ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৮ মে ২০২১ ২৪ বৈশাখ ১৪২৮
ই-পেপার শনিবার ৮ মে ২০২১

বৈশি^ক তাপমাত্রা বৃদ্ধি : চরম বিপর্যয়ে মানবজাতি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ মে, ২০২১, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 328

সৈয়দ ফারুক হোসেন
দেশে করোনা সংক্রমণের পাশাপাশি চলছে তীব্র তাপদাহ। গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ। বৈশি^ক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পুরো পৃথিবীর মতো বাংলাদেশের প্রাকৃতিক চরিত্রেও পরিবর্তন এসেছে। জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে ব্যর্থতা, প্রকৃতি বিনাশ ও চলমান করোনা মহামারির মতো অন্যান্য বৈশি^ক সঙ্কট মানবজাতির জন্য বিশাল হুমকি সৃষ্টি করেছে বলে সম্প্রতি সতর্ক করেছেন ১০ জন নোবেলজয়ী। বৃহস্পতিবার
প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত নোবেল প্রাইজ সম্মেলনের পর দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে তারা একথা বলেন। করোনার মতো আরও বৈশি^ক মহামারির ঝুঁকির বিষয়েও তারা সতর্ক করেন। বৈশি^ক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের তাপমাত্রার চেয়ে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এদিকে পৃথিবীর সব কিছুই ওলটপালট করে দিয়েছে মহামারি কোভিড-১৯। মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের শুরুতে, তা কেবলই দীর্ঘ হচ্ছে। এ অবস্থায় বৈশি^ক তাপমাত্রাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকৃতির এমন বৈরী আচরণের জন্য মনুষ্যসৃষ্টি অনেক কারণকেই দায়ী করা হচ্ছে। মানুষ প্রকৃতির ওপর নানাভাবে খবরদারি করছে। খাল-বিল, নদী-নালা দখল করা হচ্ছে। পাহাড় কাটা চলছে নির্বিচারে। কৃষিজমির ওপর নির্মিত হচ্ছে ঘরবাড়ি। এভাবে নানাভাবেই চলছে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার। এখন নিয়ম মেনে কোনো ঋতু বদল হয় না। আষাঢ় আসে কিন্তু বৃষ্টি আসে না। ঋতুর পালাবদলে ঋতুবৈচিত্র্যের কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। বৈশাখেও চলে তীব্র তাপদাহ। তাপ, চাপ, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্র স্রোত প্রভৃতি প্রাকৃতিক নিয়ামকের আবর্তে অহরহ পরিবর্তন ঘটে চলেছে এই বিশ^ চরাচরে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প, হিমবাহ, উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে শুরু করে ঝড়-বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা সব ধরনের প্রাকৃতিক পরিস্থিতিই সেই পরিবর্তনের ফল। ভূ-মণ্ডলের এই শতধা বিবর্তন মুহূর্তের জন্যও থেমে নেই। গোটা বিশ^ যে অণু-পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত, তার সংশ্লেষণ, বিশ্লেষণ ও প্রতিস্থাপনে হয় আবহাওয়া, নয় সমুদ্র স্রোত, নয় ভূ-গর্ভে পরিবর্তন চলছেই হরদম। আর সেই সঞ্চিত পরিবর্তন যুগে যুগে কখনও আকস্মিক, কখনও ধীরলয়ে বিশে^র বুকে ছাপ রেখে চলেছে।
বিশ^ মানচিত্রে ক্ষুদ্র এক ভূখণ্ড আমাদের এই বাংলাদেশ। দেশের প্রায় মাঝখান দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা চলে যাওয়ার কারণে এ দেশ ক্রান্তীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সমুদ্র-সান্নিধ্য ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ দেশের আবহাওয়া শীত, গ্রীষ্ম কোনোটিই চরম হতে পারেনি। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া আমাদের জীবনযাত্রা তুলনামূলক আরামদায়ক। কিন্তু পরিসর যতই ক্ষুদ্র হোক, প্রাকৃতিক পরিবর্তন এ দেশে ঘটছে এবং সঞ্চিত হচ্ছে। আর এ সঞ্চিত পরিবর্তন এক সময় ছন্দপতন ঘটাতে সক্ষম। আমাদের দেশে সম্প্রতি প্রাকৃতিক পরিবর্তনের একটি আশঙ্কা ক্রমেই স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। সে আশঙ্কা প্রচণ্ড তাপদাহের। আরামপ্রিয় মানুষের বহু যুগের জীবন প্রণালি সুখের সন্ধানে ক্ষয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে পৃথিবী। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পার্বত্য এলাকায় অতিবৃষ্টি, বজ্রপাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। মানুষের নানা কাজকর্মের পরিণতিতে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন দ্রুত হারে সাগর-পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং বরফ গলছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ২১০০ সাল নাগাদ সাগর-পৃষ্ঠের উচ্চতা ১.১ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সে সঙ্গে, জীবজন্তুর বিভিন্ন প্রজাতি তাদের আবাসস্থল বদলাচ্ছে।
