ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ২৩ এপ্রিল ২০২১ ১০ বৈশাখ ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ২৩ এপ্রিল ২০২১

করোনায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ৭৮ ভাগই আর্থিক সঙ্কটে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০২১, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৯.০৪.২০২১ ১:৩৩ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 34

গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রান্তিক গোষ্ঠীর আয় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ ও ব্যয় ৮ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই পরিবারগুলোর প্রায় ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশ করোনা মহামারির ফলে আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল, যার ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশই পুনরুদ্ধার হয়নি।
সমীক্ষা করা পরিবারের প্রায় ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারকে বিকল্প পন্থা হিসেবে ঋণ নিতে হয়েছিল এবং সেটি পরিশোধ করতে তাদের গড়পড়তা প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্মের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার এই জরিপের ফল উপস্থাপন করা হয়। এতে তুলে ধরা হয়, কীভাবে অতিমারিকে মোকাবিলা করছে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জুড়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ খানায় একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম। যেখানে দশটি প্রান্তিক গোষ্ঠীর মুখোমুখি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সমীক্ষায় পরামর্শ হিসেবে বলা হয়, অতিমারির অভিঘাত কাটাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।
নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রান্তিক মানুষের ওপর অতিমারির ফলে যে প্রভাব পড়েছে তা সংঘটিত জাতীয় প্রভাবের চেয়ে বেশি। প্রথাগতভাবে যারা আগে বিপন্ন ছিলেন না তারাও এখন যুক্ত হয়েছেন। করোনার অভিঘাত বহুমাত্রিকভাবে এসেছে যার প্রভাব কর্মসংস্থান, আয়, সঞ্চয় ছাড়াও পুষ্টিহীনতা, সহিংসতা এবং শিক্ষা খাতে ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি ও উন্নয়ন সংস্থাদের একত্রিত করে একটি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক প্রভাব স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সম্পর্কিত প্রভাবগুলোর তুলনায় অনেক গভীরভাবে পড়েছে। বিপুলসংখ্যক পরিবার ঋণের জালে পড়েছে এবং তাদের সঞ্চয় হারাচ্ছে। আসন্ন জাতীয় বাজেটে, সুস্পষ্ট আর্থিক বরাদ্দ (সামাজিক সুরক্ষা নেট কর্মসূচির অধীনে এবং এর বাইরে) করতে হবে এবং একটি নতুন ‘সামাজিক সংহতি তহবিল’ তৈরি করে করপোরেট এবং বেসরকারি অনুদানের জন্য আর্থিক উৎসাহ (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এবং বাস্তব সময়ের সঙ্গে) ডিজিটাল রিপোর্টিং বিবেচনা করা যেতে পারে।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ গবেষক ইশতিয়াক বারি মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, জরিপের জন্য অন্তর্ভুক্ত দশটি প্রান্তিক গ্রুপের মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, প্রতিবন্ধী, বস্তিবাসী ও চরের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের বাড়তি ব্যয় ও ঋণ পরিশোধে সহায়তা দরকার। সরকারিভাবে নগদ আর্থিক সহায়তা দিয়ে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বর্তমান কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করতে সাহায্য করা উচিত।
এক প্রশ্নের জবাবে জরিপের প্রধান গবেষক ইশতিয়াক বলেন, জরিপকালে এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠী জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের সময়কার কষ্টের মধ্যে টিকে থাকতে প্রথমে খাদ্য বাছাইয়ে সামঞ্জস্য আনার অর্থাৎ সুষম খাবার বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এরপর খাদ্যবহির্ভূত পণ্য কেনা বাদ দিয়েছেন। এরপরও ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার বলেছে তারা ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, মহামারির মধ্যে তারা চলমান আয় দিয়ে চলতে পারছেন কি না এমন প্রশ্নের উত্তরেÑ উপকূলীয় এলাকার ৮৬ শতাংশ, বস্তিবাসীর ৮৭ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি (এমএসএমই) উদ্যোক্তাদের প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষ তাদের চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।
গবেষণার উপাত্ত তুলে ধরে তিনি আরও জানান, অতিমারির সময়কালে পরিবারগুলোর মধ্যে ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ খাদ্যের জন্য ব্যয় কমিয়েছে। খাদ্যবহির্র্ভূত ব্যয় কমিয়েছে ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার সরকারি ও বেসরকারি উৎস থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছে। এর মধ্যে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার সরকারি আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় ভেঙেছে বলে উল্লেখ করে।
অন্যদিকে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার আর্থিক অনটনে পড়ে গবাদিপশু বিক্রি করেছে। ২ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার জমি বা স্বর্ণ বন্ধক দিয়ে অর্থের সংস্থান করেছে।
জরিপের ফল তুলে ধরে শিক্ষক ইশতিয়াক বলেন, এ সময়ে চরাঞ্চলের ২১ দশমিক ১ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। অন্যান্য এলাকায়ও ১৪ থেকে ১৮ শতাংশের আয় কমেছে। একই সময়ে এদের মধ্যে ৭ থেকে ১০ শতাংশ ব্যয় কমিয়েছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ মানুষের সঞ্চয় কমে গেছে জানান তিনি।
জরিপে ৭০ শতাংশ পরিবারের সদস্য জানিয়েছেন, তারা কোভিড-১৯ টেস্টের প্রয়োজন অনুভব করেননি। ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছে আর্থিক অক্ষমতার কারণে তারা টেস্ট করাতে পারেননি।
আবার ২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষকে চিকিৎসক পরামর্শ দিলেও তারা পরীক্ষা করাননি। এর মধ্যে কোথায় যেতে হবে তা না জানা এবং সামাজিক নিপীড়নের ভয়ের কথাও উল্লেখ করেন তারা। তবে এসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সরকার ফ্রি ভ্যাকসিন দিলে তা নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে ৮২ শতাংশ মানুষ।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, মহামারিকালে ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ সরকারি সহায়তা নিয়েছে। ১১ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছে।
বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ। আবার বিভিন্ন দান বা অনুদান নিয়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। মহামারির প্রথমদিকে প্রতি ৭০ জনে একজন চাকরি হারিয়েছেন। পরে আবার প্রতি ৯১ জনের মধ্যে একজন চাকরি পেয়েছেন বলে জরিপের আরেক উপাত্তে দেখা গেছে।
অনুষ্ঠানে সিপিডির আরেক সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সংহতি তহবিল গঠনকে যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে এটি সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরিচালনার কাঠামো গঠনের কথা বলেন। তিনি আগামী বাজেটে এ জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার পরামর্শ দেন।
নাগরিক প্লাটফর্মের কার্যক্রমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছিলÑ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপি, বাংলাদেশ; অ্যাকশন-এইড বাংলাদেশ; কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভস; সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি); ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশ; ইকো কো-অপারেশন; প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও ওয়াটার এইড বাংলাদেশ।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ও নাগরিক প্লাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বক্তব্য প্রদান করেন।








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক: হারুন উর রশীদ, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]