ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ১৬ মে ২০২১ ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ১৬ মে ২০২১

সেহরির গুরুত্ব ও ফজিলত
নূর মুহাম্মদ রাহমানী
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২১, ১০:৩৭ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 110

ইবাদতের বসন্তকাল মাহে রমজান চলমান। এ মাসের প্রতিটি আমল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তন্মধ্যে প্রধানতম আমল হলো রোজা। রোজা রাখতে আমাদের সেহরি খেতে হয়। এর গুরুত্ব অপরিসীম। সেহরি খাওয়ার গুরুত্ব ও অসাধারণ ফজিলত সম্পর্কে বহু হাদিসে বলা হয়েছে। নবী (সা.) নিজে সেহরি খেতেন। অন্যদেরও খুব তাকিদ দিতেন। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) প্রায় ১৭ জন সাহাবি থেকে সেহরির ফজিলতের হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং সেহরি মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে ইজমা (উম্মতের মুজতাহিদ ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্য) বর্ণনা করেছেন। (উমদাতুল কারি শরহু সহিহিল বুখারি)
সেহরি মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের রোজার পার্থক্যকারী। হজরত আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিতÑ হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের ও আহলে কিতাবের রোজার মাঝে পার্থক্য হলো সেহরির লোকমা। কিংবা সাহরি খাওয়া।’ (মুসলিম : ১০৯৬)। আহলে কিতাবের রোজায় সেহরি নেই। আর মুসলমানদের রোজা সেহরির সঙ্গে হয়। এ সেহরিই মুসলমান ও কাফেরের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করে। কাফেরদের চিন্তা হলো রোজা নিজেকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। অথচ মুসলমানদের চিন্তা হলো রোজার আদেশ মান্য করে আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য। আর আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য এমন কষ্ট অনেকে সয়ে যান, যেগুলো করার হুকুম আল্লাহ করেননি।
সেহরি খাওয়া সারাদিন রোজা সুন্দরমতো রাখার জন্য সহায়ক। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, সেহরি খাওয়ার মাধ্যমে দিনের রোজা পূর্ণ করার জন্য সাহায্য নাও এবং দুপুরে ঘুমের মাধ্যমে রাতের নামাজের জন্য সাহায্য নাও।’ (ইবনে মাজাহ : ১৬৯৩)
ক্ষিধে না থাকলে অল্প পরিমাণে হলেও সেহরি খাওয়া উচিত। হজরত আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিতÑ হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন, ‘সেহরি খাওয়া বরকত। একে পরিত্যাগ করো না, যদিও এক ঢোক পানির মাধ্যমে হয়। আল্লাহ ও ফেরেশতা সেহরি ভক্ষণকারীদের জন্য রহমতের দোয়া করেন।’ (মুসনাদে আহমদ ইবনে
হাম্বল : ১১১০১)। আল্লামা ইবনে নুজাইম হানাফি (রহ.) লিখেছেন, হাদিসবিদদের এমন কোনো বক্তব্য আমি স্পষ্টভাবে পাইনি যার দ্বারা প্রমাণ হয় যে, শুধু এক ঢোক পানি পান করার দ্বারা সেহরির সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। অবশ্য হাদিসের বাহ্যিক বক্তব্য দ্বারা সেহরি খাওয়ার তাকিদ বোঝা যায়।