পৃথিবী এখন মহাসঙ্কটে।
বিভিন্ন দিক থেকে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং এর জন্য আমরাই দায়ী। সাগর-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে, বরফ গলছে দ্রুত হারে এবং এর প্রভাব পড়ছে পুরো বিশে^র প্রাণীজগতের ওপর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বরফের আচ্ছাদন বিলীন হওয়ার কারণে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি দিনকে দিন বিপজ্জনক হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের এখন কোনো সন্দেহ নেই যে, সাগর-মহাসাগরে উষ্ণতা ১৯৭০ সাল থেকে অব্যাহতভাবে বাড়ছে। মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের ফলে পরিবেশে যে বাড়তি তাপ তৈরি হচ্ছে, তার ৯০ শতাংশই শুষে নিচ্ছে সাগর। ১৯৯৩ সাল থেকে শুষে নেওয়ার এই মাত্রা দ্বিগুণ হয়েছে। সে সঙ্গে গলছে গ্রিনল্যান্ড এবং অ্যান্টার্কটিকার বরফ। বাড়ছে সাগর-পৃষ্ঠের উচ্চতা। ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যে হারে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলেছে তা আগের ১০ বছরের তুলনায় তিনগুণ। অ্যান্ডিজ, মধ্য ইউরোপ এবং উত্তর এশিয়ায় যেসব হিমবাহ রয়েছে, সেগুলোর বরফ ২১০০ সাল নাগাদ ৮০ শতাংশ গলে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফলে জলবায়ু বিবর্তনের ফলে পৃথিবী এক মারাত্মক হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। এর প্রভাবে পৃথিবীর মানুষ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে অসংখ্য প্রাণহানি ঘটছে এবং ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও নদীবিধৌত বদ্বীপ বাংলাদেশ আরও প্রাকৃতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়। তবে উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের হিমবাহ গলতে থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাণঘাতী দুর্যোগ ঝুঁকি আরও বাড়ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও পানি বৃদ্ধি এবং মাটির লবণাক্ততাকে প্রধান প্রাকৃতিক বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যতই চরম রূপ লাভ করছে এবং দৃশ্যমান হচ্ছে, ততই তার বিরূপ প্রভাবে পানি ও বাতাসবাহিত রোগ-ব্যাধি, অপুষ্টি, দুর্যোগকালীন মৃত্যু ও আঘাতের হার বাড়ছে। গড় তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকায় ঋতুর আচরণ বদলে গেছে, এতে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার কৃষির ওপর ইতোমধ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশের নিচু ও উপকূলীয় এলাকা বেশি বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিশ^ব্যাংকের গবেষণা বলছে, আগামীতে এ ধরনের দুর্যোগ আরও শক্তি নিয়ে আসবে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছিল ২০১৫ সালে প্যারিসে। ওই বছরের ৩০ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সম্মেলনে শেষ পর্যন্ত অনেক ছাড় দিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়। ওই চুক্তিই জলবায়ুর ইতিহাসে ‘প্যারিস জলবায়ু চুক্তি’ নামে খ্যাতি লাভ করেছে। ওই চুক্তিটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে, পৃথিবী নামক এই গ্রহটিকে বাঁচাতে বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং সম্ভব হলে তা ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। এখন এই চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছে শক্তিশালী রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। আর এ হস্তক্ষেপটিই হচ্ছে জো বাইডেনের ক্লাইমেট লিডার্স সামিট। কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে যখন বিশে^র গোটা অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছিল সেই ২০২০ সালেও বিশ^বাসী তৃতীয় সর্বোচ্চ উষ্ণ বছর পার করেছে। এ বছর বিশে^ সাইক্লোন, বন্যা, খরা, দাবানল, তাপপ্রবাহ এমন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেই, যা ঘটেনি। ২০২১ সালে এসেও সেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধারা অব্যাহত আছে। ২০২১-এর জানুয়ারিতে ১২ লাখ মানুষের ওপর চালানো জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ও যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কিত একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারির চেয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখনও তাৎপর্যপূর্ণ।
গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে। বৈশি^ক উষ্ণতার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ধরিত্রীকে বাঁচানোর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সময় হাতে আর খুব বেশি নেই। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এতদিন ধরে যেসব পদক্ষেপ বিশ^নেতারা নিয়েছেন সেগুলো একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক কর্মসূচির তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ১.৫-এর মধ্যে রাখতে যে পদক্ষেপ নিতে হবে তা হলোÑ খননের মাধ্যমে জ্বালানি আহরণ এখনই বন্ধ করতে হবে এবং তার পরিবর্তে নবায়নযোগ্য এবং জলবায়ুবান্ধব পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে জ্বালানির চাহিদা পূরণে। জো বাইডেনের লিডার্স সামিটের লক্ষ্যও তাই। বাইডেন চাচ্ছেন সব নেতা মিলে সমন্বিতভাবে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাতে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশে^ কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা যায়। এ মুহূর্তে জলবায়ু আলোচনার মূল ফোকাসও হচ্ছে ‘জিরো অ্যামিশন’। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর বিপর্যয় থেকে ধরিত্রীকে রক্ষার জন্য আর কোনো বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে বাইডেন ধরিত্রী দিবসকে বেছে নিয়েছেন। ধরিত্রী দিবসে অর্থাৎ ২২ এপ্রিলই ভার্চুয়াল মাধ্যমে দুদিনের লিডার্স সামিট অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনেও ধরিত্রী দিবস প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। ওই সম্মেলনের ভিত্তিতেই ধরিত্রী রক্ষায় বৈশি^ক উষ্ণতা কমানোর জন্য গঠন করা হয় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ইউনাইটেড নেশন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ। সেই থেকে ইউএনএফসিসিসি প্রতিবছর বৈশি^ক জলবায়ু সম্মেলন আয়োজন করে আসছে। বাংলাদেশ বর্তমানে মোস্ট ভালনারেবল কান্ট্রিজের নেতৃত্বে রয়েছে। আবার বাংলাদেশ নিজেও জলবায়ু পরিবর্তনে সামনের সারির একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর নেতা হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্বও অনেক।
এই দায়িত্ব বাংলাদেশকে অনেক বিচক্ষণতার সঙ্গে পালন করতে হবে। যেহেতু এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ‘জিরো অ্যামিশনে’ নিয়ে আসা। সেহেতু এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনটি কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। যথাÑ স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি। অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০৩০ হবে স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি। ২০৩১ থেকে ২০৪০ হবে মধ্যমমেয়াদি এবং ২০৪১ থেকে ২০৫০ হবে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি। প্রতিটি মেয়াদি কর্মসূচি শেষে বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধি মূল্যায়ন করে পরবর্তী মেয়াদে গ্রিনহাউস গ্যাস তথা কার্বন-ডাই অক্সাইড নির্গমন কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা। যেহেতু গত ৪ বছর লক্ষ্যহীনভাবে চলেছে, তাই প্রথম মেয়াদে কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্য বেশি হওয়া উচিত। দ্বিতীয় যে বিষয়টির ওপর বাংলাদেশ নজর দিতে পারে তা হলোÑ বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে অবশ্যই সীমিত রাখা। প্যারিস চুক্তিতে বৈশি^ক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, সম্ভব হলে তা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার চেষ্টা করা। ইতোমধ্যে বৈশি^ক উষ্ণতা ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। আইপিসিসির সর্বশেষ প্রতিবেদনেও এই উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে। এর প্রতি স্বল্পোন্নত দেশ, আফ্রিকান দেশ, দ্বীপদেশ এবং সব ক্ষতিগ্রস্ত দেশের সমর্থন রয়েছে।
