ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ১৬ মে ২০২১ ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
ই-পেপার রোববার ১৬ মে ২০২১

পদ্মায় কেন এত স্পিডবোট
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ৫ মে, ২০২১, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৫.০৫.২০২১ ১:২৭ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 32

পদ্মা নদীতে প্রায়ই ছোটবড় স্পিডবোট দুর্ঘটনা ঘটে। এর কিছু কিছু আলোচনায় এলেও অধিকাংশই অজানা থেকে যায়। গত সোমবার পদ্মা নদীতে ভয়াবহ স্পিডবোট দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহতের পরে ফের আলোচনা চলছে স্পিডবোট নিয়ে। সবার একটিই প্রশ্নÑ পদ্মায় কেন এত স্পিডবোট? আদৌ কি এগুলোর অনুমোদন আছে? কোথায় তৈরি হচ্ছে এসব বোট? যাত্রী বহনের জন্য কতটা সমর্থ? এর চালকদের যোগ্যতাই বা কী? কীভাবেই বা বছরের পর বছর অবৈধভাবে দাপটের সঙ্গে চলছে এসব বোট। প্রশ্ন যেমনই হোকÑ বিআইডব্লিটিএ, বোট মালিক ও ঘাট ইজারা-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ কারও কাছেই সদুত্তর নেই। শুধু স্পিডবোট নয়, একই রুটে চলাচলরত অধিকাংশ বালুবাহী বাল্কহেডেরও কোনো অনুমোদন নেই। 
ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালীদের দাপট ও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর ধরে চলছে এসব অবৈধ স্পিডবোট ও বাল্কহেড।
এদিকে স্পিডবোট ডুবে ২৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় বোট মালিক ও চালকসহ চার জনের নামে শিবচর থানায় নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। সোমবার গভীর রাতে উপপরিদর্শক লোকমান হোসেন মামলাটি করেন। এতে আহত বোট চালক শাহ আলমকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা হলোÑ ঘাটের ইজারাদার শাহ আলম এবং বোটের মালিক চান্দু মোল্লা ও মো. রেজাউল। তারা এখনও পলাতক। মঙ্গলবার ভোরে উন্নত চিকিৎসার জন্য আহত বোটচালককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ঘাটসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া, মাদারীপুরের বাংলাবাজার ও মাঝিকান্দি নৌরুটে পদ্মা নদীতে যাত্রী পারাপারে চার শতাধিক স্পিডবোট চললেও এসবের কোনো নিবন্ধন নেই। তেমনি বোট চালানোয় নেই কোনো প্রশিক্ষণ। কোনো রকমে স্ট্যাডিং ধরতে পারলেই নেমে পড়ছে। তদারক করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। মাত্র ২৮টি বোটের অনুমোদন থাকলেও সবই চলছে ম্যানেজ করে। এ ছাড়া নামকাওয়াস্তে যারা দায়িত্ব পালন করছেন অবৈধ সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে তারাও নীরব থাকছেন। এর ফলে বারবার ঘটছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।
স্থানীয়রা বলেন, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলায় এসব স্পিডবোট তৈরি করা হলেও ইঞ্জিন ও কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশীয় কারিগররা মূলত স্পিডবোটের কাঠামো তৈরি করে ও নষ্ট হলে মেরামত করে। সরকারি বিভিন্ন বাহিনী ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন লোক বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এসব স্পিডবোট কিনে থাকে। এসব বোট নদীতে চালানোর জন্য অনুমোদন দরকার হলেও অনুমোদন ছাড়াই চলছে। শুধু ইজারাদারের সঙ্গে সমঝোতা করেই চালানো হচ্ছে এসব বোট। তবে সব ধরনের ঝামেলা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের দিতে হয় বড় অঙ্কের মাসোহারা।
দুর্ঘটনার পর খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের কুমারভোগে অবস্থিত মেসার্স মুন ইন্টারন্যাশনালে স্পিডবোট তৈরি করা হয়। সরেজমিন দেখা যায়, ৬-৭ জন কারিগর স্পিডবোট তৈরির কাজে ব্যস্ত। কারখানার মালিক মহসিন আহমেদ বলেন, মুন ইন্টারন্যাশনাল ছাড়াও কুমারভোগ এলাকার খলিল ব্যাপারীর কারখানা, আবু বোর্ড বিল্ডার্স, সোনাকান্দা ডকসহ অনেক জায়গাতেই স্পিডবোট তৈরি করা হয়। স্পিডবোটের ইঞ্জিন মূলত জাপান থেকে আমদানি হয়। এ ছাড়া স্পিডবোটের বোর্ড তৈরির কাঁচামাল জিন ফাইবারও মালয়েশিয়া, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন থেকে আমদানি হয়। স্থানীয় কারিগররা শুধু স্পিডবোটের কাঠামো তৈরি ও রঙ করে। একেক কারিগর একেক অংশ তৈরি করার পর সব অংশ জোড়া লাগিয়ে একটি সম্পূর্ণ স্পিডবোট তৈরি করে। সাড়ে ৪ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত এসব স্পিডবোট বেচাকেনা হয়। যদিও করোনা মহামারির কারণে গত ৮-৯ মাসে একটি স্পিডবোটও বিক্রি করতে পারেননি বলে তিনি জানান।
