ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১ ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১

মহানবী ও সাহাবিদের শরীরচর্চা
হাবীবুল্লাহ আল মাহমুদ
প্রকাশ: রোববার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১, ১০:৩৪ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 90

পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষকে বিভিন্ন হক আদায় করে চলতে হয়। পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান, স্বজন-প্রতিবেশী, বন্ধু-সহকর্মী নানা মানুষের হক আদায়ের পাশাপাশি নিজেরও রয়েছে কিছু হক। প্রত্যেকেই নিজের শরীরের হক আদায়ের প্রতিও সচেষ্ট হওয়া চাই। এ বিষয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে।’ (বুখারি : ৬১৩৪)। শরীরের হক হচ্ছে শরীর সুস্থ রাখা। দেহমন সতেজ ও প্রফুল্ল রাখা। মানসিক স্থিতির পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতার জন্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা। শরীরের কোষগুলোকে সতেজ রাখতে উত্তম খাবার গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজন শরীরচর্চা করা। তাই আদিম থেকেই চলে আসছে শরীরচর্চার ধারা। তবে যুগ ও স্থানভেদে শরীরচর্চার ধরনে পার্থক্য ছিল।
প্রাকৃতিকভাবে প্রাচীন আরবদের জীবন-জীবিকা ছিল পরিশ্রমনির্ভর। মরুর রূঢ় পরিবেশে বেঁচে থাকতে প্রয়োজন হতো সুদৃঢ় মনোবল ও শারীরিক পরিশ্রমের। ফলে দৈহিক গঠনে ছিল তারা মজবুত। তবে প্রাকৃতিক কারণে তাদের শরীরচর্চা হয়ে গেলেও নানা সময় ঘটা করেও হতো শরীরচর্চা। হতো শরীরচর্চার উৎসব। এমনকি শরীরচর্চার বিষয়টি সোনালি যুগেও বিদ্যমান ছিল। সাহাবায়ে কেরামের শরীরচর্চার রূপ ও ধরন কেমন ছিল সে বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।
হাঁটাহাঁটি-দৌড়ানো : আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’ (মুসলিম : ২৬৬৪)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় মুমিন হবে সর্বতভাবে শক্তিশালী। মনস্তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি হবে দৈহিকভাবেও শক্তিশালী। আর দৈহিক গঠনে শক্তিশালী থাকার সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হলো দৌড়ানো। শরীরচর্চার এটাই সর্বাধিক প্রচলিত পদ্ধতি। সাহাবিদের মাঝে দৌড় প্রতিযোগিতাও হতো। এমনকি আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজেও দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার নবীজি (সা.) আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করলেন। তখন আমি আগে বেরিয়ে গেলাম এবং জয়ী হলাম। পরে যখন আমার শরীর ভারী হয়ে গেল তখন রাসুল (সা.) আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করে আমাকে হারিয়ে দিলেন। এরপর তিনি বললেন, এবার আগেরবারের বদলা গ্রহণ করলাম! (আবু দাউদ : ২৫৭৮)। নবীজির হাঁটা-চলা সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি নবীজির (সা.) চেয়ে দ্রুতগতিতে কাউকে হাঁটতে দেখিনি।’ (তিরমিজি : ৩৬৪৮)
ঘোড়দৌড় : একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুততম বাহন ছিল ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে চড়ে মানুষ দূর বহুদূর ছুটে যেত। যুদ্ধসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হতো এই ঘোড়া। পবিত্র কোরআনে ঘোড়া সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা তিনিই সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাতে আরোহণ করতে পার।’ (সুরা নাহল : ৮)। প্রাচীন লোকদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত ঘোড়ায় চড়ার জন্য প্রয়োজন হতো শারীরিক কলাকৌশলের। সাহাবিরাও শৈশবে শিখে নিতেন ঘোড়ায় আরোহণ ও পরিচালনা পদ্ধতি। প্রতিনিয়ত ঘোড়ায় আরোহণের কারণে শারীরিক যে আন্দোলন হতো এর মধ্যেই হয়ে যেত শরীরচর্চা। তবে নিয়মিত ঘোড়ায় আরোহণের পাশাপাশি কখনও কখনও সাহাবাদের মাঝে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতাও হতো। হজরত আবদুল্লাহ‌ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) যুদ্ধের জন্য তৈরি ঘোড়াকে ‘হাফয়া’ (নামক স্থান) হতে ‘সানিয়াতুল ওয়াদা’ পর্যন্ত দৌড় প্রতিযোগিতা করিয়েছেন। আর যে ঘোড়া যুদ্ধের জন্য তৈরি নয়, সে ঘোড়াকে ‘সানিয়া’ হতে যুরাইক গোত্রের মসজিদ পর্যন্ত
