ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ১৬ জুন ২০২১ ১ আষাঢ় ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ১৬ জুন ২০২১

সেই মালেক ড্রাইভারের সাম্রাজ্য এখনও বহাল
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ মে, ২০২১, ১১:০১ পিএম আপডেট: ১৯.০৫.২০২১ ১২:৩২ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 240

আব্দুল্লাহপুরের কামারপাড়া থেকে বটতলা মোড়ে গিয়ে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল উঠতি কয়েকজন যুবকের আড্ডা। আব্দুল মালেক ড্রাইভারের বাসাটি কই প্রশ্ন করতে ঘুরে তাকালেন তারা। তাদের একজন বলে উঠলেন, ওই তো দ্যাখেন না কোটি টাকার সাত তলা আলিশান বাড়ি। ওনাকে তো সবাই হাজী বাদল নামে চেনে। যুবকের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম রমজান মার্কেটের দিকে। রাস্তার পাশে গ্রিলের কারখানার পাশ দিয়ে গলি ঢুকেছে। গলির মুখে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল সাত তলা বাড়ির প্রধান ফটক। লাল, বেগুনি, হলুদ ও লাল মিশিয়ে চেক ডিজাইনে তৈরি করা হয়েছে দরজা। দরজায় ঝুলছে টু লেট। লাগানো হয়েছে গেট ফুলের গাছ। প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই লিচু, পেয়ারা, লেবু, জাম, কাঁঠাল, আমড়া, আম আর কাঠ বাদামের গাছ। পাশেই টিনের দুটি ঘর। এই ঘর দুটোতে থাকেন দুই কেয়ারটেকার। এই বাগান পেরিয়ে ঢুকতে হবে সাত তলার বাড়ির ভেতর। বাড়ির নিচতলায় আরেকটা বেগুনি রঙের গেট। রোববার দুুপুরে তুরাগ এলাকার বামনারটেকের রমজান মার্কেটের পাশে থাকা তার সাত তলা বাসার গিয়ে এমনই দৃশ্য দেখা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়ি চালক আব্দুল মালেক বর্তমানে দুর্নীতি অভিযোগে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।
এরই ফাঁকে কথা হচ্ছিল বাসাটির কেয়ারটেকার শহীদুলের সঙ্গে। কিছুটা ইতস্তবোধও করছিলেন। যদি বাসার মালিকের স্ত্রী দেখে ফেলেন। তিনি জানালেন, ১৬ কাঠার জমির ওপরে এক পাশে সাত তলা ভবন ও তার সামনে একটি ১০ কাঠার বাগান রয়েছে। এই ভবনের তৃতীয় তলায় মালেকের দুই ছেলে ও তার স্ত্রী থাকেন। গত বছর আগে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই ভবনটির নাম দেওয়া হয়েছে হাজী কমপ্লেক্স। এর মালিক তার স্ত্রী নারগিস। তবে এই কেয়ারটেকার জানালেন, মালেক ব্যাংক থেকে কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দুটি নয়, একটি সাত তলা বাড়ি করেছিলেন। এখনও সেই ব্যাংক ঋণের কিস্তি প্রতি মাসে লাখ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। সাত তলায় ২৪টি ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়াদের থেকে ভাড়া আসে ১ লাখ ৪০ হাজার। তার দাবি, প্রতিটি তিন রুমের ফ্ল্যাটের ভাড়া মাত্র ১০ হাজার। কেয়ারটেকার শহীদুলের অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই বাধা দিলেন। জানালেন, মালেকের স্ত্রীকে আগে ফোন করে শুনবেন তারপর তিনি অনুমতি দিলেই মিলবে বাসায় প্রবেশের অনুমতি। মালেকের স্ত্রী নারগিস তার দুই পুত্রকে নিয়ে থাকেন তৃতীয় তলায়। ভাড়া বাবদ ও খামার থেকে যা আয় আসে তাতেই তাদের সংসার চলে। কিন্তু প্রশ্ন ছিল, বাসা ভাড়া বাবদ তো ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা আসে। আবার তার মধ্যে ১ লাখ ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেন তা হলে শুধু কি খামারের দুধ বিক্রির টাকায় সংসার চলে? খামারেও তো ব্যয় আছে। এমন প্রশ্ন শুনে জবাব দিতে পারেননি শহীদুল। এ সময় মালেকের স্ত্রী নারগিসের সঙ্গে কথা বলার জন্য তার ফোন নাম্বারটি চাওয়া হলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, ম্যাডাম বলেছে কেউ আসলে আমার অনুমতি ছাড়া কথা বলবা না ও আমাকে না জানিয়ে কাউকে ফোন নাম্বারও দিবা না।
