ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ১৬ মে ২০২১ ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ১৬ মে ২০২১

বাঁশখালীতে পুলিশের গুলিতে ৫ শ্রমিক নিহত
দুই মামলায় আড়াই হাজার আসামি : গ্রেফতার আতঙ্ক
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২১, ১০:১৫ পিএম আপডেট: ১৮.০৪.২০২১ ১১:৩৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 108

বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রে শনিবারের ঘটনায় থানায় দুটি মামলা করা হয়েছে। এর একটি করেছে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। এতে কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ এনে ২২ শ্রমিকের নাম উল্লেখ করে আরও ১ হাজার ৪০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের করা মামলায় পুলিশের কাজে বাধা দেওয়াসহ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে দুই থেকে আড়াই হাজারজনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে।
শনিবারের ঘটনায় ৫ শ্রমিক নিহত হওয়ার পর উত্তেজিত শ্রমিকরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে একটি শেড, ছয়টি মিক্সার ট্রাক, একটি লরি, একটি মাইক্রোবাস ও দুটি মোটরসাইকেল আগুনে পুড়িয়ে দেয়। রোববার বাঁশখালী থানায় মামলা দুটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন। তিনি জানান, বেতন-ভাতা নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে শ্রমিকরা বিক্ষোভ প্রকাশ করে। পুলিশ বাধা দিতে গেলে তারা পুলিশের ওপর হামলা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। শনিবার পুলিশের গুলিতে পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় তাদের পক্ষ থেকে কোনো মামলা হয়নি। যে পাঁচজন মারা গেছে তাদের মধ্যে মাহমুদ হাসান রাহাতের বাড়ি কিশোরগঞ্জে, রনি হোসেন চুয়াডাঙ্গার, রায়হান নোয়াখালীর, শুভ চাঁদপুরের এবং রেজা বাঁশখালীর।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ৩ লাখ এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসন এবং জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মাণ করছে এস আলম গ্রুপ। এখানে এস আলমে ৭০ ভাগ এবং চীনা প্রতিষ্ঠান সেফক্রোথি পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের ৩০ ভাগ বিনিয়োগ রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা আন্দোলনে নামলে ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন গ্রামবাসী নিহত হয়েছিল। তখন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন লিয়াকত আলী। তিনি জেলা বিএনপির নেতা হওয়ায় আন্দোলনের পেছনে বিএনপির উসকানি ছিল বলে বলা হয়েছিল।
এবারও উসকানি ছিল : এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের পক্ষে তার ব্যক্তিগত সহকারী আকিজ উদ্দীন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, বাঁশখালীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করে দিচ্ছে চীনা প্রতিষ্ঠান। তারা কর্মরত এদেশি শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত প্রদান করে আসছে। কিন্তু গত শুক্রবার কিছু শ্রমিক বেতন বাড়ানোসহ অন্যান্য কিছু দাবিতে চীনা কর্তৃপক্ষের ওপর বারবার চাপ দিতে থাকে। অতীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপক্ষে থাকা কিছু লোকের ইন্ধনে শনিবারের ঘটনাটি ঘটেছে। সেবার পুলিশের মামলায় গ্রামবাসীদের পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। শনিবারের ঘটনায় পাঁচ শ্রমিক নিহত হলেও পুলিশ এবং কর্তৃপক্ষের করা মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে শ্রমিকরা এখন গা-ঢাকা দিয়ে আছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে দেশি এবং চীনা প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করছে। দেশি শ্রমিকদের সিংহভাগই বিভিন্ন জেলার। এরা মূলত নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। আগামী বছর কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
শ্রমিকদের বক্তব্য : এখানে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করলেও তাদের চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। সবাই অস্থায়ী শ্রমিক। কাজের কর্মঘণ্টাও নির্ধারিত নেই। চীনা কর্মকর্তারা বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে কুকুর-বিড়ালের মতো আচরণ করে। নামাজ পড়তে গেলে বেতন কাটা হয়। পবিত্র রমজান মাসে ইফতার করার জন্যও ৫-১০ মিনিটের বিরতি নিতে দেওয়া হয় না। তাদের ইচ্ছামতো শ্রমিকদের খাটায় অমানবিকভাবে। কেউ প্রতিবাদ করলে পরদিন আর তার চাকরি থাকে না। যেকোনো সময় যে কাউকে এসে বলে, ‘কাল থেকে তোমার আর আসার দরকার নেই।’ মাসের মাঝামাঝি চাকরি থেকে বের করে দিলেও প্রাপ্য মজুরি আর পরিশোধ করা হয় না। ২০১৬ সালে স্থানীয়দের সঙ্গে গণ্ডগোলের পর এখানে পুলিশ ফাঁড়ি বসানো হয়। তাদের কাজ হচ্ছে শ্রমিকদের নিপীড়ন করা। তারা মালিকের পোষা লোক হিসেবে তাদের কথায় ওঠে-বসে। শ্রমিকদের সিংহভাগ বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত। তাই স্থানীয় কোনো ইস্যু নিয়ে তারা মাথা ঘামায়নি। শ্রমিকরা শুধু তাদের কিছু ন্যায্য অধিকারের কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু কথা তো শুনলই না; উল্টো বিনাউসকানিতে নিরীহ শ্রমিকদের ওপর গুলি করা হলো। পাঁচ শ্রমিক মারা গেল। আরও কয়েকজন মৃত্যুশয্যায় কাতরাচ্ছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। গ্রেফতারের ভয়ে এখন শ্রমিকদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং রমজানে কর্মঘণ্টা পুনর্নির্ধারণের দাবিতে আন্দেলনরত শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যা এবং অনেককে পঙ্গু বানানোর প্রতিবাদ জানিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ও গণসংহতি আন্দোলন। সিপিবি এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে মানববন্ধন করেছে। জাসদ ও বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]