ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ২০ এপ্রিল ২০২১ ৬ বৈশাখ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ২০ এপ্রিল ২০২১

জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস  একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত
ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ৯:৫১ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 33

 একটি দেশের উন্নয়ন সূচক, বিভিন্ন সেক্টরের নীতিনির্ধারণ, প্রকল্প গ্রহণ, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাসমূহ তথা, রূপকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সঠিক ও সময়মতো পরিসংখ্যান অপরিহার্য। বিষয়টি বিবেচনায় এনে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৩ জুন ২০১০ সনে ২০ অক্টোবরকে বিশ^ পরিসংখ্যান দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (জবংড়ষঁঃরড়হ অ/৬৪/২৬৭)। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে বাংলাদেশ সরকার, পরিসংখ্যান ও তথ্য বিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান সমিতি ও বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগসমূহ দিনটি পালন ও বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সঠিক ও সময়মতো পরিসংখ্যানের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি সেক্টরে নির্ভুল ও সময়মতো পরিসংখ্যানের ব্যবহার খুব দ্রæতই বিভিন্ন পরিকল্পনাসমূহ যেমনÑ রূপকল্প-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। পরিসংখ্যান বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা ও এর ব্যবহার সবার মধ্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সরকার ‘বিশ^ পরিসংখ্যান দিবস’ পালনের পাশাপাশি ‘জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস’ পালনেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে ৮ জুন ২০২০ তারিখে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রতিবছর ২৭ ফেব্রæয়ারি ‘জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিসংখ্যান চর্চা খুব বেশিদিন আগের নয়। অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন স্যারের একক প্রচেষ্টায় ১৯৪৮ সনে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে প্রথম পরিসংখ্যান বিষয়ে পাঠদান শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০ সনে তারই প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে প্রথম পরিপূর্ণ পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে শুরু হয় এবং তিনিই ছিলেন ওই বিভাগের প্রথম চেয়ারম্যান। ১৯৬১ সনে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে অবসরের আগ পর্যন্ত তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশে পরিসংখ্যান চর্চা চলতে থাকে এবং বেশ কয়েকজন দেশবরেণ্য পরিসংখ্যানবিদের জন্ম হয়। এদিকে পরিসংখ্যানের সঠিক প্রয়োগ ও ব্যবহারের লক্ষ্যে ১৯৬৪ সনে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পরিসংখ্যান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন ওই ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক। অর্থাৎ স্যারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইচ্ছার কারণে এদেশে পরিসংখ্যান চর্চা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করতে থাকে এবং স্যারকেই বাংলাদেশে পরিসংখ্যান বিদ্যার জনক বলা হয়ে থাকে।
এদিকে অধ্যাপক খন্দকার মনোয়ার হোসেন স্যার ১৯৬১ সনে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ১৯৬৮ সালে অধ্যাপক ড. এমজি মোস্তফা স্যারের তত্ত¡াবধানে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগ এবং স্যার ছিলেন ওই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৭০ সনে সম্পূর্ণ আবাসিক ধারণা নিয়ে ঢাকার অদূরে প্রতিষ্ঠিত হয় জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ^বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাকালে চারটি বিভাগে ১৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। পরিসংখ্যান বিভাগ ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। তখন ওই বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন খ্যাতিমান সাহিত্যিক অধ্যাপক এম ওবায়দুল্লাহ। পরবর্তীতে অধ্যাপক ড. মুনীবুর রহমান চৌধুরী, অধ্যাপক ড. কাজী সালেহ আহমেদ এবং অধ্যাপক ড. এম কবির স্যারের নেতৃত্বে বিভাগটি অত্যন্ত সুনামের সহিত পরিসংখ্যান চর্চার
একটি আদর্শ ক্ষেত্র হিসেবে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ ছিল ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশন গঠন। গঠিত কমিশনের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন, পরিকল্পিত উপায়ে দেশ পরিচালনা এবং দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭৩-৭৮ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এদিকে বাংলাদেশে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নয়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারা ও দিকনির্দেশনায় ১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে
থাকা চারটি পরিসংখ্যান অফিসকে (পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিসংখ্যান ব্যুরো, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষি পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষিশুমারি কমিশন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন আদমশুমারি কমিশন) একীভ‚ত করে সৃষ্টি করা হয় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। ২০০৮ সালে ২৩টি জেলায় ২৩টি আঞ্চলিক অফিস করা হয় এবং ৪৮৯টি থানা বা উপজেলায় অফিস নিয়ে এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে সাধারণ ও বিশেষায়িত সরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, সিলেট; ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া; বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ; বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়, রংপুর; জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়, ঢাকা; কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়, কুমিল্লা; মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, টাঙ্গাইল; পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, পাবনা; খুলনা বিশ^বিদ্যালয়, খুলনা; যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, যশোর; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ; হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, দিনাজপুর; নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, নোয়াখালী ইত্যাদিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পরিসংখ্যান বিষয়ে পাঠদান করা হয়। উল্লিখিত অনেক বিশ^বিদ্যালয়ে আবার পরিসংখ্যান বিষয়ের উচ্চতর ডিগ্রি যেমনÑ এমফিল, পিএইচডি ও অন্যান্য গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে পরিসংখ্যান বিষয়ের পড়াশোনা সন্তোষজনক নয়। শতাধিক বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে একমাত্র ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ^বিদ্যালয়ে ফলিত পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে। পরিসংখ্যান বিষয়ের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্তে¡ও বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের মূল বিষয়বস্তুর সঙ্গে একটি অথবা দুটি কোর্স সহায়ক কোর্স হিসেবে পাঠদান করানো হয়। নিকট ভবিষ্যতে এসব বিষয়ের মধ্যে পরিসংখ্যানের অধিক সংখ্যক কোর্স সংযোজন করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে বেশকিছু সরকারি ও বেসরকারি কলেজে পরিসংখ্যান বিষয়ে পাঠদান হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো উচিত। আদর্শ কারিকুলাম ও পাঠদানে সক্ষম অভিজ্ঞ শিক্ষকমÐলীসহ যুগোপযোগী পাঠ্যপুস্তক ও অত্যাধুনিক কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন।
দেশের সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রকল্প গ্রহণে পরিসংখ্যান বিষয়ের জ্ঞান অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংক পরিসংখ্যান শাখা, অন্যান্য আর্থিক ও বীমা কোম্পানিতে পরিসংখ্যানবিদদের নিয়োগ অতি জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংখ্যা ও কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সরকারি ক্যাডারেও পরিসংখ্যানবিদদের সংখ্যা ও মর্যাদা বাড়ানো প্রয়োজন যেন তাদের অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান তার কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারে এবং দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অংশগ্রহণ করতে পারে। পরিসংখ্যানিক জ্ঞান ও ধারণা কাজে লাগানো এবং নতুন নতুন ধারণার
 সঙ্গে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের পরিচয় করিয়ে দিতে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ, আলোচনা সভা ও গবেষণালব্দ তথ্যের
আদান-প্রদান জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পরিসংখ্যান বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ২৭ ফেব্রæয়ারিকে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস ঘোষণা করায়, পরিসংখ্যান বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক, সর্বোপরি পরিসংখ্যান ব্যবহারকারী হিসেবে সত্যিই আজ আমাদের আনন্দের দিন এবং ধন্যবাদ জানাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে। আমাদের বিশ^াস এর মাধ্যমে দেশে পরিসংখ্যান বিষয়ে পাঠদান, সঠিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিসংখ্যান ব্যবহারকারীরা উৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে উপকৃত হবে দেশ।

ষ অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ
     জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক: হারুন উর রশীদ, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]