ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ১৬ মে ২০২১ ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ১৬ মে ২০২১

বৈদেশিক শ্রমবাজার
ফিরে আসা প্রায় ৫ লাখ কর্মী দিশেহারা
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২১, ১০:১৯ পিএম আপডেট: ১৯.০৪.২০২১ ১২:০৮ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 253

করোনার ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি শ্রমবাজারের দেশগুলো। এরই মধ্যে আবারও করোনা সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। নতুন বছরে চালু হওয়া বৈদেশিক শ্রমবাজার খুলতে না খুলতেই ফের অশনিসঙ্কেত দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে বিদেশ যেতে ফ্লাইট বন্ধ ও চালু হওয়া নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েছেন প্রায় ৫ লাখ প্রবাসী। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
চাঁদপুরের রনি আহমেদ। থাকতেন দুবাইয়ে। গত বছর করোনার কারণে দেশে এসেছেন। আর যেতে পারেননি। গতকাল ১৭ এপ্রিল তার আবারও যাওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী টিকেটও কেটেছিলেন। সেখানে গিয়ে হোটেল থাকার জন্য কোয়ারেন্টাইন বাবদ থাকা ও খাওয়ার ভাড়া ৮০ হাজার টাকাও পরিশোধ করেছিলেন।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আমার ভিসার মেয়াদও শেষ হওয়ার পথে। অনেক কষ্টে ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করেছি। এবার যাওয়া না হলে পথে বসতে হবে। শনিবার বিকালে তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সন্ধ্যা সাতটায় তার ফ্লাইট কিন্তু দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ছিল না। যদি আবার ফ্লাইট বন্ধ বা বাতিল হওয়ার ঘোষণা আসে। শুধু রনিই নন, তার মতো প্রায় লাখ কর্মী এখন দুবাই, কাতার, সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় আছেন। লকডাউনে ফ্লাইট বন্ধের কথা শুনে এই মানুষগুলো কান্নায় ভেঙে পড়েন। সংসার চলবে কীভাবে এবং কী করে ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন সেই দুঃশ্চিন্তার কথাও জানান তারা।
রনি জানান, শুধু কাতার থেকেই প্রায় লাখ খানেক মানুষ গত বছর দেশে ফিরেছেন। এসব মানুষের অনেকের কাজের মেয়াদ ও ভিসা শেষ হয়েছে। সৌদি প্রবাসী ময়মনসিংহের সুমন বলেন, একটা বছর বাড়িতে বসে আছি। কবে যেতে পারব জানি না।
শরীয়তপুরের রবিউল বলেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। জানি না, মালিক আবার কাজের অনুমতিপত্র দেবেন কি না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশে অনেকে এখনও বেকার হয়ে পড়ে আছেন। আবার অনেকে দেশে ফিরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি কেউ কেউ জমি বিক্রি করে ও ঋণ নিয়েও বিদেশ যাওয়ার জন্য টিকেট ও ভিসা করেছেন। কিন্তু ফ্লাইটের বন্ধ ও খোলা নিয়ে আতঙ্কে দিন পার করছেন তারা।
শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রবাসী ডেস্কের তথ্যমতে, গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৪ জন দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে সৌদি থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার ১৭২, মালদ্বীপ থেকে ১৫ হাজার ৯৭৭, সিঙ্গাপুর থেকে ৮ হাজার ৪২৪, ওমান থেকে ২৪ হাজার ৪৫৭, কুয়েত থেকে ১৫ হাজার ২২৭, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৬৬, বাহরাইন থেকে ৪ হাজার ৪৮৪, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ২৮৫, কাতার থেকে ৪৯ হাজার ২৫২, মালয়েশিয়া থেকে ১৭ হাজার ১০৬, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২২০, থাইল্যান্ড থেকে ১১৩, মিয়ানমার থেকে ৩৯, জর্ডান থেকে ২ হাজার ৭১২, ভিয়েতনাম থেকে ১২১, কম্বোডিয়া থেকে ১০৬, ইতালি থেকে ১৫১, ইরাক থেকে ১০ হাজার ১৬৯, শ্রীলঙ্কা থেকে ৬২৩, মরিসাস থেকে ৭০২, রাশিয়া থেকে ১০০, তুরস্ক থেকে ১৫ হাজার ৯৭০, লেবানন থেকে ৮ হাজার ৭৬২, নেপাল থেকে ৫৫, হংকং থেকে ২৯, জাপান থেকে ৮, লন্ডন থেকে ১৩৪, লিবিয়া থেকে ৮৯৮ ও অন্যান্য দেশ থেকে ১৪৬ জন দেশে ফিরেছেন।
প্রবাসী ডেস্ক আরও জানিয়েছে, সৌদি ও ওমান থেকে আউটপাস নিয়ে ও কাজ হারিয়ে দেশে ফিরেছেন ১ লাখ ১৯ হাজার ১৭২ জন। এ ছাড়াও এই দুই দেশে কারাবরণ শেষে দেশে ফিরেছেন এমন কিছু সংখ্যক মানুষও রয়েছেন এ তালিকায়। অন্যান্য দেশ থেকে যারা ফিরেছেন তাদের অধিকাংশই কাজের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া, আকামা বা ভিসার মেয়াদ না থাকা, অবৈধ হওয়া, কোম্পানি থেকে বাধ্যতামূলকভাবে দেশে ফেরত পাঠানো, চাকরি হারানো, প্রতারিত হয়ে ফেরত, কাজ না থাকায়, কাজের মেয়াদ শেষ হওয়া ও করোনা সন্দেহে।