এলাকাবাসী সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালেকের বাবার তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের গাড়ি চালক হিসেবে যোগদান করার পর তার জীবন পাল্টাতে থাকে। গত ১০ বছর আগেও সাদামাটা জীবনযাপন করত মালেকের পরিবার। কিন্তু হঠাৎ করে তিনি হজে যান এবং এলাকায় সাত তলা আলিশান বাড়ি করেন। খামার তৈরি করেন ছেলের নামে। তবে এলাকায় প্রচার করতেন তিনি তার খামারের দুধের টাকায় এসব করেছেন। তারা আরও বলেন, মালেক গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা কারও সঙ্গে তেমন সঙ্গ দেন না। এমনকি কথাও বলেন না। তবে কেউ বাড়ি তৈরির টাকার উৎস জানতে চাইলে ব্যাংক ঋণের টাকায় করা হয়েছে বলে জানায় তারা।
তারা আরও জানায়, সম্প্রতি তার বাসার প্রধান ফটকে ভাড়াটিয়াদের তথ্য গোপন করতে টু লেট ঝোলানো হয়েছে। যাতে দেখে মনে হয় ভবনটি ভাড়াটিয়া শূন্য। অথচ কেয়ারটেকার জানালেন, পুরো ভবনে ভাড়াটিয়ায় পূর্ণ। পাশাপাশি সে প্রতিটি ফ্ল্যাটের ভাড়াও কম বলে প্রচার করে। মালেকের বামনারটেকের রমজান মার্কেট ও রাজাবাড়ী ছাড়াও দৌড় এলাকায় আরও একটি সাত তলা বাড়ি রয়েছে। পাশাপাশি হাতিরপুলে একটি দশ তলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে বলেও জানা গেছে।
এলাকার বটতলা মোড়ে থাকা বাসিন্দা খোকন বলেন, র‌্যাব তাকে না ধরলে আমরা বুঝতেই পারতাম না তিনি দুর্নীতিবাজ। নিয়োগ বাণিজ্যের টাকায় এতসব করেছেন। এলাকায় তো তিনি প্রচার করতেন ডিজির গাড়ি চালান। এ কারণে অনেকে ভাবছিল হয়তো তার আয় বেশি। সাধু বেশে চলাফেরা করতেন। যেন তার মতো ধার্মিক লোক আর কেউ নেই। কিন্তু...।
তুরাগের দক্ষিণ রাজাবাড়ী এলাকার ২নং ওয়ার্ডে ৪ নম্বর রোডের ৭০ নম্বর বাড়িতে ১৫ কাটা জমির ওপর বানিয়েছেন বিদেশি গরুর দুধের খামার। এই খামারটি বর্তমানে মালেকের জামাই রতন দেখভাল করেন। খামারটির মালিক তার মেয়ে বেবি। কিন্তু সেটি মালেকের ছেলে ইমনের নামে চালানো হচ্ছে।
সোমবার খামারের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, খামারের গেটে লেখাÑ ইমন ডেইরি ফার্ম, স্থাপিতÑ ৩ মার্চ ১৯৯৯, প্রতিষ্ঠাতাÑ হাজী আব্দুল বারী। তার নিচে দুটি মোবাইল নাম্বার দেওয়া। সবশেষে লেখাÑ প্রো. আলহাজ এমএন (বাদল)। খামারটির পাশেই একটি মাজার শরীফ।  সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় গিয়ে দেখা গেল, পুরো খামারে ৫৫টি অস্ট্রেলিয়ান গাভি ও ১০ বাছুর। খামারটিতে দেখভাল করছেন শাহীন, আশরাফুল ও সবুজ ছাড়াও আরও একজন। ওই সময় তিনজনকে পাওয়া গেল। তারা জানালেন, মালেক গ্রেফতারের পর থেকে তাদের বেতন নিয়ে টানা টালবাহানা করে মালেকের জামাই। প্রতি মাসে ঠিকমতো তারা বেতন পান না। তাদের প্রত্যেকের বেতন ১২ হাজার। প্রতিদিন তারা ২০০ লিটার দুধ দহন করেন। সকালে মালেকের জামাই রতন গিয়ে দুধগুলো স্থানীয় মানুষের মাঝে বিক্রি করে দেন। তারা আরও জানালেন, মালেককে গ্রেফতারের পর থেকে তার ছেলে ইমন আর খামারের দিকে যাননি। এখন জামাই দেখাশোনা করেন। প্রতি মাসে এই ৬৫ গরুর খাবার ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ প্রায় কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়। দুধ থেকে যা আয় আসে সবটাই তার জামাই নিয়ে যান বলেও জানালেন তারা। তবে তারা এর বেশি তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
মালেক বর্তমানে অস্ত্র মামলায় কারাগারে আছেন। তার মামলাটি বিচারাধীন। এই মামলার সরকার পক্ষের আইনজীবী তাপস পাল সময়ের আলোকে বলেন, তার মামলার চার্জশিট হয়ে গেছে। চার্জও গঠন হয়েছে। গত মাসে টানা চার দিন সাক্ষ্যপ্রমাণের তারিখ নির্ধারণ হয়েছিল। সাক্ষীরাও প্রস্তুত রয়েছে। সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে দ্রুত মামলার রায় ঘোষণা হবে। অন্যদিকে তার অবৈধ সম্পত্তি অর্জনের মামলাটি বর্তমানে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এটির ব্যাপারে দুদকের পরিচালক মোজাম্মেল হক সময়ের আলোকে বলেন, মালেকের মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]