ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১ ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১

করোনার ভ্যাকসিন ও বেসরকারি খাত
রণেশ মৈত্র
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২১, ১১:০৯ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 24

 করোনা সারা বিশে^ এক ভয়াবহ মহামারির সৃষ্টি করেছে। গোটা বিশে^র মানুষ আজ গভীর সঙ্কটে। কয়েক কোটি মানুষ সংক্রমিত বিগত একটি বছরে। নতুন বছরকে তবুও মানুষ স্বাগত জানিয়েছে গভীর প্রত্যাশায়। প্রত্যাশা করোনা মুক্তির, প্রত্যাশা রোগমুক্ত নিরাপদ ও নিরুদ্বেগ জীবনের। নতুন বছরটি তৃতীয় সপ্তাহ পার হয়েছে। এখনও মৃত্যুর হিমশীতল মিছিল দেশে দেশে চলছেই। মৃত্যুর ও আক্রান্তের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছেই।
বিজ্ঞানীরা সারা বিশে^ কাজ করে চলেছেন মানুষ বাঁচানোর লক্ষ্যে। তাদেরকে অভিবাদন তারা করোনার প্রতিরোধক হিসেবে ভ্যাকসিন বহু গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রভৃতি প্রাণীদেহে, মানবদেহে ঘটিয়ে নানা দেশে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে বিশে^ মানুষ বাঁচানোর অভিযান চালাচ্ছেন। শতভাগ সাফল্যের নিশ্চয়তা তবুও আজও পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছে এবং সেগুলোর কার্যকারিতাও ভিন্ন ভিন্ন বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। কোনো ব্র্যান্ডের ভ্যাকসিন কমবেশি শতকরা ৮০ ভাগ সাফল্য দাবি করেছে, কোনোটা আবার ৭০ ভাগের মতো। কোনোটা ৫০ ভাগের মতো বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোই শুধু নয় বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাও সেগুলোর অনুমোদন দিয়েছে।
অনুমোদন পাওয়ার পর কোম্পানিগুলো তাদের পণ্য বাজারজাত করার জন্য ব্যাপকভাবে উৎপাদন শুরু করতে না করতেই বহু দেশ বিভিন্ন কোম্পানিকে অগ্রিম টাকা দিয়ে দ্রæত যাতে তাদের প্রয়োজন মতো পেয়ে যায় তা নিশ্চিত করেছে। অনেকগুলো দেশ ইতোমধ্যে হাজারে হাজারে নানা স্তরে মানুষের মধ্যে প্রয়োগও করতে শুরু করেছে। বাঁচার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র মানুষের এমন লড়াই একযোগে ঘটতে অতীতে কোনোদিন পৃথিবীর কোনো দেশেই দেখা যায়নি।
আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনগুলোর পরিবহন-সংরক্ষণও যথেষ্ট কঠিন। কোনো কোম্পানির ভ্যাকসিন ৭০ ডিগ্রির নিচে অত্যধিক ঠান্ডায় রেখে পরিবহন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ওই তাপমাত্রা মানবদেহে প্রয়োগের মুহূর্ত পর্যন্ত বজায় রাখতে হবে। পাশ্চাত্যের অনেক উন্নত দেশেও এমন সংরক্ষণ পরিবহন ব্যবস্থা নেই, ছিলও না। ফলে তাদেরকে তেমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হচ্ছে।
আবার ভ্যাকসিনের দামের ভিন্নতা দেশ ভেদে, কোম্পানি ভেদে যথেষ্ট কম-বেশি। এটিও কম সঙ্কট নয়। এতে সংশয়ের সৃষ্টিও হচ্ছে ব্যাপকভাবে। সাধারণ ভাবনা হলো যে ভ্যাকসিনের দাম যত বেশি সে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতাও তত বেশি। অনুরূপভাবে যে কোম্পানির ভ্যাকসিনের দাম যত কম সে ভ্যাকসিনের উপকারিতাও নাকি কম। এমন ধারণা হতেই পারে দামের ব্যাপক পার্থক্যের কারণে। এ ব্যাপারে একমাত্র বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাই পারে মানুষকে সঠিক ধারণা দিয়ে সংশয় মুক্ত করতে।
দামের এই ভিন্নতা আবার অস্বাভাবিকও না। কারণ, বিভিন্ন দেশে উৎপাদন ব্যয় বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে এবং উৎপাদন ব্যয়ই শেষ বিচারে পণ্যের মূল্য নির্বাচনে সর্বোচ্চ বা নিয়ামক ভ‚মিকা পালন করে থাকে। তদুপরি, নানা দেশে বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্যাকসিন পাঠাতে পরিবহন খরচ, সংরক্ষণ খরচ প্রভৃতি বিভিন্ন রকমের। পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে আসা পর্যন্ত মূল্যের ব্যাপক তারতম্য ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। আর এ আশঙ্কা সত্যি হলে ভ্যাকসিনটি ধনীর দুলালরা ছাড়া সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, বিত্তহীন মানুষেরা ক্রয় শক্তির অভাবে বঞ্চিত হবে কি না সে শঙ্কাকে এ মুহূর্তে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এতগুলো সংশয় ধারণ করার পর আরও একটি সংশয়ের সৃষ্টি হলো আরও একটি খবর দেখে। খবরটি হলো ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এ খবর সত্য হলে দ্রæত অনুসন্ধান করা দরকার ওই মৃত ব্যক্তিরা আগে থেকে করোনায় আক্রান্ত বা লক্ষণ যুক্ত ছিল কি না, তারা কোন ব্র্যান্ডের ভ্যাকসিন নিয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট অপরাপর বিষয়। তবে এ কথা ঠিক, পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য হওয়া সত্তে¡ও ওষুধের কার্যকারিতা কখনই সমান হয় না। কিছু মৃত্যু ঘটতেই পারে। তবে দেখার বিষয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর মানুষ করোনা সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকছে কি না।
সংশয় আরও একটি। আমরা কলেরার টিকা, বসন্তের টিকা, শিশুদের ভিন্ন ধরনের টিকা আরও নানা রোগের নানা জাতীয় টিকা নিয়ে শতভাগ সাফল্য অর্জনের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছি। আজ আর ওই রোগগুলোর অস্তিত্বও চোখে পড়ে না। কিন্তু কোনো কোনো ব্র্যান্ডের করোনা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার মেয়াদ না কি দুই বছর মাত্র। এ তথ্য সঠিক হলে প্রশ্ন থেকেই যায় একটি মানুষ তার জীবদ্দশায় করোনা মুক্ত থাকতে হলে তাকে কতবার ভ্যাকসিনটি নিতে হবে? অথবা আর্থিক সাধ্য শক্তি কমে এলে যখন ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে তখন তারা দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাকসিন ব্যবহার করে করোনামুক্ত থাকার পর আবারও ব্যবহারের আর্থিক শক্তিহীনতার কারণেই করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়বে।
তাই সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে যাতে প্রতিটি দেশের সব নাগরিকই ভ্যাকসিন সুবিধা নিশ্চিতভাবে পেতে পারে তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
করোনা যেহেতু মারাত্মক রকমের ছোঁয়াচে রোগ তাই করোনা ভ্যাকসিন প্রয়োগযোগ্য কোনো ব্যক্তিই তা তিনি বা তারা যে দেশেরই মানুষ হন না কেন যেমন ভ্যাকসিন বঞ্চিত না থাকেন তার ব্যবস্থা করতে হবে। এক দেশ মুক্ত হলো, অপর দেশ হলো নাÑ এমনটিও চলবে না করোনার ক্ষেত্রে। সামান্য ত্রæটি, সামান্য অবহেলা (আমেরিকার ক্ষেত্রে আমরা যা প্রত্যক্ষ করলাম) ভয়াবহ বৈশি^ক বিপর্যয় দফায় দফায় ডেকে আনতে পারে। আমরা যেন ভুলে না যাই, করোনা মুক্ত বিশ^ গড়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য সম্পূর্ণ পরিত্যজ্য। তাই একদিকে ভ্যাকসিন উৎপাদন কোম্পানিগুলোর উচিত হবে বিশে^র সবার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা সৃষ্টির স্বার্থে মান অক্ষুণœ রেখে ভ্যাকসিনের দাম যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা; অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে ভ্যাকসিনের মানের বা কার্যকারিতার ক্ষেত্রে বিরাজমান বিভিন্নতা দূর করা এবং ভ্যাকসিনের পরিবহন-সংরক্ষণ প্রভৃতির ক্ষেত্রে তাপমাত্রা এমন মাত্রায় নিয়ে আসা যাতে সাধারণের ব্যবহৃত ফ্রিজে তা সংরক্ষণ করলেও ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা হ্রাস না পায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় আরও অনেক বেশি। পরিবহন-সংরক্ষণ ব্যবস্থা আমাদের দুর্বল ও সময়সাধ্য। উপযুক্তভাবে প্রশিক্ষিত জনবলের নিদারুণ অভাব। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত। দারিদ্র্য কবলিত, কর্মহীন বেকার, স্বল্পবিত্ত, বিত্তহীনের সংখ্যাও বিস্তর। তাই একদিকে যেমন যত শিগগির সম্ভব, সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন ভ্যাকসিন নানা উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হবেÑ তেমনই আবার তার সস্তরে পরিবহন-সংরক্ষণ যাতে সর্বাধিক বিজ্ঞানসম্মত হয়Ñ তাও নিশ্চিত করতে হবে। দ্রæত ভ্যাকসিন প্রদানের জন্য প্রশিক্ষিত জনবলও দেশব্যাপী গড়ে তুলতে হবে।
সর্বাপেক্ষা বড় কথা হলো মানসম্পন্ন ভ্যাকসিন দেশের সব নাগরিকের জন্যই (যাদের ভ্যাকসিন দেওয়া মেডিকেল কারণে অনুচিত তাদেরকে বাদ দিয়ে) বিনামূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা অতি অবশ্য করা প্রয়োজন। এ কথা নিশ্চিত, যেসব দাম পত্রিকায় দেখছি তাতে ওই ধরনের দামে পরিবারের সবার জন্য ভ্যাকসিন কেনা ও গ্রহণ করা আমাদের দেশে অসম্ভব। আবার যেহেতু রোগটি মারাত্মক রকমের ছোঁয়াচে তাই সবাইকে করোনামুক্ত করতে না পারলে সংক্রমণ পুনঃসংক্রমণ ঘটতেই থাকবে। এ বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে।
আমাদেরকে প্রতিদিনের করোনা আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তির সংখ্যা হ্রাসের সুখবর শোনানো হচ্ছে। আমরাও খুশি হচ্ছি কিন্তু গভীরভাবে সংশয়াচ্ছন্ন চিত্তে। প্রতিদিন পরীক্ষার সংখ্যা কমানো হচ্ছে ফলে মৃতের সংখ্যা তো স্বাভাবিকভাবেই কম আসবে। যেখানে আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটিরও অধিক সেখানে মাত্র আট লাখ মানুষের করোনা টেস্ট সম্পন্ন হওয়ার খবর যেকোনো বিচারেই অগ্রহণযোগ্য ও হতাশাব্যঞ্জক। টেস্ট যেন সরকারের বিবেচনায় অপ্রয়োজনীয় অবাঞ্ছিত তাই কিছুদিন বিনা পয়সায় টেস্ট করার পর তার ওপর মূল্য ধার্য করা হলো। ফলে টেস্টের সংখ্যা কমে গেল। দিন দিন প্রচারের কল্যাণে আরও কমছে। ফলে টেস্ট না করার কারণে জানাও যাচ্ছে না বাংলাদেশে কতজন প্রতিদিন প্রকৃত করোনা সংক্রামিত হচ্ছে কতজন মারা যাচ্ছে। পৃথিবীর সব দেশে করোনা টেস্ট বিনা পয়সায় করা হয়েছে এবং হচ্ছে। অনুরূপভাবে ভ্যাকসিনও বেশিরভাগ দেশে বিনামূল্যে নাগরিকদেরকে দিচ্ছে। তাদের তুলনায় আমরা আদৌ ধনী রাষ্ট্র নই বরং বহুলাংশ গরিব। তদুপরি অন্যান্য দেশে যেভাবে কঠোরভাবে মানুষজনকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করেছে, আমাদের দেশে কার্যত তা করা হয়নি। ফলে ছোঁয়াচে এই রোগটির ব্যাপক সংক্রমণ ঘটাই স্বাভাবিক।
সেদিন ভারতে গেল কুম্ভস্নান। স্বাস্থ্যবিধি মানানো হলো স্নানার্থী-পুণ্যার্থীদেরকে। আমরা গণপরিবহনেও স্বাভাবিকভাবে মানুষ চলাচল করতে দিচ্ছি।
আবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সরকার ঘনিষ্ঠ এক ধনী ব্যবসায়ীকে বেসরকারিভাবে করোনা ভ্যাকসিন আমদানি ও বিপণন করার। বেসরকারি ব্যবসায়ীরা মুনাফা ছাড়া অন্যভাবে কথা বলে শুনিনি। পৃথিবীর অন্য কোথাও বেসরকারিভাবে ভ্যাকসিন কেনাবেচার সুযোগ দেওয়া হয়নি। সরকারিভাবে
পরিবহন-সংরক্ষণ-বিপণন ও ভ্যাকসিন মানবদেহে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি মূল্য নির্ধারণে কোনো নিয়ন্ত্রণ মানবে নাÑ তাদের কোনো জবাবদিহিতাও থাকবে না। তাদের কাছ থেকে কিনে এনে দেশব্যাপী ওষুধ বিক্রেতা নিশ্চিতভাবেই অবৈজ্ঞানিক পন্থায় তা নানা স্থানে পরিবহন-সংরক্ষণে নিয়োজিত হবে। ফলে ভ্যাকসিন কার্যকারিতা হারাবে। সুতরাং অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করা হোক। সার্বিক দায়িত্ব সরকারের হাতে রাখা হোক।

ষ সভাপতি মÐলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]