বৈদেশিক শ্রমবাজারের বড় বাজার হচ্ছে, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্য। কিন্তু চলতি বছর এই দুই দেশে বিগত বছরগুলোর মতো কর্মী যেতে পারেনি। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে করোনার কারণে অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। দেশটিতে এখনও কর্মী নেওয়া শুরুই হয়নি। যদিও সেখানে ভিজিট ভিসায় যাচ্ছেন অনেকে। কিন্তু তারা এই মুহূর্তে গিয়ে কতটুকু কর্মের খোঁজ পাবেন আর ওয়ার্ক পারমিট পাবেন কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে। আবার আরব আমিরাত থেকে এখনও অনেকে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে দেশে ফিরছেন। তবে ওমানেও কিছু লোক যাচ্ছে। তাও খুব বেশি নয়।
বিএমইটির তথ্য বলছে, চলতি বছর বিভিন্ন দেশে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে গেছে ৮৫ হাজার ২৪২ জন কর্মী। চলতি বছর জানুযারি মাসে ৩৫ হাজার ৭৩২ এবং ফেব্রুয়ারিতে ৪৯ হাজার ৫১০ জন বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে ৬৫ হাজার ৪৬, আরব আমিরাতে ৫১১, কুয়েতে ১, ওমানে ৭ হাজার ৩২৮, কাতারে ৫১২, বাহরাইনে ২, জর্ডানে ১ হাজার ৮৮৩, লিবিয়ায় ২, মালয়েশিয়ায় ৪, সিঙ্গাপুরে ৬ হাজার ৭৭৬, যুক্তরাজ্যে ৪, ইতালিতে ৭, ব্রনাইয়ে ২, মরিশাস ১১, জাপানে ১, ইরাকে ১ ও অন্যান্য মিলে ৩ হাজার ১৪৯ জন।
শ্রমবাজারের দেশ হিসেবে তালিকায় থাকা লেবানন, সুদান, উত্তর কোরিয়া, মিসরে কোনো কর্মীই যায়নি। গত বছর প্রথম তিন মাসের মধ্যে জানুয়ারিতে ৬৯ হাজার ৯৮৮, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯ হাজার ১৩৯ এবং মার্চে ৫২ হাজার ৯১ গেছেন। তিন মাসে ছিল ১ লাখ ৮১ হাজার ২১৮ জন। এরপর মাঝখানে চার মাসেরও বেশি সময় করোনার কারণে থমকে ছিল শ্রমবাজার। এরপর সচল হলে বাকি ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩৬ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন। গতবার সৌদি আরবে ১ লাখ ৬১ হাজার ৭২৬, আরব আমিরাতে ১ হাজার ৮২, কুয়েতে ১ হাজার ৭৪৪, ওমানে ২১ হাজার ৭১, কাতারে ৩ হাজার ৬০৮, লেবাননে ৪৮৮, জর্ডানে ৩ হাজার ৭৬৯, মালয়েশিয়া মাত্র ১২৫, সিঙ্গাপুরে ১০ হাজার ৮৫, দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০৮ ও যুক্তরাজ্যে ২১ জন। ইতালিতে কেউ যায়নি। জাপানে ১৪২, ব্রুনাইয়ে ৫৩০, মরিশাসে ২ হাজার ১৪ ও অন্যান্য দেশে প্রায় ১১ হাজার জন গেছেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটির) অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাফরিজা শ্যামা সময়ের আলোকে বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে কর্মী যাওয়া কিছুটা কমেছে। আসলে কর্মী যাওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি আন্তর্জাতিক চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। আর শ্রমবাজারের সুখবর নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর।
শরিফুল হাসান বলেন, নতুন বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে অনেক শ্রমিক বাইরে গেছেন। নতুন আশা জাগছিল। কিন্তু এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধের কারণে কী হবে তা নিয়েও চিন্তায় পড়েছেন লাখ লাখ শ্রমিক। নতুন বছরে অনেক দেশেই শ্রমবাজার খুলতে শুরু করল। শ্রমিকরা যাচ্ছিলও। কিন্তু এরই মধ্যে আবার অনেকে দেশে করোনা বেড়ে গেছে। অনেক দেশে আগের পরিস্থিতি ফিরে এসেছে। ফলে বৈদেশিক শ্রমবাজার খুললেও কিন্তু শঙ্কা কাটেনি। তবে করোনা পরিস্থিতি না কেটে যাওয়া পর্যন্ত শ্রমবাজার আগের অবস্থায় ফেরার কোনো সম্ভাবনাও নেই।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, যারা ফেরত এসেছেন তাদের আয়ের পথগুলো কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সময় মনে হয় এসেছে। এ ছাড়াও যারা বিদেশ যাচ্ছেন তাদের যাওয়ার পদ্ধতিটা আরও নিরাপদ করার জন্য সরকারি যে উদ্যোগ থাকার দরকার সেটাও এখন ফোকাস করা দরকার।
প্রবাসী সচিব মুনিরুছ সালেহীন সময়ের আলোকে বলেন, কেউ বেকার হয়ে পড়ছে আমাদের কাছে তেমন কোনো খবর নেই। তারপরও কারও কোনো ধরনের সাহায্য দরকার হলে আমরা দিতে প্রস্তুত আছি। এ বিষয়ে সবাইকে নির্দেশনাও দেওয়া আছে।
বায়রার (সদ্য মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, করোনার কারণে অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্টরা বিপদে আছেন। যারা আটকে আছে তাদের দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা করা উচিত।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]