ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১ ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১

পর্যটকদের পকেট কাটা হচ্ছে
আলম শাইন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৩৮ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 23

 ভ্রমণ বিলাস নয়, আনন্দ। এ আনন্দে শরিক হতে প্রতি মৌসুমে দেশের উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পর্যন্ত কমবেশি পর্যটকরা ভ্রমণ করে থাকে। ভ্রমণে আগ্রহীও থাকে অনেকেই, যদিও ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও তারা বিভিন্ন কারণে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তন্মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে, অর্থ সঙ্কট। দেখা গেছে, যাতায়াত ভাড়া ছাড়াও
থাকা-খাওয়া বাবদ ব্যয়ভারের হিসাব-নিকাশ করলে সাধারণ পর্যটকদের ঘাম ঝরতে থাকে। একবার কেউ ভ্রমণে গেলেও দ্বিতীয়বারের মতো ভ্রমণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তখন।
কক্সবাজার ভ্রমণের কথা ধরা যাক আগে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত প্রধান পর্যটন নগরী হচ্ছে কক্সবাজার। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক মানের শহর বলা যায়। শুধু বাংলাদেশই নয়, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বিশে^র দীর্ঘতম একটি সমুদ্র সৈকত। সৈকতটির একটানা দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে ৪১৪ কিলোমিটার দূরত্ব হলেও মোটামুটি ঘণ্টা দশেকের মধ্যেই কক্সবাজার পৌঁছানো সম্ভব। যাতায়াত ভাড়া সাধ্যের মধ্যেই বলা যায়। কিন্তু সাধ্যের মধ্যে নেই হোটেল ভাড়াসহ যাবতীয় খরচাদি।
পর্যটন স্পটের কারণে পিক সিজনে ভাড়া একটু বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই বলে মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া কারও কাম্য নয়। এ সময় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনায় কক্সবাজার শহর থাকে মুখরিত। তবে বিদেশি পর্যটকদের চেয়ে দেশি পর্যটকদের আনাগোনাই থাকে বেশি। সূত্র মতে জানা যায়, নভেম্বর থেকে ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত এখানে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে। এ ছাড়াও বছরের বিভিন্ন উৎসবাদি মিলিয়ে ধরা যায় আরও এক মাস। এ সময় একজন রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ব্যবসায়ী পর্যন্ত রমরমা অবস্থায় থাকে। মাত্র ৪-৫ মাসের আয় দিয়ে বছরের অন্য সময়গুলো অতিবাহিত করেন তারা। প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, একজন ব্যবসায়ী বা শ্রমজীবী মানুষ যদি ৪-৫ মাসের আয় দিয়ে সারাটা বছর অতিবাহিত করেন তাহলে কতটা চাপ পড়তে পারে একজন পর্যটকদের ওপর, তা ভাবনার বিষয়ই বটে।
আমরা দেখেছি সাধারণ মানের একটি হোটেলে যদি এক রাত যাপন করতে হয় সেক্ষেত্রে এক হাজার টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হয়। আরেকটু ভালো হলে দশ হাজারে গিয়ে ঠেকে, তারচেয়ে ভালো হলে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ঠেকে। বুঝলাম তারকা হোটেলগুলোতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকায় ভাড়া অনেক বেশি, তাই বলে সাধারণ মানের হোটেলে এক রাত ঘুমাতে এতটাকা গুনতে হবে কেন! বিষয়টা আমাদের কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। ধরা যাক, গড়ে সাধারণ মানের একটি হোটেলের এক কামরা বাবদ ২ হাজার টাকা ভাড়া, তাহলে সেই কামরা থেকে মাসিক উপার্জন হয় ৬০ হাজার টাকা। ৫ মাসে উপার্জন হয় ৩ লাখ টাকা। একেকটি হোটেলে গড়ে যদি ৩০টি কামরাও থাকে তাহলে ৫ মাসে উপার্জন হয় ৯০ লাখ টাকা। অফ সিজনের বাকি ৭ মাসের আয় যদি ১০ লাখও হয় তাহলে সাধারণ মানের একটি হোটেল থেকে বছরে উপার্জন হয় প্রায় কোটি টাকার ওপরে। এই হচ্ছে অতি সাধারণ আবাসিক হোটেলের সর্বনিম্ন হিসাব-নিকাশ। এখানে গড় হিসাব ধরা হয়েছে; এ হিসাবের কিছুটা হেরফের রয়েছে। পর্যটকদের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরার জন্য এ হিসাব দেখানো হয়েছে।
