ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১ ৩ আষাঢ় ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১

সবাই ছুটছে গ্রামে : স্বাস্থ্যবিধির কী হবে
বাড়ি ফেরার শেষ লড়াই
আলমগীর হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ১২ মে, ২০২১, ১২:০০ এএম আপডেট: ১২.০৫.২০২১ ১:৫৭ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 113

মঙ্গলবার বেলা ৩টা। গাবতলী-আমিনবাজার ব্রিজ থেকে সাভারমুখী সড়কে যেন লাখো মানুষের ঢল। ঈদ ভাগাভাগি করতে ঘরমুখো মানুষের এ যেন শেষ লড়াই। মিনিবাস, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, ট্রাক ও পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহনে মানুষ যাচ্ছে গ্রামে। পাশাপাশি হাজার হাজার নারী-শিশুসহ সব বয়সি মানুষ ওই সড়কের দুপাশ দিয়ে হেঁটেই যাচ্ছিলেন সাভার-নবীনগরের দিকে। হাতে ছোট-বড় ব্যাগ কিংবা কোলে শিশুসন্তান নিয়ে এভাবেই সব ভোগান্তি মেনেই সবাই ছুটছে গ্রামে। সামনে এগিয়ে গাড়ি পাবেন এমন আশায় তাদের ছুটে চলা।

মঙ্গলবার রাজধানীর গাবতলী ও আমিনবাজার এলাকায় সরেজমিন এভাবেই লাখো মানুষের ঈদযাত্রা লক্ষ্য করা যায়। শুধু আমিনবাজার নয়, মহাখালী, উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, পোস্তগোলা, টঙ্গী, গাজীপুর, চন্দ্রা ও কালিয়াকৈরসহ গার্মেন্টস কারখানাভিত্তিক এলাকায় মঙ্গলবার ঘরমুখো মানুষের স্রোতধারা দেখা যায়। কয়েকদিনের মতো মঙ্গলবারও মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ছিল গ্রামমুখী মানুষের ভয়াবহ চাপ। দুটি ঘাটেই সমাগম কমাতে অতিরিক্ত ফেরি চালু করা হয়। টাঙ্গাইল ও বঙ্গবন্ধু সেতু এলাকায় যানবাহনের ব্যাপক চাপ ছিল।

অন্যদিকে এভাবে সবাই যেহেতু গ্রামে ছুটছে তাই গ্রামাঞ্চলে করোনার সংক্রমণের কি যে ভয়াবহতা হবে তা নিয়েই দুঃশ্চিন্তায় সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষজ্ঞরা। জনস্রোতের কারণে অসহায় হয়ে পড়ছে বিধিনিষেধের সব পদক্ষেপ। যদিও আবারও এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ বাড়বে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

সরেজমিনে মঙ্গলবার দেখা গেছে, আমিনবাজার ব্রিজের পশ্চিমপ্রান্ত থেকে মিনিবাস যাচ্ছিল নবীনগর-পাটুরিয়া পর্যন্ত। সেখানে দালাল ও পরিবহনের লোকজন মিলে বাসের সিরিয়াল নিয়ন্ত্রণ করে যাত্রী ওঠাচ্ছিলেন। মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার স্বাভাবিক ভাড়া যেখানে একশ টাকারও নিচে, সেখানে ভাড়া আদায় করা হয় চার থেকে পাঁচশ টাকা করে। আশপাশে পুলিশ থাকলেও তারা মূলত জনসমাগমের কাছে অনেকটাই অসহায় ছিলেন। আমিনবাজার থেকে সাভারমুখী সড়কে দেখা গেছে শুধু ঘরমুখো মানুষ আর মানুষ। কেবল গাবতলী বা আমিনবাজার নয়, উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী, তুরাগ ও যাত্রাবাড়ীর দিকেও ঘরমুখী মানুষের ব্যাপক আনাগোনা ছিল। তবে তা গাবতলী-আমিনবাজারের তুলনায় অনেকাংশে কম।

শিমুলিয়ায় ১৪ ফেরি চলাচল : মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাটে মঙ্গলবার ১৪টি ফেরি চলাচল করেছে। এতে যাত্রীসহ যানবাহন পারাপারে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে দক্ষিণবঙ্গের ব্যস্ততম এ নৌরুট। ফেরিতে রোগী ও লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স, পিকআপ, প্রাইভেটকার এবং পণ্যবাহী যানবাহনের সঙ্গে শত শত যাত্রী পার হয়েছেন। বিআইডব্লিউটিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পর নৌরুটে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় শিমুলিয়া ঘাটে যাত্রী পারাপারে ভোগান্তি কমেছে।

বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) সাফায়েত আহমেদ জানিয়েছেন, নৌরুটে ৩টি রো-রো ফেরি, ৫টি ডাম্প ফেরি ও ৬টি কে-টাইপ ফেরি চলাচল করে। স্বাভাবিকভাবেই ফেরি চলাচল করেছে। যাত্রী ও যানবাহন পারাপারে ফেরিতে কিছুটা চাপ তো থাকেই। অন্যদিকে মঙ্গলবার ভোর থেকেই শিমুলিয়া ঘাটে ছুটে আসতে থাকে ঘরমুখো যাত্রী সাধারণ। এতে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নৌরুটে শত শত যাত্রী যানবাহন বোঝাই করে ঘাট ছেড়ে যায় একের পর এক ফেরি। তবে বেলা ৩টার দিকে ঘাটে বেশ যাত্রীর চাপ দেখা যায়। শিবচরের যাত্রী রহমান মিয়া বলেন, কর্তৃপক্ষ ফেরি স্বাভাবিক রাখায় আমরা খুশি। এখন ফেরিতে পদ্মা পাড়ি দিতে পারছি। তবে সড়ক পথে বাড়তি ভাড়া দিয়ে ঘাটে আসতে হয়।

বাগেরহাটের যাত্রী সাদিয়া ইসলাম বলেন, ফেরিতে পদ্মা পাড়ি দিতে কোনো দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে না। তবে পিকআপ ভ্যান ও অটোরিকশা করে বাড়তি ভাড়া দিয়ে ঘাটে পৌঁছতে পেরেছি। মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ হিলাল উদ্দিন বলেন, প্রতিদিনের মতোই ঘাটে যাত্রীর চাপ রয়েছে। তবে ১৫টি ফেরি চলাচল করায় যাত্রীদের ঘাটে অপেক্ষা করতে হয় না। আমার ঘাটে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রেখেছি। যাত্রী, অ্যাম্বুলেন্স, পণ্যবাহী ট্রাক, পিকআপ ও লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে কোনো গাড়ি আসলে তাদের যেতে দেওয়া হয়। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি দেওয়া হচ্ছে না। ঘাটের মোড় থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সকালে বৃষ্টির সময় প্রায় ২০টির মতো ব্যক্তিগত গাড়ি ঘাটে চলে এসেছিল। আমরা সেগুলোকে এখনও ফেরিতে উঠতে দেইনি।

পাটুরিয়ায় অ্যাম্বুলেন্স আসলেই বাড়ছে মানুষের ভিড় : মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, করোনা বিস্তার রোধে দিনের বেলা ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে। অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়ি পারাপারের জন্য ঘাটে ফেরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আর এসব অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে পার হচ্ছে ছোট গাড়ি ও ঈদে ঘরমুখো মানুষ। ঘাটে ফেরি ভিড়লেই পারের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন তারা। তবে জেলার সাটুরিয়া, সিঙ্গাইর ও দৌলতপুরে বিজিবি চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করায় পাটুরিয়া ঘাটে যাত্রীদের চাপ কিছুটা কমেছে। তারপরও মহাসড়ক এড়িয়ে অনেকেই পারাপারের জন্য পাটুরিয়া ঘাটে এসে ভিড় করছেন।

বিআইডব্লিউটিসি জানিয়েছে, দিনের বেলা শুধু অ্যাম্বুলেন্স পারের জন্য ফেরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে কিছু ছোট গাড়ি ও যাত্রী পার করা হচ্ছে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৮টি ফেরি পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে সচল ফেরি সংখ্যা ১৬টি।

গাড়ি ফেরালেও ফিরছেন না মানুষ : কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি ও চরম দুর্ভোগের মধ্যেও বাস, ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও সিএনজি মোটরসাইকেলে করে মঙ্গলবারও ছুটছেন মানুষ। এ সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে নিচ্ছে পরিবহন চালকরা। পুলিশের চেকপোস্টে যাত্রীদের নামিয়ে গাড়ি ফেরালেও ফিরছেন না তারা, ছুটছেন গ্রামের বাড়ি। এতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সালনা (কোনাবাড়ী) হাইওয়ে থানার ওসি মীর গোলাম ফারুক জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকার এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। এ কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় আমাদের চেকপোস্ট রয়েছে। কিন্তু অন্য জেলার গাড়ি ফিরিয়ে দিলেও যাত্রীরা তা মানছেন না।

আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কায় সরকার এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। এ কারণে হাইওয়ে পুলিশ ও থানা পুলিশের তৎপরতা বেড়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের প্রবেশদ্বার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কের বাড়ইপাড়া এলাকার নন্দন পার্কের সামনে বসানো হয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট। পুলিশের চেকপোস্টে যাত্রীদের নামিয়ে গাড়ি ফেরালেও ফিরছেন না তারা, ছুটছেন গ্রামের বাড়ি। যাত্রীরা হেঁটে কিছুদূর গিয়ে বিভিন্নভাবে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের।

 

 

 

 




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]