ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ১৬ জুন ২০২১ ১ আষাঢ় ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ১৬ জুন ২০২১

যার যায় সেই শুধু বোঝে
প্রভাষ আমিন
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২১, ২:১৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 278

একাত্তর টিভির সহকারী প্রযোজক রিফাত সুলতানার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। কিন্তু তার মৃত্যুর পর মনে হচ্ছে, আহা কত আপন ছিল আমাদের। সম্প্রচার পরিবারেরই সদস্য। বয়স মাত্র ৩০, বাচ্চা একটা মেয়ে। ১৬ এপ্রিল কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই করোনা কেড়ে নেয় তাকে। এটুকু শুনেই নিশ্চয়ই অনেকের মন খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু বেদনার গল্পের মাত্র শুরু।

রিফাত সুলতানার স্বামী নাজমুল ইসলামও একই টিভিতে প্রডিওসার হিসেবে কাজ করছেন। এই দম্পত্তির পৌনে তিন বছর বয়সি যমজ ছেলে আছে। তাদের একটি পারিবারিক ছবি আছে, যাতে চারজন একই রঙের টি-শার্ট পরা। নাজমুলের বুকে লেখা ‘শরহম’, রিফাতের টি-শার্টে লেখা ‘য়ঁববহ’ আর দুই ছেলের টি-শার্টে লেখা ‘ঢ়ৎরহপব’। কন্যা সন্তান এই পরিবারটিকে পূর্ণতা দিতে পারত। কিন্তু ‘ঢ়ৎরহপবংং’ আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘য়ঁববহ’ চলে গেলেন।

এবার শুনুন এরপরের গল্প। রিফাতের স্বামী নাজমুল নিজেও করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। বড় আঘাত যেমন ছোট আঘাতকে ভুলিয়ে দেয়, নাজমুলই তেমনি স্ত্রীর মৃত্যুর খবরে হাসপাতাল ছেড়েছেন। নাজমুলের মা করোনা আক্রান্ত হয়ে একটি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। পাঁচ হাসপাতাল ঘুরে রিফাত মারা গেছে ইমপালস হাসপাতালে। আর রিফাতের নবজাতককে নেওয়া হয়েছে এভারকেয়ার হাসপাতালের এনআইসিইউতে।

এবার ভাবুন একটু অবস্থা। রিফাতের মৃত্যুতে দু’ফোটা চোখের জল ফেলার অবকাশ নেই কারও। যারা বেঁচে আছেন, তাদের বাঁচিয়ে রাখাটাই বড় যুদ্ধ। এখন কে কার পাশে থাকবেন, সেটাই বড় বিবেচনা। যমজ দুই ছেলে রুদ্র আর ধ্রুব মায়ের অপেক্ষায় বসে আছে। মা যে আর কখনও আসবে না, সেটা বোঝার বয়সও হয়নি তাদের। করোনা এসে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকেই তছনছ করে দিয়ে গেছে। করোনা আক্রান্ত প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসার জন্য কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই।

আমার আরেক বন্ধুর বাবা করোনা আক্রান্ত হয়ে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি। তার বাসা মিরপুরে। প্রতিদিন মিরপুর থেকে ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে গিয়ে বাবার দেখভাল করছিলেন। এর মধ্যে তিনি নিজেই করোনা আক্রান্ত হন। কিন্তু নিজের দিকে তাকানোর সময় নেই তার। আগে বাবাকে বাঁচাতে হবে। তাই আইসোলেশনে থাকারও উপায় নেই। নিজের এবং পরিবারের সবার জন্য ঝুঁকি জেনেও প্রতিদিন বাবার হাসপাতালে রাত জাগছেন।

আরেক বন্ধু করোনা আক্রান্ত হলেন। তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে ডাক্তাররা আইসিইউতে রাখার পরামর্শ দিলেন। বড়ভাইকে নিয়ে ছোটভাই পাগলের মতো এই হাসপাতাল, ওই হাসপাতাল ছুটে ধানমন্ডির একটি হাসপাতাল পেলেন। বড়ভাইকে আইসিইউতে রেখে বাসায় ফেরার পরদিন তিনি নিজেই আক্রান্ত হলেন করোনায়। এখন আইসিইউতে বড়ভাইকে দেখবে কে?

ধনঞ্জয়-জলি দম্পতি আমাদের পারিবারিক বন্ধু। গত মাসের শেষ দিকে পূর্বনির্ধারিত অফিশিয়াল ট্যুরে তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হয়। কিন্তু খুব স্বস্তি নিয়ে যেতে পারেননি। করোনা আক্রান্ত শ্যালককে হাসপাতালে রেখেই যেতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু বাবার করোনা সংক্রমণের খবরে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরে আসতে হয় তাকে। ততক্ষণে মা এবং শ্বশুর-শাশুড়িও করোনায় আক্রান্ত হন। দেশে ফিরে চারজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এর মধ্যে তার বাবাকে নিতে হয় আইসিইউতে। যমে-মানুষে টানাটানিতে হেরে যায় মানুষ। হাসপাতালে গিয়েছিলেন চার রোগী নিয়ে। পহেলা বৈশাখে বাসায় ফিরেছেন তিন রোগী নিয়ে। আর বাবার মৃতদেহ নিয়ে ছুটতে হয়েছে শ্মশানে।

