ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ১৯ মে ২০২১ ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ১৯ মে ২০২১

করোনার থাবায় সঙ্কটে পোশাক শ্রমিকরা
প্রকাশ: বুধবার, ৫ মে, ২০২১, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 33

সম্প্রতি ‘দ্য উইকেস্ট লিঙ্ক ইন গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন : হাউ দ্য প্যান্ডেমিক ইজ অ্যাফেক্টিং বাংলাদেশ গার্মেন্টস’ বা ‘বৈশি^ক সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতম অংশীদার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শ্রমিকেরা মহামারিতে কীভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে দেশের ৩৫ শতাংশ পোশাক শ্রমিকের বেতন কমেছে। অথচ করোনার সংক্রমণ যখন ঊর্ধ্বমুখী তখন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করে কাজ করে যাচ্ছে পোশাক খাতের শ্রমিকরা, বিনিময়ে পাচ্ছে না যথাযথ পারিশ্রমিক। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেশে আঘাত হানার পর চলমান লকডাউনেও পোশাক খাতের শ্রমিকরা কার্যত ফ্রন্টলাইনারের ভূমিকাতে অবতীর্ণ হয়েছে। তা ছাড়া করোনার প্রকোপ বাড়ার পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাওয়া পোশাক খাতসহ বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের প্রচেষ্টার ফলে পণ্য রফতানিতে নতুন মাইলফলকে পৌঁছাল বাংলাদেশ। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবির) হালনাগাদ হিসাব অনুযায়ী গত এপ্রিল মাসে ৩১৩ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে যা গেল বছরের এপ্রিলের চেয়ে ৫০২ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি।
চলমান করোনা মহামারির মধ্যে পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতনাদি পরিশোধের লক্ষ্যে গত বছর সরকারের কাছ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ পায় কারখানার মালিকরা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের এক যৌথ জরিপে দেখা যায়, সরকার প্রদত্ত মোট প্রণোদনার ৫৮ শতাংশ পেয়েছে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। তবুও করোনাভাইরাস দেশে আঘাত হানার পর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক ছাঁটাই বা কর্মচ্যুতির শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি (বিসিডাব্লিউএস)। উল্লেখ্য, যারা ছাঁটাই হয়েছে তাদের মধ্যে অনেকেই বকেয়া বেতন বা কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। এদিকে গত বছরের সরকার প্রাপ্ত প্রণোদনার টাকা পাওয়ার পর, এ বছরও ঈদের আগে এপ্রিল-জুন মাসের বেতন বোনাস পরিশোধের দাবিতে প্রণোদনা প্যাকেজের আবেদন করেছেন কারখানার মালিকরা।
করোনাভাইরাসের প্রকোপ অনেকাংশেই নাজুক করে ফেলেছে পোশাক শ্রমিকদের জীবনধারা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের চলমান সঙ্কটকালে প্রায় ৭৭ শতাংশ শ্রমিক তাদের পরিবারের খাদ্য চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না। দৈনন্দিন তৈজসপত্র-খাদ্যসামগ্রীর দাম করোনাভাইরাস চলাকালীন সময়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় নিজের সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের খাদ্য ঘাটতি পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই খাদ্য চাহিদার ঘাটতি থাকার ফলে তারা বিভিন্ন রকম দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। ইউনাইটেড ন্যাশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি) ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির চৌধুরী সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ এবং ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড বিজনেস পরিচালিত গবেষণায় করোনাকালে গামেন্টস কর্মী, বিশেষ করে নারী কর্মীদের বিভিন্ন ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। করোনা সৃষ্ট সঙ্কটে বাজারে চাহিদা কমা, শিপমন্ট বন্ধ, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় লাগা, সময়মতো মূল্য না পাওয়া ইত্যাদির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে পোশাক খাতের শ্রমিকদের ওপর। তা ছাড়া চাকরি ছাঁটাই-মজুরি কর্তনের ফলে, আর্থিকভাবে দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন কেউ কেউ। ফলস্বরূপ, একই সঙ্গে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, করোনাকালে যেসব শ্রমিককে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে পরবর্তীতে তাদেরকেই আবার কম বেতনে চুক্তিবদ্ধ করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে কাজ হারিয়ে বেকার হওয়া শ্রমিকরা কম পারিশ্রমিকেই আবারও যোগদান করছে। অন্যদিকে পোশাক খাতের মালিকপক্ষ থেকে কৃত্রিম ছাঁটাই আতঙ্ক সৃষ্টি করে অনেক শ্রমিকের বেতন কমিয়ে দেওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে টিআইবির গবেষণায়। ফলে গ্রাম থেকে আশার আলো খুঁজতে শহরে আসা পোশাক খাতের এই শ্রমিকরা অনেকটা বাধ্য হয়ে জীবিকার তাগিদে কম পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা কম বেতনের চাকরিতে আবারও যোগদান করতে পারেননি তাদের অনেকে জীবন অতিবাহিত করার জন্য দিনমজুরের কাজ বেছে নিয়েছেন। করোনাভাইরাস তাদের জীবনে নিয়ে এসেছে বিষাদের সুর।
গত ২৪ এপ্রিল ছিল রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির অষ্টম বর্ষপূর্তি। মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা এখনও জীবিকার সন্ধানে লড়াই করে যাচ্ছেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাকশন এইডের তথ্যানুযায়ী, রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ৫৭ শতাংশ বর্তমানে বেকার। একেকটি দুর্যোগ শ্রমিকদের নাজেহাল অবস্থা স্পষ্ট করে দেয়, রানা প্লাজা ধস যার অন্যতম উদাহরণ। চলমান করোনা মহামারির উদ্বেগজনক পরিস্থিতি এই সত্যকে নতুন করে সামনে এনেছে যে, শ্রমিকরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের উৎপাদন, রফতানি তথা দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি অব্যাহত রাখে। অথচ সেই পোশাক শ্রমিকের কপালে জোটে ছাঁটাই, বেতন কমানো, বিনা চিকিৎসা, অপুষ্টি আর হয়রানি। করোনা সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকি এবং চলমান লকডাউনের মধ্যেও বকেয়া বেতনের দাবিতে প্রায়ই সাভার এবং গাজীপুরে শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে দেখা যায়। দেশের অর্থনীতির গতি সচল রাখার লক্ষ্যে পোশাক শ্রমিকদের ভূমিকা অনন্য, কিন্তু করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের ফলে চলমান লকডাউনকে পুঁজি করে ঈদের আগে শ্রমিক ছাঁটাই ও বেতন-বোনাস না পাওয়ার আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে পোশাক শ্রমিকদের। ঈদের আগে সময়মতো বেতন-বোনাস না পেলে যেকোনো মুহূর্তে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে যা সামগ্রিকভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে প্রশমিত করবে, আর যার দায় বর্তাবে সংশ্লিষ্টদের ওপরই!

ষ মো. তাহসীনুল হক
    শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
    ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]