ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ২৩ এপ্রিল ২০২১ ১০ বৈশাখ ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ২৩ এপ্রিল ২০২১

দোকান খুলল ঝুঁকি বাড়ল
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০২১, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৯.০৪.২০২১ ১:১৪ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 61

দেশে করোনায় এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে বৃহস্পতিবার। মৃত্যুর এই রেকর্ডের দিনই সরকার মার্কেট ও শপিংমল খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কেট খুলে দেওয়ায় করোনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাস চলার কথা বললেও যেমন কোনো পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না, তেমনি মার্কেট খুললে সেখানেও স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই থাকবে না বলে মনে করছেন তারা। এ অবস্থায় আগামী সপ্তাহ থেকে করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে অনেকই বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে বলে তাদের মত। সামনে পহেলা বৈশাখ ও রমজান মাস থাকায় ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে মার্কেট ও শপিংমল খুলে  দেওয়ার দাবি ছিল। এ জন্য তারা ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠিও দিয়েছিলেন। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ৮ ঘণ্টার জন্য মার্কেট খোলা রাখা যাবে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত শপিংমল, দোকানপাট ও বিপণি বিতানগুলো খোলা রাখতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। আগামী ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত এ আদেশ বহাল থাকবে।
করোনা সংক্রমণ রোধে ৫ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সাত দিন শপিংমল, দোকানপাট ও বিপণি বিতান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল সরকার। তবে এ সময় শিল্পকারখানা, সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ীরা আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছিলেন। বৃহস্পতিবারও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মর্কেট খোলার দাবিতে ব্যবসায়ী বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এরই মধ্যে দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার নির্দেশনা এলো।
মার্কেট খোলার ঘোষণা আসার পর ব্যবসায়ীরা খুশি হলেও তারাও অতঙ্কের মধ্যে আছেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বৃহস্পতিবার সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের দাবি ছিল মার্কেট ও বিপণি বিতানগুলো খুলে দেওয়ার। সরকার সে দাবি মেনে নিয়ে ৯টা-৫টা দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। সরকারের নিদের্শনামতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা দোকান খোলা রাখব।
তিনি বলেন, দোকান খুললে আমরাও আতঙ্কের মধ্যে থাকব, কারণ আমরাও তো মানুষ। করোনায় যে হারে মানুষ মরছে তাতে আমাদের ভেতরেও তো ভয় ঢুকে গেছে। আজ (গতকাল) ৭৪ জন মানুষ মারা গেছে করোনায়। এটা শুনে তো আমরা আরও ভীত হয়ে পড়েছি। আমরাও মৃত্যুভয় নিয়েই দোকান খুলব। দোকান খুললে যে আমরা বাঁচতে পারব তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তবু তো আমাদের ব্যবসা চালাতে হবে, আমাদের বাঁচতে হবে। আর এই বাঁচার তাগিদেই আমরা মার্কেট খোলার দাবি জানিয়েছিলাম।
দোকান মালিক সমিতির সভাপতি বলেন, সামনে পহেলা বৈশাখ, রোজা এবং ঈদ। ব্যবসায়ীরা সারা বছর এই সময়টার অপেক্ষায় থাকেন। স্বাভাবিক সময়ের রোজা-ঈদে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয় সারা দেশে। গত বছর পহেলা বৈশাখ, রোজা এবং ঈদ মিলে মাত্র ৩ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয়েছিল। এ বছর ফেব্রুয়ারি পর্যন্তও করোনা পরিস্থিতি অনেক স্বাভাবিক ছিল। আমরা অনেকেই ভেবে নিয়েছিলাম করোনা হয়তো শেষ হয়ে গেল, এবার আর গতবারের মতো পরিস্থিতি হবে না। এ কারণে ব্যবসায়ীরা এবার ভালোমতো প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তারা প্রচুর মালামাল উঠিয়েছিলেন যার যার দোকানে। কিন্তু আমাদের সব আশায় গুড়েবালি। করোনা পরিস্থিতি এখন এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদরাও মনে করছেন করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার মুহূর্তে মার্কেট খোলার ঘোষণা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এমনটিই মনে করছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, যেদিন দেশে ৭৪ জন মানুষ করোনায় মারা যায় সেদিন কীভাবে মার্কেট খোলার অনুমতি দেওয়া হয়Ñ বিষয়টি আমার বুঝে আসে না। মার্কেট খুলে দেওয়ায় আগামী সপ্তাহ থেকে করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। মানুষ আরও বেশি আক্রান্ত হবে। অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগটুকুও পাবে না, চিকিৎসার অভাবে মারা যাবে। কেন আমরা দেশকে এ অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি! কেননা আমরা মার্কেট খুলে দিয়ে দেশের মানুষকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিলাম।
সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের দাবি একদিক থেকে যৌক্তিক ছিল। কারণ সামনে তাদের পণ্য বিক্রির সবচেয়ে বড় মৌসুম। সরকার হয়তো জীবন-জীবিকার তাগিদে ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে নিয়ে দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে মানুষের জীবনই যদি না বাঁচে তা হলে কার জন্য ব্যবসা! কারণ দোকান খোলা রাখলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই তো করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আমরা সবকিছু দেখেশুনে কেন দেশের মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেব! তিনি আরও বলেন, গত এক বছর সরকার করোনা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি। হাসপাতালগুলোতে করোনা চিকিৎসা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সরকার একটি দেশ থেকে করোনার ভ্যাকসিন আনছে যা দেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত নয়। ভারতের পাশাপাশি অন্য দেশ থেকেও করোনার ভ্যাকসিন আনতে হতো। এ ছাড়া দেশের একটি প্রতিষ্ঠান করোনার ভ্যাকসিন তৈরিতে ভালো সফলতা দেখিয়েছিল। সরকারের উচিত ছিল সে প্রতিষ্ঠানকে টিকা উৎপাদনে সহযোগিতা করা। তা হলে দেশেই এতদিন করোনার টিকা উৎপাদন করা সম্ভব হতো। এটি করা গেলে হাজার হাজার কোটি টাকা বেঁচে যেত।
দোকান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির (এফবিসিসিআই) সাবেক সহসভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তকে যেন অবহেলা করা না হয়। করোনায় দ্বিতীয় ঢেউয়ে বাংলাদেশসহ সারা বিশ^ কঠিন সময় পার করছে। এ সময় বন্ধ রাখলেও ক্ষতি। গতবার ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারেননি। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কোনো প্রণোদনা পায় না। তাই সরকারের দেওয়া শর্ত মেনেই যেন দোকান খোলা হয়। কারণ জীবন থাকলে তবেই তো জীবিকা। তাই জীবনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ সময়ের আলোকে বলেন, করোনা মাহামারির রূপ নিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে জীবন-জীবিকার দিকেও তাকাতে হবে। সরকার হয়তো জীবন-জীবিকার কথা ভেবেই সীমিত আকারে দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছেন। আমার পরামর্শ হচ্ছেÑ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেন মার্কেট খোলা হয়। মার্কেটগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না সেটি নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। এর পাশাপাশি সরকার এলাকাভিত্তিক কিমিটি করে দিতে পারে। কমিটিতে মসজিদের ইমাম, এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে রাখা যেতে পারে। কমিটির সদস্যরাও বিষয়গুলো মনিটরিং করবেন। মোট কথা, কোনোভাবেই করোনা পরিস্থিতিকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না, নিলে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।









সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক: হারুন উর রশীদ, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]