ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ২৩ এপ্রিল ২০২১ ১০ বৈশাখ ১৪২৮
ই-পেপার শুক্রবার ২৩ এপ্রিল ২০২১

কবিতার সন্ধানে
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০২১, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 55

ফরিদ আহমদ দুলাল
খুশি করা যায় না কখনও, যদি মানুষ নিজে খুশি না হয়। একজন বন্ধুর একটি কবিতা পড়েছি মনোযোগ দিয়ে। বেশকিছু উজ্জ্বল পঙ্ক্তি আমাকে বলল খুশি হতে, আর খুশিগুলো ছড়িয়ে দিতে সবার মধ্যে। যার কবিতায় এতগুলো উজ্জ্বল পঙ্ক্তির উপস্থিতি, তার কবিতার ঋদ্ধির কথা উচ্চারণ না করলে অপরাধ হবে বিবেচনায়, তাকে এবং তার মাধ্যমে অন্যদেরও কিছু বলতে মনস্থির করলাম; কিন্তু কথা হচ্ছে, কবিতার বেশকিছু পঙ্ক্তি উজ্জ্বল আর অন্য পঙ্ক্তিরা? যাদের চোখে বিষাদ; ওরা বলল, ‘আমরা কি শুশ্রƒষা পেতে পারি না ডাক্তার সাহেব? আপনি তো নাড়ি টিপেই বুঝে যান, রোগী কতক্ষণ? প্রয়োজনে আপনিই প্রয়োগ করেন সঠিক ওষুধ, পরামর্শ দেন সমন্বিত সুষম পথ্যের। রুগ্ণতা থেকে মুক্তি পেতে আমরা কি পেতে পারি না আপনার নির্দেশনা? পেতে পারি না সেবিকার সেবা? আমাদের জন্য কোথাও কি সেবা নিকেতন নেই? আমাদের জন্য এবং আমাদের স্বজনদের জন্য, যারা একই কবিতার উজ্জ্বল পঙ্ক্তি, তাদের জন্য কিছু অনুগ্রহ করা যায় না কি? আমাদের নিস্প্রভ মুখ যখন স্বজনের মুখে নিরালোক ছায়া ফেলে, তখন আমাদেরও কষ্ট হয়। ভালোবাসায় আমরা সবাই সুশোভিত কবিতা আশ্রম চাই। আমাদের বিশ^াস আপনার সামান্য সদিচ্ছাই সে আশ্রমের রূপকার হতে পারে।’
না, আমি কবিতার কোনো ডাক্তার তো নই, বিশেষজ্ঞও না। কবিতা বিষয়ে কথা বলার মতো পাণ্ডিত্য আমার নেই, কিন্তু একজন নিষ্ঠ পাঠক হিসেবে কবিতার ভালো লাগা-মন্দ লাগা নিয়ে নিজের বিশ^াসের কথা উচ্চারণের সততা তো দেখাতেই পারি। কবিতা বিষয়ে কথা বলার আগে কবিতা বিষয়ক ভিন্ন অনুষঙ্গ নিয়ে সামান্য কথা বলতে চাই। কবিতা এমন এক কলা, যা উদযাপন করে পূর্ণ স্বাধীনতা; ব্যক্তিগত বিবেচনায় শিল্পের স্বাধীনতা উদযাপনের শর্তে চিত্রকলার পরই কাব্যকলার অবস্থান। আর ‘স্বাধীনতা’ এমন এক অভিধা, যার আবশ্যিকতা প্রগতির জন্য, দেশপ্রেমের জন্য, কূপমণ্ডূকতা-ধর্মান্ধতা-অনৈতিকতা-সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, যার আবশ্যিকতা মানবমুক্তির দিশা খুঁজে পাওয়ার জন্য। আর এতসব ইতিবাচক আবশ্যিকতার কথা মাথায় রেখে সহজেই বলে দেওয়া যায়, সুস্থ ধারার কাব্যচর্চাকে বেগবান করে সমাজে শুভপ্রবণতার শক্তি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সুস্থ ধারার কাব্যচর্চা যদি বিকশিত হয়, তাহলে সাম্প্রতিক বিভ্রান্ত কাব্যচর্চার অশুভ প্রবণতা থেকে সুস্থ ধারার শুদ্ধ কবিতা মুক্তি পাবে। সমাজে যদি বিপুল ধারায় কাব্যচর্চা হয়, সেটা কিছু দোষের নয়, হতে পারে বিপুল ধারায় কাব্যচর্চার অন্যতম অঙ্গন যদি হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক; যা অবাধ। প্রকাশের অবাধ সুযোগ এবং যেকোনো প্রকাশিত লেখাই বিপুলভাবে প্রশংসিত হওয়ার প্রবণতা যদি উপস্থাপনকারীর মনে এই প্রতীতি জন্মায় যে তিনি একজন বিশিষ্ট কবি; এবং এভাবেই যদি অজস্রের মনে একই