ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ২০ এপ্রিল ২০২১ ৬ বৈশাখ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ২০ এপ্রিল ২০২১

ভাষা আন্দোলন : আসামের কমলা ভট্টাচার্য ও ঢাকার বরকত-সালাম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১০:৩৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 46

রণেশ মৈত্র
এ কথা সত্য, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি সন্তানেরা ভাষা আন্দোলন করেছিলেন, নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, হাজারে হাজারে কারাবরণ করেছিলেন, সারাটি প্রদেশে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ প্রভৃতি সেøাগানে রাজপথ মুখরিত করেছিলেন। তবে এখানকার বাঙালিরা ছাড়া অন্য কোথাও বাঙালিরা বাংলা ভাষার মর্যাদা আদায় করেছেন, লড়াই করেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আমরা তা স্বীকারই করি না। সব চাইতে বিস্ময়কর, আমাদের দেশের গণমাধ্যমসমূহও কদাপি তাদের কোনো প্রতিবেদনে বা মন্তব্যে প্রতিবেশী দেশের বাঙালিরাও যে তাদের
মাতৃভাষাকে সেই দেশে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন, সংগ্রাম করেছেন, জীবন বিসর্জন দিয়েছেন তা উল্লেখ করা হয় না। কোনো কোনো পত্রিকায় যদি হঠাৎ সে কাহিনি প্রকাশ করা হয় তা এমনভাবেই প্রকাশ করা হয় যে অনেক খুঁজে তাকে বের করতে হয়। ফলে, কারও নজরে পড়ে না খবরটি।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা ও পাবনার সংবাদপত্র হকার দিয়ে যাওয়ার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক সময়ের আলো’ পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় প্রথম কলামে ‘বিশে^র প্রথম নারী ভাষাশহীদ কমলা ভট্টাচার্য’ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত খবরটির প্রতি আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। ওই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছেÑ
কমলা ভট্টাচার্য বিশে^র প্রথম নারী ভাষাশহীদ। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৬১ সালে আসামে যে ১১ জন প্রাণ দিয়েছিলেন, তাদের একজন কমলা ভট্টাচার্য। তিনি ১৯৪৫ সালে সিলেটের শ্রীহট্টে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রাম রমন ভট্টাচার্য সুরবাসিন দেবীর সাত সন্তানের পঞ্চম সন্তান। কমলারা ছিলেন তিন ভাই ও চার বোন। চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। শৈশবেই তার বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর স্বভাবতই আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে দিন কাটতে থাকে কমলাদের পরিবারের। ১৯৪৭ সালে দেশত্যাগের সময় গণভোটের মাধ্যমে শ্রীহট্ট জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কমলারা পাকিস্তানেই থেকে যান। কিন্তু ১৯৫০ সালে হিন্দুদের সার্বিক গণহত্যা আরম্ভ হলে তার রেশ শ্রীহট্টেও এসে পড়ে। কমলার পরিবার শরণার্থী হিসেবে আসামে চলে যেতে বাধ্য হয়। তারা সিলেটের পাশর্^বর্তী আসামের কাছাড় জেলার শিলচরে এসে আশ্রয় নেন।
শিলচরে কমলারা থাকতেন শিলচর পাবলিক স্কুল রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে। কমলার বড়দিদি বেলু নার্সের চাকরি পেয়ে শিলিগুড়ি চলে যান প্রশিক্ষণ নিতে। কমলার মেজদিদি প্রতিভা ছিলেন শিক্ষিকা। কমলার পরিবার তার মেজদির আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শৈশবে কমলা ভর্তি হন শিলচরের ছোটেলাল শেঠ ইনস্টিটিউটে। কিন্তু স্কুলের পাঠ্যপুস্তক কেনার ক্ষমতা ছিল না কমলার। তিনি একবার বড়দিদিকে তার জন্য একটি অভিধান কিনে দিতে বললে তিনি সেটা কিনে দিতে পারেননি। কমলা তার সহপাঠীদের কাছ থেকে পাঠ্যপুস্তক ধার করে এনে বিষয়বস্তু খাতায় টুকে নিতেন।