সেহরি খুবই বরকতময় জিনিস। বিভিন্ন হাদিসে বিষয়টি ব্যক্ত হয়েছে। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিতÑ নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সেহরি খাও, সেহরিতে বরকত আছে।’ (বুখারি : ১৮২৩) সেহরি খাওয়ার মধ্যে বরকত আছে এর অর্থ হলো এর দ্বারা আল্লাহর হুকুম আদায় করা সহজ হয়। আল্লাহর হুকুম হলো ফজরের সময় থেকে রোজা শুরু কর এবং সূর্য ডোবার সময় শেষ কর। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) লিখেছেন, সেহরি খাওয়ার বরকত বিভিন্ন কারণে। ১. সুন্নতের অনুসরণ, ২. আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিস্টানদের বিরোধিতা ইত্যাদি। (ফাতহুল বারি শরহু সহিহিল বুখারি)। ইহুদিদের ধারণা ছিল, যদি সেহরি-ই খেতে হয় তা হলে এটা কেমন রোজা
হলো! কিন্তু ইসলামে এ ধরনের ধারণার কোনো সুযোগ নেই।
সেহরির সুন্নত সম্মত সময়
রাতের শেষ অংশে সুবহে সাদেকের আগে আগে সেহরি খাওয়া সুন্নত। অর্ধ রাতের পর যেকোনো সময়ে সেহরি খেলেও সেহরির সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। তবে সেটা শরিয়তের চাহিদার এবং সেহরির উদ্দেশ্যের বিপরীত। ওজর থাকলে ভিন্ন কথা। এজন্য ওলামায়ে কেরাম বিলম্বে সেহরি খাওয়াকে মুস্তাহাব বলেছেন। আর বিলম্বে খাওয়ার অর্থ হলো যতক্ষণ পর্যন্ত সুবহে সাদেক নিশ্চিত না হবে, এতক্ষণ সেহরি খাওয়া যাবে, যখন সুবহে সাদেক দৃশ্যমান হয়ে যাবে তখন পানাহার ছেড়ে দেওয়া লাগবে। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) ও হজরত যায়েদ ইবনে সাবেত এ দুজন সেহরি খেলেন, যখন তারা সেহরি থেকে অবসর হলেন। তখন নবী (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন। হজরত আনাস ইবনে মালেককে (রা.) জিজ্ঞেস করলাম, তার সেহরি থেকে অবসর হওয়া এবং নামাজ পড়ার মধ্যে কতটুকু সময় ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, যতটুকু সময়ে একজন মানুষ ৫০ আয়াত পরিমাণ পড়তে পারে। (বুখারি : ৫৫১)
সেহরির কাজ সেরে ফজরের নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া। আর ঘুমাতে না যাওয়া। হজরত আবু হাজেম হজরত সাহল ইবনে সাদকে (রা.) বলতে শুনেন যে, আমি পরিবারের সঙ্গে সেহরি খেতাম। অতঃপর তাড়াহুড়া করতাম যে, আমি রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করব।’ (বুখারি : ৫৫২)। অনেকে আছেন যারা সেহরি খাওয়ার জন্য জাগ্রত হন, কিন্তু ফজর না পড়েই শুয়ে পড়েন। পবিত্র রমজানেও নামাজ কাজা করে ফেলেন। এভাবে সেহরির সুন্নত আদায় করে ফজরের ফরজ কাজা করা কোনোভাবেই জায়েজ নয়।
হালাল হওয়ার শর্তে সেহরি খাবারের কোনো হিসাব নেই। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিতÑ নবী (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির খাবার গ্রহণের কোনো হিসাব হবে না, শর্ত হলো খাবার হালাল হতে হবে। ১. রোজাদার, ২. সেহরি গ্রহণকারীর ও ৩. মুজাহিদ।’ (তাবরানি, আল মুজামুল কাবির : ১২০১২)
সেহরির খাবার
সেহরিতে যেকোনো খাবার খাওয়া যেতে পারে। তবে সেহরিতে খেজুর খাওয়া খুবই উত্তম। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিতÑ নবী (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের উত্তম সেহরি খেজুর।’ (আবু দাউদ : ২৩৪৫)। খেজুরে মানুষের সব রকমের খাদ্য চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। খাবার না পাওয়া গেলে শুধু খেজুর যদি থাকে, তা হলে এটা যথেষ্ট খাবার। বর্তমান গবেষণা অনুসারে মানুষ নিজের শক্তি ঠিক রাখার জন্য যত কিলো দরকার হবে এসব কিছু খেজুরে বিদ্যমান। তাই খেজুর শুধু ইফতারে না রেখে সেহরিতেও রাখব ইনশাল্লাহ।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সেহরিসহ মাহে রমজানের প্রত্যেকটা আমল যথাযথভাবে করার তওফিক দান করুন। আমিন।
ষ মুহাদ্দিস ও প্রাবন্ধিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]