ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১ ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১

মৃত্যুপথে দেশান্তর  ঠেকানো জরুরি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৩৮ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 22

অবৈধপথে দেশান্তর একটি বৈশি^ক ঘটনা। বাংলাদেশে এ হার দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। করোনাকালেও এর বিশেষ হেরফের হয়নি। গত কয়েক মাস ফেসবুকসহ অন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি তরুণ স্বপ্নের ইউরোপে পৌঁছাবে বলে অপেক্ষার প্রহর গুনছে বসনিয়ার জঙ্গলে।
হাড় কাঁপানো শীতের প্রকোপে মানবেতর জীবনযাপন করছে পর্যাপ্ত খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশ-প্রতিবেশে। এ ছাড়াও অনেকে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে ঘুরপাক খাচ্ছে বিভীষিকাময় আমাজন জঙ্গলে। মানবপাচারের প্রকৃতি ও কার্যকারণ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এই জঘন্যতম অপরাধটি সংগঠিত করা কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে আদৌ সম্ভবপর নয়। হাজারো মানুষের জীবনকে বিপদাপন্ন করার পেছনে জড়িয়ে আছে বিশাল এক চক্র। যে দেশে মানবপাচার হয় সেই দেশে দালালদের মধ্যে থাকে বিশাল এক যোগসূত্র ও সমন্বয়। সম্প্রতি ইউএনএইচসিআর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশে চেষ্টাকারীদের তালিকায় বাংলাদেশ চতুর্থ! যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ও সিরিয়ার মতো দেশের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। নিঃসন্দেহে এই পরিসংখ্যান আমাদের উৎকণ্ঠার বড় কারণ।
বিগত কয়েক দশকের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন অনেক স্থিতিশীল ও ঊর্ধ্বমুখী। তারপরও কেন এসব তরুণ টাকার জন্য ইউরোপ ও আমেরিকার মোহে প্রলুব্ধ হয়ে মৃত্যুপথকে বেছে নিচ্ছে?
আমরা যদি এর কারণ খুঁজি তাহলে দেখব বেকারত্ব একটি বড় কারণ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভ‚ত উন্নতি করা সত্তে¡ও আমাদের জনগোষ্ঠীর বিশাল এক অংশ কর্মহীনতা তথা বেকারত্বের বেড়াজালে আটকে আছে। কর্মসংস্থানের অভাবে দিশেহারা এক বিশাল জনগোষ্ঠীর ধারণা, বিদেশে গেলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবে এবং পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরে আসবে। এ ছাড়াও শিক্ষিত এক তরুণের অভিমত যে শুধু ডলারের মোহ নয়, পড়াশোনা শেষে ভালো চাকরির অভাব, কম বেতন, ব্যবসায় ঝুঁকি-অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় রেখে দেশ ছাড়তে চায় তারা। তাদের এই অন্ধ বিশ^াসকে পুঁজি করে স্বার্থ হাসিল করে পাচারকারীরা। নারীদের ক্ষেত্রেও যেসব বিষয় অবৈধপথে দেশ ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে তার মধ্যে সদ্য তালাকপ্রাপ্ত হওয়া, অল্প বয়স্ক বিধবা, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য হওয়া, উন্নত জীবনের প্রত্যাশা উল্লেখযোগ্য। অনেক সময় অপহরণ বা প্রেমের ফাঁদে ফেলে পাচার করা হয় দেশ-বিদেশে। মানবপাচারের পেছনে আর্থিক দৈন্যদশা অন্যতম কারণ হলেও এক্ষেত্রে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার রয়েছে ব্যাপক গাফিলতি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগহীনতার দৃষ্টান্ত। জাতির জন্য লজ্জা ও অপমানের হলেও মানবপাচার বন্ধে প্রশাসনিক উদ্যোগে কতটা আন্তরিকতা রয়েছে তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। মানবপাচারের মতো জঘন্য লজ্জা থেকে বাঁচতে ২০১২ সালে মানবপাচার দমন ও প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হলেও তা বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোয় পরিণত হয়েছে। বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রতা প্রশমনে ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণে এই আইনের অধীনে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা হয়নি। ফলে ভিন্ন ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনার জন্য বিচার পেতে বেগ পেতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। কিন্তু যেকোনো বিচারের দীর্ঘসূত্রতাই তার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। মানবপাচার অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গোপন বিষয় হওয়ায় ভুক্তভোগীর কাছে সাধারণত এর কোনো দলিল বা নথিপত্র থাকে না। সামাজিক কারণে ভিকটিমের অনেকেই সামনে আসতে চায় না। স্বল্পসংখ্যক ভুক্তভোগী রাষ্ট্রের কাছে প্রতিবিধান চাইলেও আইনের শিথিলতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে তারা সুবিচারের আশা ছেড়ে দিচ্ছে। আর এই সুযোগ গ্রহণ করে চতুর দালাল চক্র। যারপরনাই মানবপাচারের লাগাম টেনে ধরা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ঘৃণ্য এই লজ্জা থেকে বাঁচতে আইনের স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি একটা বড় কার্যকর ভ‚মিকা পালন করতে পারে। পাচার হওয়া ভিকটিম যারা নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসে তাদের নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করে তাদের অভিজ্ঞতা ও দুর্দশার কথা প্রত্যন্ত অঞ্চলে তুলে ধরলে মানুষের মধ্যে একটা সচেতনতাবোধ সৃষ্টি হবে। যা মানবপাচার রোধে অত্যন্ত কার্যকর ভ‚মিকা পালন করতে সক্ষম। সর্বোপরি মানবপাচারের পেছনে দায়ী দারিদ্র্য, কর্মমুখী শিক্ষার অপ্রতুলতা, স্বল্প শিক্ষা, ভঙ্গুর পরিবার, পরিবেশ ও পারিপাশির্^ক অবস্থা, অস্পষ্ট অভিবাসী নীতিমালাসমূহকে চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্টদের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।

ষ মো. সিরাজুল ইসলাম সোহাগ
     শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]