উন্নত দেশগুলো জলবায়ু তহবিলে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বাংলাদেশের উচিত সেটাকে আবারও সামনে নিয়ে আসা। এই সম্মেলনে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (জিসিএফ) ৫০ শতাংশ অর্থ অভিযোজন কার্যক্রমে ব্যয়ের নিশ্চয়তা বাংলাদেশের অবশ্যই দাবি করা উচিত। বর্তমানে ওই তহবিলের মাত্র ২০ শতাংশ অর্থ অভিযোজন কার্যক্রমে ব্যয় হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে অভিযোজন কার্যক্রম তুলে ধরা যেতে পারে। যেখানে নিজস্ব সীমিত অর্থ ব্যবহার করে বাংলাদেশ অভিযোজনে সাফল্য পাচ্ছে, বৈশি^ক সহায়তা পেলে বাংলাদেশের এই অভিযোজন কার্যক্রম আরও টেকসই হবে এবং বাংলাদেশ আরও নতুন নতুন সাফল্য অর্জন করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য মডেল সৃষ্টি করতে পারবে। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বিপদাপন্নতার বিষয়গুলো মাথায় রাখবে। সর্বোপরি, বিপদাপন্ন দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর কাছে একটি ‘এমভিসি ফান্ড গঠনের’ দাবি তুলতে পারে, যেখান থেকে বিপদাপন্ন দেশগুলো সহজ শর্তে অর্থ নিয়ে তাদের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে পারবে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে নানা উদ্যোগ নিতে সমর্থ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘লিডার্স সামিটের’ সম্মেলনে বিশ^ নেতাদের কাছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারটি পরামর্শ তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শগুলোর মধ্যে অন্যতম হলোÑ বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখতে উন্নত দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে অবিলম্বে একটি উচ্চাভিলাষী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
এ ছাড়া ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিলের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নিশ্চিত করতে হবে, যা অভিযোজন ও প্রশমনের মধ্যে ৫০:৫০ ভারসাম্য বজায় রাখবে। প্রধানমন্ত্রীর তৃতীয় পরামর্শ হলো, প্রধান অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উদ্ভাবনের পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের জন্য বিশেষভাবে ছাড় দিতে হবে। তিনি তার শেষ পরামর্শে, সবুজ অর্থনীতি ও কার্বন প্রশমন প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং এ লক্ষ্যে দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তির বিনিময়ের প্রতি জোর দেন। বাংলাদেশ মোট জিডিপির প্রায় ২.৫ শতাংশ বা প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলা এবং টেকসই জলবায়ু সহনশীল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যয় করছে। বাংলাদেশ ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি) বৃদ্ধিতে এবং জলবায়ুর পরিবর্তন সহনীয় টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে কার্বন হ্রাসের পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুজিব বর্ষ’ উদযাপনে দেশব্যাপী ৩০ কোটি গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ ছাড়া কম কার্বনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রোসপারিটি প্ল্যান’ প্রণয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) এবং ভি২০-এর (ভালনারেবল টুয়েন্টি) সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থ সমুন্নত রাখা। বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় বৈশি^ক উষ্ণতা রোধ এবং অভিযোজন বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষায় আশার আলো কিছুটা হলেও দেখা যেতে পারে।

ষ ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]