শিমুলিয়া বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী পরিচালক শাহাদাত হোসেন দাবি করেন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন অধিদফতর বেশ কয়েক বছর আগে প্রায় ২৫ ভাগ স্পিডবোটের নিবন্ধন করেছিল। তবে আমাদের কাছে সেসবের কোনো নথি নেই।
বাল্কহেডও চলছে অনুমোদন ছাড়া : এদিকে স্পিডবোটের মতো মাদারীপুরের শিবচরের কাঁঠালবাড়ি থেকে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের চরসেনসাস পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার পদ্মা নদীতে চলছে শত শত অবৈধ বাল্কহেড। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা পদ্মা নদী ঘিরে এ বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। অনুমোদনহীন বাল্কহেড বেপরোয়াভাবে চলাচলের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।
গণমাধ্যমের তথ্যে দেখা গেছে, সোমবার মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ও মাদারীপুরের বাংলাবাজার নৌপথের কাঁঠালবাড়ি এলাকায় বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডে ধাক্কা লেগে ২৬ যাত্রী মারা গেছেন। এর আগে ৫ এপ্রিল নড়িয়ায় দুটি বাল্কহেডে ধাক্কা লেগে মারা যান এক শ্রমিক। এ ঘটনার এক সপ্তাহ আগে নড়িয়ার মুলফৎগঞ্জে ঝড়ের কবলে পড়ে আটটি বালুবোঝাই বাল্কহেড তলিয়ে গেলে বাল্কহেডের দুজন শ্রমিক নিখোঁজ হন।
এ বিষয়ে নৌপরিবহন অধিদফতরের মাওয়া অঞ্চলের পরিদর্শক আমীর হোসেন গণমাধ্যমে বলেন, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও মুন্সীগঞ্জ এলাকার পদ্মা নদীতে চলাচলকারী বাল্কহেডের অধিকাংশেরই কোনো অনুমোদন নেই। এ নৌযান তারা কোথায় নির্মাণ করে, তাও তারা জানেন না। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের জন্য এসব বাল্কহেড ব্যবহার করায় নদীতে প্রায়শ দুর্ঘটনা ঘটছে।
গত সোমবার স্পিডবোট দুর্ঘটনার পর মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক নদীতে অবৈধ ও অনুমোদনহীন নৌযান চলাচল বন্ধ করবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার সারাদিন বাংলাবাজার ও কাঁঠালবাড়ি ঘাটে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের বাইরেও কয়েকশ বাল্কহেড চলাচল করতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের চলাচলের এ নৌপথ নিরাপদ করতে অবৈধ নৌযান নিয়ন্ত্রণ করা হবে। শিগগিরই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্পিডবোট চালককে ঢামেকে ভর্তি : ঢামেক সূত্র জানায়, সোমবারের দুর্ঘটনায় আহত স্পিডবোট চালক শাহ আলমকে (৩৮) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। তার হাত ও মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। শাহ আলমের মা আলেয়া বেগম জানান, দুর্ঘটনার পর মাদারীপুর শিবচরের একটি হাসপাতালে তার ছেলেকে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার আগারগাঁও নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে সিট খালি না থাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. বাচ্চু মিয়া ঢামেকে শাহ আলমের ভর্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চিকিৎসকের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, তার মাথা এবং হাতে আঘাত লেগেছে।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার সকালে মাদারীপুরের শিবচরে পুরাতন কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাট এলাকায় পদ্মা নদীতে বালুভর্তি একটি বাল্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোটের সংঘর্ষে ২৬ জন নিহত হন। এ ছাড়া আহত অবস্থায় ৫ জনকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রী ও চালকের বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটে বলে উদ্ধারকারীরা জানান।












সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]