প্রতীতি জন্মে তাহলে কাব্যাঙ্গনে কী দুর্দশা উপস্থিত হবে সে কথা না বললেও কারও বুঝতে বাকি থাকে না। আজকের এই মিডিয়াশাসিত প্রপাগাণ্ডার দুর্দিনে কবিতা নিয়ে সততার সঙ্গে কথা বলা সহজ বিষয় নয় তাও সত্য; কিন্তু তারপরও শুদ্ধতার প্রশ্নে সত্য উচ্চারণের স্পর্ধা তো কাউকে দেখাতেই হবে। যে কবিতার কথা আজ বলতে চাই, সে কবিতা একা নয়, এমনি সহস্র কবিতা আমাদের সামনে সদম্ভে উপস্থিত। কবিতাকে এই ‘দুর্দশাকাল’ থেকে মুক্তি দিতে কাব্যাঙ্গনের শুদ্ধ-নিষ্ঠ কবিদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে সে কথা আশা করি না বললেও সবাই বুঝতে পারছেন।
এই যে একই কবিতার কোনো কোনো পঙ্ক্তি উজ্জ্বল, কোনো কোনোটি নিষ্প্রভ, সে ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়? এ বিষয়টি নিয়ে সামান্য কিছু বলাই প্রয়োজন। কবিতা খুবই বনেদী শিল্প, খুব বেশি সংবেদনশীল শিল্পও বটে। মানবদেহে অঙ্গসমূহের মধ্যে ‘চোখ’ যেমন সংবেদনশীল, আমাদের খাদ্যতালিকায় ‘দুগ্ধ’ যেমন সংবেদনশীল; কবিতাও তেমনি। চোখে সামান্য ধূলিকণা পড়লে মানুষ যেমন অস্থির হয়ে ওঠে; দুগ্ধভান্ডে সামান্য ‘চোনা’ পড়লে দুধ যেমন অকার্যকর হয়ে যায়; কবিতায়ও তেমনি কবিতার একটি পঙ্ক্তি, একটি চরণ, মায় একটি শব্দও যদি নিষ্প্রভÑ অসংলগ্ন হয়ে যায়, তাহলে গোটা কবিতাটিই ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। কবিতাবালিকা তার স্রষ্টার কাছে এতটাই মনোযোগ, এতটাই যত্ন দাবি করে। কবিতায় ঘোর অবশ্যই থাকবে, কিন্তু কবিতা কিছুতেই গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেওয়া নয়। কবিকে যখন আপনি ঋষির পর্যায়ে দেখতে চান, কবি আর নবীকে যখন সমান্তরালে রেখে আলোচনা করতে চান; তখন কবির কাছে আমাদের প্রত্যাশা একটু বেশি হলে তা কি অতিরিক্ত চাওয়া বলে উড়িয়ে দিতে পারেন?
পঠিত কবিতার পঙ্ক্তিগুলোর মনোজাগতিক-হৃদয়বৃত্তিক কথায় আমারও ইচ্ছে হলো অনুনয় করে বলি, ‘কবিতাবালিকা শুধু প্রেম চায়। ওর প্রত্যাশায় সামান্য কালিমা নেই; কবিতাবালিকা যত্ন চায় দক্ষ সেবিকার, আপনার মতো একজন মনোযোগী চিকিৎসকের স্পর্শে জেগে উঠতে চায়; বসুন্ধরা ক্লিনিক চায়, যেখান থেকে বেরিয়ে আসবে নিরোগ কবিতা, যারা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবে অত্যুজ্জ্বল পঙ্ক্তি, সুললিত কাব্যবার্তা। স্তাবকতা দিয়ে যারা কবিতার অসুখ বাড়ায়, আপনি তাদের থেকে নিরাপদ থাকুন। আমার চেয়ে আপনি ভালো জানেন, ঋষিকে ধ্যানী হতে হয়, ঋষি ধ্যানমগ্ন হলে স্তাবকতার পঙ্ক্তিগুলো যজ্ঞানলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, ‘ভাষায় মানুষের আচরণ তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীলÑ ইচ্ছা, আবেগ আর জ্ঞান।’ তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার স্পর্ধা আমার নেই; কিন্তু কবিতার প্রশ্নে ভাষার তিন নির্ভরশীলতার সঙ্গে যোগ করা চাই কবির কবিতায় শৈলী চিন্তার সচেতন সমন্বয়, সর্বাধুনিক প্রকরণ সমন্বয়ের মনীষা। যখন আপনার কবিতার সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করে, তখন কি আপনার কাছে কবিতার অনিন্দ্যরূপ প্রত্যাশা করতে পারি না?
