ। দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম মসজিদ এটি। এর পরতে পরতে মোগল সাম্রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাস ও চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন রয়েছে। সর্বশেষ প্রভাবশালী মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের নির্দেশে ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু এবং ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে শেষ হয়। এখানে একসঙ্গে ৫০ হাজার মুসল্লি জামায়াতে নামাজ আদায় করতে পারেন। বিখ্যাত লাহোর দুর্গের সামনে রয়েছে মসজিদে প্রবেশের প্রধান ফটক, যা আলমগীর ফটক হিসেবে প্রসিদ্ধ। মসজিদের আয়তন বাড়ার কারণে বর্তমানে এটি মসজিদের ভেতরে চলে গেছে।
বাদশাহী মসজিদ দ্বিতলবিশিষ্ট। ভেতরে ইমামের জন্য রয়েছে আবাসস্থল। রয়েছে একটি লাইব্রেরিও।
বর্গাকৃতির মসজিদের প্রতিটি পাশের্^র দৈর্ঘ ১৭০ মিটার। লাহোরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া রবি নদীর দক্ষিণ তীর ঘেঁষে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছে বলে মসজিদের উত্তর পাশে কোনো প্রবেশদ্বার রাখা সম্ভব হয়নি। নির্মাণের গঠনশৈলীর ভারসাম্য রক্ষার জন্য দক্ষিণ দিকেও কোনো প্রবেশদ্বার রাখা হয়নি। বাদশাহী মসজিদের আকৃতি ও নির্মাণশৈলীর সঙ্গে দিল্লি জামে মসজিদের অনেক মিল রয়েছে। তবে দিল্লি জামে মসজিদের মিনারগুলো আটকোণ বিশিষ্ট হলেও লাহোরের বাদশাহী মসজিদের মিনারগুলো বর্গাকৃতির অর্থাৎ চতুষ্কোণবিশিষ্ট।
মসজিদের ভেতরের চত্বরকে সাত ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর ঠিক মধ্যভাগে রয়েছে মসজিদের মিহরাব ও মিম্বর। মর্মর পাথরে ঢেকে দেওয়া মসজিদের অভ্যন্তরের সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে এই মধ্যভাগ। মসজিদের এই মূল চত্বরের উপরিভাগে স্থাপন করা হয়েছে তিনটি বিশাল গম্বুজ। এগুলোর মধ্যে মাঝখানের গম্বুজটি তুলনামুলক বড় এবং পাশের দুটো গম্বুজ ছোট এবং সমান আকৃতির। বড় গম্বুজের ব্যাস প্রায় ১০ মিটার এবং ছোট দুটোর ব্যাস প্রায় সাড়ে ছয় মিটার করে। গম্বুজগুলোর শীর্ষদেশে শে^তপাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পদ্ম ফুল। দুটো শিলালিপিও পাওয়া যায়; এর একটি মসজিদের প্রধান ফটকের ওপর এবং অন্যটি মসজিদের নামাজ আদায়ের প্রধান চত্বরে স্থাপিত। প্রবেশদ্বারের শিলালিপিতে ফার্সি ভাষায় লেখা রয়েছে ‘এই মসজিদের নির্মাণকাজ ১০৮৪ হিজরিতে (১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে) আওরঙ্গজেবের পালক ভাই মোজাফফর হোসেন ওরফে ফিদায়ি খান কুকার হাতে সমাপ্ত হয়েছে’।
শিখরা ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে লাহোর দখলের মাধ্যমে পাঞ্জাব প্রদেশের শাসনক্ষমতা হাতে নিয়ে বাদশাহী মসজিদে নামাজ আদায় নিষিদ্ধ করে দেয়। তারা মসজিদটিকে সামরিক বাহিনীর ঘোড়ার আস্তাবল হিসেবে ব্যবহার করে। পরবর্তীতে শাসনক্ষমতার উত্তরাধিকার নির্ধারণের যুদ্ধ বেঁধে গেলে মহারাজা রঞ্জিত সিং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য মসজিদের মিনারগুলোতে হাল্কা কামান স্থাপন করেন। লাহোর দুর্গে অবরুদ্ধ প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করার কাজে এই কামানগুলো ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে লাহোর দুর্গ থেকে নিক্ষিপ্ত গোলার আঘাতে মসজিদেরও ক্ষতি হয়।
১৮৪৯ সালে ব্রিটিশরা প্রবল যুদ্ধের মাধ্যমে শিখদের হাত থেকে লাহোর শহর দখল করে নেয়। ব্রিটিশরা ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত মসজিদের এই স্থাপনাকে সেনাঘাঁটি ও গোলাবারুদ রাখার স্থান হিসেবে ব্যবহার করে। মুসলমানদের তীব্র আন্দোলনের মুখে ওই বছর ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী সরকার বাদশাহী মসজিদ মুসলমানদের নামাজ আদায়ের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। তবে হস্তান্তরের আগে পূর্ব দিকের ভবনটিকে ধ্বংস করে ফেলে। লাহোর দুর্গে বসে যাতে মসজিদে মুসলমানদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করা যায়, সে জন্য দখলদার ব্রিটিশরা এ কাজ করেছিল।
১৮৬৫ সালে মসজিদটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাঞ্জাব সরকার মসজিদ মেরামতের জন্য কিছু অর্থ বরাদ্দ দেয় এবং লাহোরের মুসলমানরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী মসজিদ পুনর্নির্মাণের জন্য অর্থ প্রদান করেন। এর ফলে ১৮৭৫ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত ধীরে ধীরে এই মসজিদের সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের কাজ হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাদশাহী মসজিদকে প্রাথমিক নকশার আদলে পুনরায় নির্মাণ করা হয়। ২০০০ সালে এই মসজিদের মূল চত্বরে মর্মর পাথর বসানো হয় এবং এর ফলে মসজিদের সৌন্দর্য বহুগুণে বেড়ে যায়। মসজিদের চারদিকের বিশাল খোলা ময়দান রয়েছে। পরে একে ইকবাল পার্ক নামকরণ করা হয়। সে হিসেবে মসজিদটি বর্তমানে ইকবাল পার্কে অবস্থিত। এই মসজিদেরই দক্ষিণ পাশের্^ আল্লামা ইকবালের সমাধি অবস্থিত।
বাদশাহী মসজিদের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে একটি সিন্দুক, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.), হজরত আলী (রা.), হজরত ফাতিমা (রা.), ইমাম হোসেইন (রা.), ওয়ায়েস কারনি এবং আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.) এর ব্যবহৃত সরঞ্জাম রয়েছে বলে প্রসিদ্ধি রয়েছে। জানা যায়, সিরিয়া ও তুরস্ক জয় করার পর আমির তৈমুর গুরগানি এই পবিত্র সরঞ্জামগুলো নিজের রাজধানী সমরখন্দে নিয়ে যান। পরবর্তীতে মোগল সম্রাট জহির উদ্দিন মুহাম্মাদ বাবর ভারতবর্ষে আসার সময় সেগুলো দিল্লিতে নিয়ে আসেন। মোগল সম্রাটরা বংশ পরম্পরায় এগুলো সংরক্ষণ করেন। অবশেষে সাইয়্যেদ নুরুদ্দিন মুনাওয়ার এগুলো ক্রয় করে বাদশাহী মসজিদে ওয়াকফ করে দেন।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]