১৯৬১ সালে কমলা ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসেন। তার ইচ্ছা ছিল পরিবারিক আর্থিক অনটন সত্ত্বেও তিনি স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়বেন। ম্যাট্রিকের পর তিনি টাইপ রাইটিং শিখবেন বলেও স্থির করেন। এমন একটি প্রতিকূল পরিবারিক ও আর্থিক পরিস্থিতিতে ১৯৬১ সালে কমলা ভট্টাচার্য ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দানের দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সেই বছর ১৯ মে হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা শেষ হওয়ার ঠিক পরদিন সকালে কমলা তার মেজদিদি প্রতিভার স্কুলে যাওয়ার জন্য রাখা শাড়ি ও ব্লাউজ পরেই এগার বছর বয়সি ছোটবোন মঙ্গলাকে সঙ্গে নিয়ে শিলচর রেলস্টেশনের নিকটে প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দেন। তাদের ঘরে কোনো খাবার না থাকায় ক্ষুধার্ত অবস্থায়ই আন্দোলনে বেরিয়ে পড়েন। কমলা পুলিশের কাঁদানে গ্যাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হওয়ার আগে মায়ের কাছ থেকে এক টুকরা কাপড় চেয়ে নিয়েছিলেন। সেদিন দুপুর পর্যন্ত প্রায় শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনকারীদের রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি চলছিল। কিন্তু দুপুরের পর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থানরত শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের ওপর উপর্যুপরি লাঠিচার্জ এবং আটক করতে শুরু করে। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপে অবরোধকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক সেদিক ছুটতে আরম্ভ করে।
পুলিশ সদস্যদের লাঠিচার্জে কমলা ভট্টাচার্যের ছোটবোন মঙ্গলা গুরুতর আহত হন। তৎক্ষণাৎ কমলা ছুটে গিয়ে মঙ্গলাকে সাহায্যের চেষ্টা করেন। ইতোমধ্যে পুলিশ সদস্যরা মিছিলকারীদের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। একটি গুলি কমলার চোখ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। সেই সময় আরও অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। অন্যান্য আহতদের সঙ্গে কমলাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে কমলা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন।
প্রতিবেদনটিতে অপরাপর শহীদের নাম নেই। তা খুঁজতে পুলিশের সাহায্য নিলাম। নামগুলি পেয়েও গেলাম।
কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, বীরেন্দ্রনাথ, হিতেশ বিশ^াস, সত্যেন্দ্রদেব, কুমুদ রঞ্জন দাশ, সুনীল শঙ্কর, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্রনাথ কাজল ও সুকোমল পুরকায়স্থ।
কমলার ছোটবোন মঙ্গলাকেও একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। মঙ্গলার জ্ঞান যদিও এক মাস পরে ফিরেছিল। মঙ্গলা চিরজীবনের মতো মস্তিষ্ক বিকৃতিতে ভুগছেন।
এই আন্দোলনের কাছে আসামি সরকারকে নতি স্বীকার করতে হয়েছিল। ওই সরকার প্রদত্ত এক সার্কুলারে সব জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছিল সব আসামবাসীর রাষ্ট্রভাষা হবে একমাত্র অহমিয়া। ঠিক যেন পাকিস্তানের স্রষ্টা জিন্নাহর কণ্ঠস্বরÑ যিনি ঢাকায় এসে বলেছিলেন, ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। জিন্নাহ অহমিকা প্রকাশ করেছিল ১৯৪৮ সালে। ১৯৫২ সালের তীব্র আন্দোলনে শত নির্যাতন, লাঠিচার্জ, কারাগারে আটক ও পুলিশের গুলিতে (বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার ও শফিকুর) বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে ১৯৫৬ সালে এসে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে বাধ্য হয়েছিল। তেমনই আসাম সরকারের অহমিকাপূর্ণ এ সার্কুলারকে আসামের বীর বাঙালি সন্তানেরা আন্দোলন, নির্যাতন, গ্রেফতার, লঠিচার্জ এবং শেষ পর্যন্ত এগারো জনের বুকের রক্তে শিলচরের রাস্তা রাঙিয়ে ওই সার্কুলার প্রত্যাহার করে নতুন সার্কুলার ইস্যু করার মাধ্যমে আসামের বাঙালি অধ্যুষিত তিনটি জেলাÑ যথা শিলচর, করিমগঞ্জ ও বাইলাকান্দিতে বাংলাকে অহমিয়া ভাষার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান করা হয়।