দয়া করে ভাববেন না কেউ পাণ্ডিত্য জাহির করছি; আমি শুধু শুদ্ধ কবিতার পক্ষে নিজের দায় মেটানো চেষ্টা করছি। আপনার কবিতাটা পড়ে বোধ হলো, এ তারকার নাম কি অনাবিষ্কৃত নক্ষত্র? যে নক্ষত্রের আলো বসুন্ধরায় ছড়িয়ে গেলে আমরা তো নতুন এক কবিতা আশ্রমের সন্ধান পেতেই পারি। তাহলে কেন আমি কিছুটা কালক্ষেপণ করব না? কেন সামান্য প্রলাপ উচ্চারণ করব না? পাগলের কথা ভালো না লাগলে প্রলাপ ভেবে ফেলে দেবেন, আর প্রলাপ থেকেও যদি কোনো দিশা পেয়ে যান, তাহলে না হয় মিথ্যাচারী স্তাবকদের সৌজন্য সান্ত্বনা দিয়ে নিজেকে আবিষ্কারে ধ্যানমগ্ন হবেন। কবিতাবালিকার সঙ্গে মধুরালিঙ্গন হয়েই যাবে।
স্তাবকতার মতো অশ্লীলতার সঙ্গে সন্ধি করে বেঁচে থাকা এতটাই আবশ্যক কেন একজন শুদ্ধ কবির জন্য? কবিতা মহাসিন্ধু; জলের উচ্ছ্বল কল্লোল। কবিতা স্বয়ম্ভূ পৃথিবীর যেকোনো হিমালয় থেকে আপন ইচ্ছায় জন্ম নেয়, নিজের ইচ্ছায় পথ চলে, চলার পথে কারও সঙ্গে মন দেওয়া-নেওয়া হলে গাঁটছড়া বাঁধে আবার পথ চলে; অতঃপর নিজেরই সঙ্গে পুনর্মিলন হয় মহাসিন্ধুতে। যে মহামিলনের জন্য কবির বুকে নিত্য আর্তিÑ
মিলন হবে কত দিনে
আমার মনের মানুষের সনে ॥
চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছে কালো শশী
হব বলে চরণ দাসী (২)
ও তা হয় না কপাল গুণে ॥
মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন
লুকালে না পাই অন্বেষণ।
কালারে হারায়ে যেমন (২)
ওই রূপ হেরি দর্পণে ॥
(ফকির লালন শাহ)
কবি আত্মনির্ভর-স্বশাসিত; কবি কখনও তাই নত হতে জানে না।
কবিতাশ্রম যদি চাই সুস্থ-শুদ্ধ কবিতার সমাবেশ খুঁজি, না হয় নিজের গভীরে নাও ভাসিয়ে একাকী নিজের সঙ্গে হারিয়ে যাই। আর হারিয়ে যাওয়ার তালিকা যদি দীর্ঘ হয়, হয়তো আপাত একাকিত্বের বিষাদ মনে হবে, কিন্তু যখন একাকী হারিয়ে যাওয়াদের পৃথক সমাবেশ হবে; অতঃপর আমরা পেয়ে যাব শুদ্ধ-স্বতন্ত্র কবিতাশ্রম। ভয় কী, হরিয়ে যাওয়ারা সবাই পথের শেষে কোথাও তো মিলবেই মহাসিন্ধুতে।
ষ কবি ও প্রাবন্ধিক







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক: হারুন উর রশীদ, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]