এমন অসংখ্য বেদনার গল্প ঘরে ঘরে। শোক করারও সময় নেই। একটা ধাক্কা কাটতে না কাটতেই আরেকটা ধাক্কা। শোকের আয়ু বড়জোর কয়েক ঘণ্টা। দুপুরে শামসুজ্জামান খানের মৃত্যু সংবাদ, বিকালে মতিন খসরু। দুদিন বাদে কবরী, রাতেই ওয়াসিম, সকালে এসএম মহসীন। মায়ের জন্য একটি আইসিইউ চেয়ে ফেসবুকে আহাজারি করলেন কবি ও রাজনীতিবিদ মোহন রায়হান। কিছুক্ষণ পর খবর এলো আর আইসিইউ লাগবে না। সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন তিনি।

ফেসবুকেই জানলাম সাংবাদিক সৈয়দ বোরহান কবিরের মা মারা গেছেন। একটু পর খবর পেলাম আরটিভির সিইও সৈয়দ আশিক রহমানের বাবা মারা গেছেন। এরপর খবর এলো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদের মা মারা গেছেন। নিজেকে পাগল পাগল লাগে। কারও জন্য যেন কিছু করার নেই। নিজেকে কেমন অসহায় আর অক্ষম মনে হয়। শুধু আমি নই, গোটা বিশ্বই আজ ছোট্ট এক ভাইরাসের কাছে অসহায়।

এই যে বাংলাদেশে ১০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। প্রতিদিন একশর ওপরে মানুষ মারা যাচ্ছে, তাতেও কিন্তু আমাদের কারও কারও টনক নড়েনি। লকডাউন শুরুর আগের দিন মনে হচ্ছিল, পরদিন ঈদ, চানরাইতের কেনাকাটা চলছে। শপিং মলে, বাজারে উপচেপড়া ভিড়। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ এবং পহেলা রমজান থেকে শুরু হওয়া কঠোর লকডাউন কার্যকর করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। যাদের অতি জরুরি দরকার তাদের তো ঘর থেকে বেরুতে হচ্ছেই। কিন্তু অনেকেই অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছেন। কেউ লকডাউন দেখতে বের হচ্ছেন, কেউ ঘুড়ি কিনতে মুভমেন্ট পাস নিয়ে বেরিয়েছেন। মুভমেন্ট পাসের জন্য ১৬ কোটি আবেদন পড়েছে। সবাইকে পাস দিলে করোনাই শুধু ঘরে থাকবে, মানুষ সব বেরিয়ে পড়বে।

এক বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতায় আমরা এটা বুঝতে পেরেছি, করোনার কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এমনকি টিকাও করোনা থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারবে না। টিকা নেওয়ার পরও করোনা হতে পারে। আর করোনার সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কদিন আগেই বলেছেন, পুরো ঢাকা শহরে হাসপাতাল বানালেও চাহিদা মিটবে না। আসলে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায় করোনা থেকে দূরে থাকা। আর করোনা থেকে দূরে থাকা খুব সহজ। আমরা সবাই সে সহজ উপায়টি জানি, কিন্তু মানি না। উপায়টি হলো- জনসমাগমে না যাওয়া এবং মাস্ক পরা। করোনা মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরে থাকতে হবে। একজন মানুষের মুখের ড্রপলেট যেন আরেকজন মানুষের নাগাল না পায়। তাই করোনা এড়িয়ে থাকার প্রথম উপায় মানুষের কাছে না যাওয়া। আর অতি জরুরি কারণে বের হতে হলেও যেন নাক-মুখ ঢেকে রাখি। আর পরিচ্ছন্ন থাকা, বারবার হাত ধোয়ার কথাও আমরা সবাই জানি। ঘরে থাকতে হবে আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য। মানুষকে ঘরে আটকে রেখে সরকারের কোনো লাভ নেই। বরং অর্থনীতির ওপর ভয়ঙ্কর চাপ সৃষ্টি হয়। তাই লকডাউন কার্যকর করতে সরকারকে আমাদের সহায়তা করা দরকার। উল্টো আমরা নানা অজুহাতে ঘর থেকে বের হই, পুলিশের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলি।

করোনা এখনও যাদের ছুঁতে পারেনি, তারা ভাগ্যবান। প্লিজ আপনারা আপনাদের সেই ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না। করোনা আসেনি বলে আসবে না, এমন কোনো কথা নেই। করোনা আসেনি বলে আপনি যা ইচ্ছা তাই করবেন; তাহলে কিন্তু করোনাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। যাদের এখনও করোনা হয়নি, তারা আরও বেশি সাবধানে থাকুন। যাদের একবার হয়েছে, তারাও সাবধানে থাকুন। করোনা কিন্তু দ্বিতীয়বারও হতে পারে। আসলে করোনার ভয়াবহতা এতটাই, যার গেছে শুধু সেই জানে। রিফাত-নাজমুলের পরিবারকে সান্ত্বনা জানানোর ভাষা কি আপনাদের কারও জানা আছে। নিজের খামখেয়ালির কারণে যদি আপনি আক্রান্ত হন, তাহলে কিন্তু সরকারকে গালি দেওয়ারও সময় পাবেন না। হাসপাতালের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতেই কেটে যাবে সময়। তাই প্লিজ আপনারা ঘরে থাকুন।

হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]