পরবর্তীতে আসাম সরকার শহীদ কমলা ভট্টাচার্যসহ সব ভাষা শহীদের নামে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে আসামবাসীর শ্রদ্ধা জানানোর ব্যবস্থাও করে দিতে হয়েছে। বিদেশের মাটিতে বাঙালি জাতির এ এক অসামান্য বিজয়। কারণ সমগ্র আসামজুড়ে ‘বাঙাল খেদা’ নামে পরিচিতি বাঙালিবিরোধী আন্দোলন দীর্ঘকাল ধরে চলা সত্ত্বেও আমাদের বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যে সুদীর্ঘ আন্দোলন করে এবং বিজয় অর্জন করে অসামান্য ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে। তাই বাংলাদেশের বাঙালি ও আসামের বাঙালিদেরকে বিপ্লবী অভিবাদন জানানো প্রয়োজন-সংহতি প্রকাশ করা প্রয়োজন। তাদের গৌরবোজ্জ্বল আত্মদান ও বিজয়ের সাফল্য অর্জন করার জন্য।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন আমাদের আসামের আন্দোলনের চেয়ে পুরনো। হতে পারে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন ও তার বিজয় থেকে আসামের বাঙালিরা উৎসাহিত হয়েছিল। স্যালুট আসামের বাংলা ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি, তাদের ওই আন্দোলনের সব নেতা ও কর্মীদের প্রতি।
পুরনো হলেও বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন আজও অসমাপ্ত। আজও এখানে ভাষা সংগ্রামীদের কোনো তালিকা সরকারি উদ্যোগে প্রণয়ন ও প্রচার করা হয়নি-প্রকাশ করা হয়নি তাদের নামের তালিকাও গেজেট আকারে। দেশব্যাপী ভাষা সংগ্রামীরা ভাষা যোদ্ধারা কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, তিন বেলা অন্নসংস্থান করতে পারছেন কি পারছেন না সে হিসেব কেই বা রাখে।
হ্যাঁ, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই প্রথমত প্রয়াত চিত্তরঞ্জন বাবু (বইপ্রেমী এবং প্রখ্যাত প্রকাশক) নিজ উদ্যোগে ছালা পেতে দু’চারখানা বই নিয়ে যে মেলা বসিয়েছিলেন কালের পথ পরিক্রমায় তা আজ বাংলা একাডেমির উদ্যোগ ও পরিচালনায় ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত এক বিশাল বইমেলার আয়োজন হয়ে থাকে। আরও বহু ধরনের কর্মসূচিও আমরা পালন করে থাকি।
কিন্তু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যে মূল সুর ছিল তা এখন বিস্মৃত প্রায়। দাবি ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে অপরাপর ভাষাভাষীর ভাষাসমূহেও যেমন পাঞ্জাবি সিন্ধু, বালুচ ও পুশতু ভাষাকেও একই মর্যাদা দিতে হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর যে অসংখ্য অপ্রকাশিত ভাষা আছেÑ যেমন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভাষা, সেগুলোকেও যথাযথ মর্যাদা দেওয়া। নইলে সব জাতি গোষ্ঠী তাদের সার্বিক উন্নয়নের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
বাংলার মাধ্যমে এককেন্দ্রিক শিক্ষাঙ্গন, কুদরাত-এ-খুদার শিক্ষা কমিশন বিরোধীর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন যখন দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য তখন ইংলিশ স্কুল-কলেজ, মক্তব-মাদ্রাসাগুলো ইংরেজি ও আরবিতে শিক্ষাদান চালু করে ভাষা আন্দোলনের মৌল চেতনা থেকেও আমরা সরে এসেছি। একুশের (২০২১ এর) একুশে ফেব্রুয়ারি এই বৈপরীত্য দূর করে জাতিকে ঠিকপথে চলার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমেই শুধু আমরা বরকত-সালাম-কমলা ভট্টাচার্যদের প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদর্শন করতে পারি।

ষ একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক: হারুন উর রশীদ, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]