ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১ ৩ আষাঢ় ১৪২৮
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১

চীন-ভারত-বাংলাদেশের কূটনীতি কোন পথে
স্বপ্না চক্রবর্তী
প্রকাশ: বুধবার, ১২ মে, ২০২১, ১২:০০ এএম আপডেট: ১২.০৫.২০২১ ১:৫৩ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 320

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত জোট কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ (কোয়াড)। ২০০৭ সালে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে নৌ চলাচল অবাধ ও স্বাধীন রাখার উপায় খোঁজার জন্য জোটটি গঠিত হলেও অন্যতম বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দেশ চীন মনে করে তাদের বিরুদ্ধেই গঠিত হয়েছে এ জোট। সম্প্রতি ভারত করোনাভাইরাসের টিকা রফতানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ চীন, রাশিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও যোগাযোগ শুরু করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনায় আসে চীনবিরোধী জোট হিসেবে পরিচিত কোয়াড। যেহেতু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অন্যরকম উচ্চতার মাত্রায় রয়েছে তাই বাংলাদেশের কোয়াডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিবেচনা করছে চীন। এদিকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে ভিন্ন মাত্রার। তাই চীনের সঙ্গে বৈরিতাও এই মুহূর্তে তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির। এ ক্ষেত্রে কোয়াডকে কেন্দ্র চীন-ভারত-বাংলাদেশের কূটনীতিতে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত সোমবার বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি ঝিমিং এক অনুষ্ঠানে  কোয়াডে যুক্ত হলে ঢাকা-বেইজিংয়ের সম্পর্ক খারাপ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন। এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মে. জে. (অব.) মোহাম্মদ আলি শিকদার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া এই ৪টি দেশকে নিয়ে কোয়াড গঠিত হলেও এর মূল লক্ষ্য ছিল ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে ওইসব দেশের আধিপত্য বিস্তার। যদিও এটি এখনও রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক জোট হিসেবে রয়েছে। কিন্তু আসলে এটি সামরিক একটি জোট। এর লক্ষ্য এই অঞ্চলের জলসীমানায় চীনের অবাধ চলাচল বিঘ্নিত করা। তাই আপাতদৃষ্টিতে এটিকে চীনবিরোধী জোটই বলা যায়। এখন কথা হলো বাংলাদেশ এই জোটে যাবে কি না। আমরা জানি, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হলো, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ এ ক্ষেত্রে কোনো পরাশক্তির জোটে বাংলাদেশ যোগ দেবে না বলেই আমি মনে করি। আমরা দেখেছি, চীন এর আগেও কোয়াডের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানিয়েছে। এখন করোনাভাইরাস ইস্যুতেও আবার আলোচনায় এসেছে। চীন মনে করছে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমনকি সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এ সম্পর্ক খুব সহজেই নষ্ট হওয়ার নয়। এদিকে চীনের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাই এখানে একটি ত্রিদেশীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের জাল তৈরি হয়েছে। তবে চীনা রাষ্ট্রদূতের হঠাৎ এ রকম বক্তব্য অনেকটা অযাচিত বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, চীনা রাষ্ট্রদূত যদি এই কথা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বলতেন তা হলে একটা বিষয় ছিল। কিন্তু তিনি সাংবাদিকদের এক প্রোগ্রামে এই কথা বলেছেন, যা সম্পূর্ণরূপে অযাচিত। প্রত্যেকটি দেশেরই নিজস্ব কূটনৈতিক নীতিমালা রয়েছে। এর বাইরে কোনো দেশই যায় না। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম। কোয়াডের যে ৪টি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াÑ পেনডেমিক কারণে এখন তো তারা নিজেরাই বিপদে আছে। ওই জোটে যোগ হওয়ার প্রশ্ন এখন কেন উঠছে তাই তো আমার মাথায় ঢুকছে না। জোটের যে নেতৃত্বে থাকা দেশ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তো করোনাভাইরাসের ধকল এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাই সদস্য অন্য দেশগুলোর পাশেও ওইভাবে দাঁড়াতে পারেনি। এমতাবস্থায় নতুন কোনো দেশ এই জোটে যাবে কি না এটা অনেক পরের বিষয়। চীনের রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য একেবারেই অযাচিত বলে আমি মনে করি।

তবে চীনের এই আহ্বানে ভাবার বিষয় আছে বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ এম জমির। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটা ভিন্ন। বাংলাদেশে চীনের প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু, বড় বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এ ছাড়া আমাদের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও চীন বলছে, আমাদের পাশে থাকবে। মিয়ানমার হয়তো চীনের কথা শুনতেও পারে, এ ক্ষেত্রেও চীনকে আমাদের দরকার। তাই আমি মনে করি, এই মুহূর্তে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কোনো জোটে যোগ দেবে কি না সে বিষয়ে যেকোনো দেশ নিজেদের অবস্থান জানাতে পারে; তবে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির আলোকেই সিদ্ধান্ত নেবে। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ৪০ বিলিয়ন ডলারের। তার মধ্যে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়ে গেছে। তাই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে তারা চাইবে চীনের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় বাংলাদেশ যেন এমন কোনো আন্তর্জাতিক জোটে যোগ না দেয়। এদিকে ভারতও বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছে। করোনার ভ্যাকসিন তারাই প্রথম বাংলাদেশকে দেয়। এবার চীনও দিচ্ছে। তাই বাংলাদেশকে এখন প্রতিটা পদক্ষেপ নিতে হবে ভেবে ভেবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত শমসের মবিন চৌধুরী সময়ের আলোকে তিনি বলেন, চীনের হাইকমিশনার খুবই রূঢ় ভাষা ব্যবহার করেছেন। সরকারের সঙ্গে কথা না বলে সরাসরি সাংবাদিকদের প্রোগ্রামে এসব কথা বলা মোটেই ঠিক হয়নি। এটাকে শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্য করেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কখনও বলেনি কোয়াডে যাবে। আমরা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমাদের সরকার সিদ্ধান্ত নেবে কোনো জোটে যাবে কি না। এটা অন্য কারও বলার কোনো বিষয় নয়।

প্রসঙ্গত গত সোমবার কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠনের ভার্চুয়াল আয়োজন ‘ডিকাব টক’-এ এক প্রশ্নের উত্তরে চীনা রাষ্ট্রদূত লি ঝিমিং বলেন, আমরা জানি, কোয়াড বানানো হয়েছে চীনের কথা মাথায় রেখে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের পক্ষ থেকেও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, চীনের কারণেই তারা এই জোটে অংশ নিচ্ছে। আর সে কারণেই এ রকম কোনো জোটে বাংলাদেশকে চীন দেখতে চায় না বলে সতর্ক করেন লি জিমিং।

 

 

 

 

 




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]