দৌড় প্রতিযোগিতা করিয়েছেন। আর এই প্রতিযোগিতায় আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) অগ্রগামী ছিলেন।’ (বুখারি : ৪২০)
কুস্তি : পৃথিবীর প্রাচীন খেলার মধ্যে কুস্তি অন্যতম। শারীরিক কৌশল ও শক্তিতে একে অন্যকে ধরাশায়ী করাই কুস্তি। ফলে কুস্তিকে যুদ্ধখেলাও বলা যায়। সাহাবিদের মাঝে এই খেলার প্রচলন ছিল। নবী (সা.) নিজেও কুস্তি করেছেন। হজরত রুকানাহ (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি নবীজির (সা.) সঙ্গে মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং নবী (সা.) তাকে মল্লযুদ্ধে ভূপাতিত করেছিলেন। (আবু দাউদ : ৪০৭৮)। হজরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) প্রতিবছর মদিনার আনসার কিশোরদেরকে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করাতেন। তাদের মধ্যে যারা পরিণত তাদেরকে সৈন্যবাহিনীতে সংযুক্ত করা হতো। একবার আমিও তাদের সঙ্গে আমাকে প্রদর্শন করলাম। রাসুল (সা.) একজন কিশোরকে সৈন্যবাহিনীতে সংযুক্ত করলেন আর আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি তাকে সংযুক্ত করলেন আর আমাকে ফিরিয়ে দিলেন, অথচ যদি আমি তার সঙ্গে কুস্তি করতাম তা হলে আমি তাকে পরাজিত করে দিতাম। তখন রাসুল (সা.) বললেন, তা হলে কুস্তি কর! তখন আমি কুস্তি খেলে তাকে পরাজিত করলাম।’ (বাইহাকি : ১৮২৬৭)
তীর নিক্ষেপ : সাহাবিদের মাঝে শরীরচর্চার অন্যতম মাধ্যম ছিল তীর নিক্ষেপ। তীর-ধনুক সাহাবিদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকায় এর মাধ্যমে হয়ে যেত তাদের শরীরচর্চা। এমনকি তীর নিক্ষেপণের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে রাসুল (সা.) উৎসাহও প্রদান করতেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে তীর পরিচালনা শিখল তারপর তার অভ্যাস ছেড়ে দিল সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম : ৪৮৪৩)। অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যথাসাধ্য শক্তি সঞ্চয় কর। জেনে রাখ, তীর ক্ষেপণই হলো শক্তি। জেনে রাখ, তীর ক্ষেপণই হলো শক্তি। জেনে রাখ, তীর ক্ষেপণই হলো শক্তি।’ (মুসলিম : ১৯১৭)
সাঁতার কাটা : সাঁতার হলো শরীরচর্চার সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি। দেহের অঙ্গ ভেদে অনেক সময় শরীরচর্চার পদ্ধতিও আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। কিন্তু সাঁতারে পাওয়া যায় একসঙ্গে সব কিছু। তাই শরীরচর্চার আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় সাঁতারকে। সাঁতারের ব্যাপারে প্রিয় নবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর জিকির ও স্মরণ ব্যতীয় অন্যান্য কাজ অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক, তবে চারটি কাজ ব্যতিক্রমÑ ১. তীর নিক্ষেপণ। ২. ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। ৩. স্ত্রীর সঙ্গে আনন্দঘন মুহূর্ত কাটানো। ৪. সাঁতার শেখা।’ (তাবরানি : ২/১৯৩)। নিয়মিত শরীরচর্চায় দেহমন সতেজ থাকে, ইবাদত-বন্দেগিতে স্বতঃস্ফূর্ততা আসে। আল্লাহ আমল করার তওফিক দান করুন।
শিক্ষক, শাইখুল হিন্দ রহ. ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, সানারপাড়, নারায়ণগঞ্জ




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]