ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৮ মার্চ ২০২১ ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ৮ মার্চ ২০২১

ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব প্রশাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১০:২৯ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 52

একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন দক্ষ, সৎ, প্রতিশ্রুতিশীল কর্মীবাহিনী। আবার এই কর্মীবাহিনীকে সুচারুরূপে পরিচালনায় প্রয়োজন বিচক্ষণ, সৎ, যোগ্য, নির্মোহ, ভিশনারি নেতৃত্ব। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি পায়, তেমনি সেবাপ্রার্থী স্টেক হোল্ডারদের সেবা প্রাপ্তি সহজ হয়। এসব করা গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জনবান্ধব, সেবাবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার একটি জনকল্যাণমুখী, জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর সব সময় গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। এ ধরনের জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতে চালু করা হয়েছে ‘জনপ্রশাসন পদক’। অনুরূপ রাজস্ব আয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহকে জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে ‘অটোমেশন’ চালুসহ ব্যাপক সংস্কারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে।
জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সিংহভাগ রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান তথা ‘অর্থনীতির লাইফলাইন’ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে ‘জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব ও সেবায় অনন্য’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার অসাধ্য কাজটি করেছেন বর্তমান কাস্টমস কমিশনার। কাস্টম হাউসের সব পর্যায়ের প্রতিটি কাজে এর উজ্জ্বল স্বাক্ষর বিদ্যমান। কমিশনার ফখরুল আলম চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার হিসেবে ২০১৯ সালের ৯ জুন যোগদানের শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এ প্রতিষ্ঠানকে ‘জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব ও সেবাবান্ধব’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করেন। মূলত তার নানামুখী প্রচেষ্টা, উদ্ভাবনী দক্ষতা, বিচক্ষণতা, মেধা, মননশীলতা, সৃজনশীলতা, সততা, নিষ্ঠা দিয়ে কাজ করার পাশাপাশি সবার প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি, এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আমদানিকারক, রফতানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট, কাস্টম সরকার, জেটি সরকারসহ সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারদের জন্য কাস্টমস কমিশনারসহ সব পর্যায়ের কর্মকর্তার দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এভাবে দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে জনবান্ধব, গণমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হলে সেবা প্রত্যাশী মানুষের সেবা প্রাপ্তি যেমন সহজ হবে তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক জনগণের কাছে প্রদত্ত ‘জনবান্ধব প্রশাসন’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে।
প্রসঙ্গত সংযোগবিহীন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে ইতঃপূর্বে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তার মানুষের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার বিষয়টি ‘বিদ্যুতের ফেরিওয়ালা’ শিরোনামে পত্রিকায় গুরুত্বসহ সংবাদ প্রকাশিত হয়। অনুরূপ ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন এসি ল্যান্ড উন্মুক্ত মাঠে গাছতলায় অফিস স্থাপন করে সমস্যা সমাধান করাও প্রশংসনীয় কাজ। তেমনি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব ও সেবাবান্ধব রাজস্ব প্রশাসন হিসেবে গড়ে তুলে নিঃসন্দেহে কমিশনার ফখরুল আলম জাতীয় অর্থনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্যের চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে বিদ্যুতের ফেরিওয়ালা এবং গাছতলায় অফিস বসিয়ে ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ ভালো এবং মহৎ। কিন্তু আমরা যদি আমাদের নিজদের অফিস সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ অফিসকে ‘জনবান্ধব, সেবাবান্ধব’ ভোগান্তি এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি তাহলে সেটা জাতির বৃহত্তর কল্যাণ বয়ে আনবে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে চীনের উহান প্রদেশে সংক্রমিত প্রাণঘাতী করোনা মহামারি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে বিশে^র দেশে দেশে। আর ২০২০ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে বৈশি^ক মহামারি করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে। ধীরে ধীরে বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বৈশি^ক এই মহামারি। একই সঙ্গে করোনায় আক্রান্ত বিশে^র প্রায় সব দেশ ‘লকডাউন’ করা হয়। স্থবির হয়ে পড়ে বিশ^ অর্থনীতিসহ মানুষের জীবনযাত্রা। বাংলাদেশও এর বাইরে ছিল না। জনপ্রশানসহ শুধু জরুরি পরিষেবা তথা হাসপাতাল, ক্লিনিক, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ সংস্থা, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পরিবহনের গাড়ি, সংবাদপত্র, সংবাদপত্রবাহী যানবাহন এবং এসব সংস্থায় কর্মরতদের বহনের যানবাহন ব্যতীত সব রকম ব্যক্তিগত, গণপরিবহন, যানবাহন, অফিস, আদালত, কলকারখানা লকডাউনের আওতায় বন্ধ থাকে। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ খ্যাত চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে সার্বক্ষণিক খোলা রেখে আমাদানি ও রফতানি বাণিজ্য সচল রাখতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরামর্শে করোনায় এবং লকডাউনেও মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন কমিশনার। তিনি বিবেকের তাড়নায়, দেশপ্রেম, দায়িত্ব¡ ও কর্তব্যবাধÑ সর্বোপরি অর্থনীতি এবং শিল্পের চাকা সচল রাখতে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েও দুঃসাহস দেখাতে পেরেছিলেন কাস্টম হাউস খোলা রাখতে। এ সময় তার মনে হয়েছে করোনার এই সঙ্কটময় মুহূর্তে দেশের মানুষের যাতে ভোগান্তি বা আমদানিনির্ভর ভোগ্য পণ্যের সঙ্কট বা সঙ্কটের অজুহাতে মূল্য বৃদ্ধি না হয় সে জন্য আমদানি করা পণ্যের দ্রুত শুল্কায়ন, খালাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি আমদানিনির্ভর দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল সঙ্কট না হয় সে জন্য ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে কর্মকর্তা কর্মচারী নিজ নিজ কর্ম সস্পাদন করে গেছেন। এ পর্যায়ে অনেক কর্মকর্তা কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের সবাই করোনা থেকে সুস্থ হয়ে কর্মস্থলে ফিরেছেন। এর মধ্যে জসিম উদ্দিন মজুমদার নামে একজন রাজস্ব কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। কিন্তু এর মধ্যেও কাস্টম হাউসের শুল্কায়নসহ রফতানি কার্যক্রম এক দিনের জন্যও থেমে থাকেনি। বৈশি^ক মহামারি করোনার মধ্যে দেশের রাজস্ব আয়ের প্রধানতম কেন্দ্র চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের শুল্কায়নসহ দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের চাকা সচল ও অর্থনীতিকে গতিশীল রাখায় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জন করেছে। ওয়ার্ল্ড কাস্টমস ডে -২০২১ উপলক্ষে ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অরগানাইজেশনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষকে ‘সাটিফিকেট অব মেরিট’ পদকে ভূষিত করেছে। একই কারণে করোনায় মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে জাতির ক্রান্তিকালে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস খোলা রেখে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায় কার্যক্রমে জড়িত কাস্টম হাউসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘সম্মুখযোদ্ধা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদেরকে জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম অভিমত ব্যক্ত করেন। গত ২১ জুন রাজস্ব আদায় পর্যালোচনায় ভার্চুয়াল সভায় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান সভাপতির বক্তব্যে এই অভিমত ব্যক্ত করেন। ভার্চুয়াল সভায় রাজস্ব বোর্ডের সদস্যবৃন্দ এবং বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কমিশনারবৃন্দও অংশগ্রহণ করেন।
প্রসঙ্গত চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধানতম সমুদ্রবন্দর। এই বন্দরের কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল দেশের একক বৃহৎ রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠানই হচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। দেশে আমদানি-রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশই শুল্কায়ন কাজ সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মাধ্যমে। যার বার্ষিক পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৩০-৩৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, শিপিং বাণিজ্য খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ২৪ শতাংশ এবং সাধারণ পণ্যসামগ্রী হ্যান্ডলিংয়ে (বাল্ক কার্গো) প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৩০ শতাংশ। প্রতিবছর আমাদানি-রফতানির পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে কার্গোবাহী জাহাজ গমনাগমনের সংখ্যাও। বৈশি^ক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কাস্টম হাউসের কার্যক্রম অটোমেশন করা হয় ২০১৭ সালে। এখন শুল্কায়ন, নথি সংরক্ষণসহ সব কাজ সম্পন্ন হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে। ফলে সেবাগ্রহীতারা দ্রুত, সহজে সেবা পাচ্ছেন ও নথি সাবমিট থেকে শুরু করে সব কাজে স্বচ্ছতা অনেকাংশে নিশ্চিত হয়েছে। একই সঙ্গে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজস্ব আদায়ও। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শুল্কায়ন কার্যক্রম দ্রুত গতিতে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ের টার্গেট অর্জনে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মিথ্যা ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। এ জন্য একঝাঁক প্রতিশ্রুতিশীল, দক্ষ, মেধাবী, যোগ্য ও অত্যন্ত চৌকস কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে কাস্টম হাউসের এআইআর শাখাকে। এই শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সেলিম মোল্লা এবং আহমেদ নেওয়াজের সঙ্গে এক ডজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কাজ করছেন। এ শাখার যাবতীয় কর্মকাণ্ড ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা কমিশনার তদারকি করেন। তার পক্ষে সহকারী কমিশনার রেজাউল করীম এআইআর-এর কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করেন। এআইআর কর্মকর্তারা কোনো নথির নিষ্পত্তি করতে না পারলে তখন এর সমাধান দেন সহকারী কমিশনার। আর এ সংক্রান্ত কোনো নথি সহকারী কমিশনার পর্যায়ে সমাধান দেওয়া সম্ভব না হলে কমিশনারের নজরে এনে তা সামাধান দেওয়া হয়। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত গত ৬ মাসে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি, শুল্ক ফাঁকির চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদঘাটন ও মামলা রুজুর মাধ্যমে প্রায় শতাধিক কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করে এআইআর। প্রত্যাশা দেশের অপরাপর রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য সরকারি অফিস চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মতো জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব ও সেবাবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে। তাহলেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে।

ষ ফারিহা হোসেন
    ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]