সূত্র মতে জানা যায়, কক্সবাজারে আবাসিক হোটেলের সংখ্যা পাঁচশ প্রায়। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে হোটেলপ্রতি গড়ে বছরে ১ কোটি টাকা হিসাবে পাঁচশ হোটেল থেকে উপার্জন হচ্ছে ৫০০ কোটি টাকা। যার ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ সরকার ৭৫ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার কথা। সেটি পাচ্ছে কি না তা আমাদের জানা নেই। আমাদের জানা নেই খাবার হোটেলগুলো থেকে কী পরিমাণ ভ্যাট পাচ্ছে সরকার। এ গেল শুধু আবাসিক হোটেলের হিসাব। তারপরে খাবার হোটেলের কথায় আসা যাক। খাবার হোটেলগুলো মানুষের পকেট কাটে এ কথা বললে ভুল হবে, রীতিমতো হোটেলগুলো পর্যটকদের গলা কেটে নিচ্ছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, বিচের চেয়ারগুলোতে বসতে গেলেও বিপত্তি ঘটে। ঘণ্টায় ৩০ টাকা হারে গুনতে হচ্ছে। এটা শুধু কক্সবাজারই নয়, কুয়াকাটায়ও অমনটি হচ্ছে। এক্ষেত্রে আরেকটু ছাড়ের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি আমরা। এতসব অনিয়মের পরেও পর্যটকরা কক্সবাজার ছুটে আসে একটু প্রশান্তির উদ্দেশ্যে। জল-সাগরের সঙ্গে মিতালি পাতাতে। অথচ বাড়ি ফেরে টাকার শোকে রোগাক্রান্ত হয়ে।
শুধু কক্সবাজারেই নয় একইভাবে লক্ষ করা যায় সেন্টমার্টিন দ্বীপ, কুয়াকাটা, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সুন্দরবন, নিঝুম দ্বীপ, সিলেটসহ দেশের সব পর্যটন এলাকায়। পর্যটকদেরকে শুধু স্পটেই গচ্ছা দিতে হচ্ছে না, গচ্ছা দিতে হচ্ছে চলতি পথেও। হাইওয়ের পাশে সামান্য জলখাবার খেতে নামলেও পকেট কেটে নিতে দেখা যায়। দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে কুয়াকাটা ভ্রমণে গেলে যাতায়াতের সময় অর্থাৎ লঞ্চে আরেক বিপত্তি ঘটে। সব খাবার দ্বিগুণ দামে কিনতে হয়। এতকিছুর পরে কুয়াকাটা গিয়েও স্বস্তি নেই। আবাসিক হোটেলের চড়া দামের সঙ্গে খাবারের দাম পর্যটকদের ভীষণ ভোগান্তিতে ফেলে দেয়। যা দেখার কেউ নেই বললেই চলে। এই চিত্র শুধু কক্সবাজার-কুয়াকাটাই নয়, দেশের সব পর্যটন এলাকার হালচাল। অর্থাৎ যেখানে রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল রয়েছে সব স্থানেই একই অবস্থা। বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যে, পর্যটকরা তার পকেটের মালিক হলেও পকেটের ভেতরের জিনিসের মালিকানা আর ধরে রাখতে পারে না।
সত্যি কথা বলতে আমাদের দেশে বিনোদন কেন্দ্রের যথেষ্ট অভাবও রয়েছে, ঢেলে সাজানোর মতো বিনোদন কেন্দ্র খুব একটা নেই। প্রকৃতির অজস্র দর্শনীয় স্থান থাকা সত্তে¡ও আমরা তা ঢেলে সাজাতে পারিনি। তার একটি উদাহরণ হচ্ছে কক্সবাজার এবং পার্বত্য এলাকা। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির মতো জায়গাগুলোতে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারছি না আমরা। দুর্গমের অজুহাতে পিছিয়ে রয়েছে এলাকাগুলো। অথচ কী নেই ওখানে! সেই তুলনায় কক্সবাজার নস্যি। তারপরেও যাতায়াতের দিকটি বিবেচনায় এনে পর্যটকরা ছুটে আসেন কক্সবাজারে। কিন্তু সেই স্থানটি এখন আর নিরাপদ নয়। বছরখানেক আগেও অস্ট্রেলিয়ার একজন নারী পর্যটক যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন। শুধু তিনি নন, দেশি পর্যটকদের অনেকের কাছেই এ ধরনের অভিযোগ আমরা শুনতে পাচ্ছি মাঝেমধ্যে। তা ছাড়া নানা ধরনের প্রতারণার অভিযোগ তো রয়েছেই।
সব বিবেচনায় নির্দ্বিধায় বলা যায়, আমাদের পর্যটন শিল্প সমৃদ্ধ কিন্তু নিরাপদ নয়। দেশি-বিদেশি পর্যটক বাড়াতে হলে কিংবা এ শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে হলে দ্রæত নিরাপত্তার দিকটি নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের। পকেট কেটে নেওয়ার দিকেও নজর দিতে হবে। তারপর অলাদাভাবে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। যদিও সরকার ইতোমধ্যে মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছেন কক্সবাজারকে ঢেলে সাজাতে। সেখানে মহেশখালী ট্যুরিজম পার্ক গড়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নিঃসন্দেহে বলা যায় আমাদের জাতীয় অর্থনীতির
সমৃদ্ধি ঘটবে। আগামী দিনের সেই প্রত্যাশায়ই রইলাম আমরা।

ষ সাহিত্যিক







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]